পাথারকান্দিতে উৎসবের আবহে শান্তিপূর্ণভাবে উদ্‌যাপিত ঈদ-উল আজহা

Spread the news

ত্যাগ, সম্প্রীতি ও মানবতার অনন্য বার্তায় মুখর বৃহত্তর গ্রামীণ জনপদ____

মোহাম্মদ জনি, পাথারকান্দি।
বরাক তরঙ্গ, ২৮ মে : ত্যাগের মহিমা আত্মশুদ্ধির আহ্বান এবং ভ্রাতৃত্বের অমলিন বার্তা নিয়ে বৃহত্তর পাথারকান্দি জুড়ে গভীর ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদ্‌যাপিত হলো পবিত্র ঈদ-উল আজহা। বৃহস্পতিবার ভোরের কোমল আলো ফুটতেই যেন নতুন প্রাণ ফিরে পায় সমগ্র জনপদ। প্রতিটি গ্রাম, প্রতিটি মহল্লা, প্রতিটি ইদগাহ ময়দান পরিণত হয় ঈদের আনন্দ, শান্তি ও সম্প্রীতির মিলনমেলায়।প্রবল উৎসাহ-উদ্দীপনা এবং ধর্মীয় আবেগে দিনব্যাপী উদ্‌যাপিত হয় মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব কোরবানির ঈদ। সকাল থেকেই আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় মানুষের মুখে ছিল নির্মল আনন্দের ঝলক। চড়া বাজারদর, অর্থনৈতিক চাপ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা থাকলেও ঈদের আনন্দে তার কোনো ছাপ পড়েনি। বরং প্রতিকূলতাকে জয় করেই বৃহত্তর পাথারকান্দির মানুষ প্রমাণ করে দিল—মানবতা, ভালোবাসা ও ধর্মীয় ঐক্যের শক্তিই সবচেয়ে বড়।

সময়টা ছিল ঈদের, অনুভূতির নাম কুরবানি। আত্মত্যাগের মহান শিক্ষা বুকে ধারণ করে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা সকাল থেকেই দলে দলে ছুটে যান ইদগাহ মাঠে। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের প্রত্যাশায় এক কাতারে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করেন হাজার হাজার মানুষ। বয়স, শ্রেণি, পেশা কিংবা সামাজিক অবস্থানের ভেদাভেদ ভুলে সবার কণ্ঠে ধ্বনিত হয় তাকবির। সেই দৃশ্য যেন মানবতার এক অপূর্ব প্রতিচ্ছবি। বৃহত্তর পাথারকান্দি ও বাজারিছড়া থানাধীন বিভিন্ন এলাকায় ছোট-বড় প্রায় ২৫টিরও বেশি ইদগাহ ময়দানকে ঘিরে ছিল উৎসবের বাড়তি আয়োজন। স্থানীয় যুবসমাজ ও স্বেচ্ছাসেবকরা নিজ উদ্যোগে মাঠ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, নামাজের সারিবদ্ধতা নিশ্চিত করা এবং আগত মুসল্লিদের সহযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিভিন্ন স্থানে নির্মাণ করা হয় দৃষ্টিনন্দন তোরণ। রঙিন পতাকা, ব্যানার ও বেলুনে সাজিয়ে তোলা হয় ইদগাহ প্রাঙ্গণ। ঐতিহ্য আর আধুনিকতার মিশেলে উৎসবের আবহ হয়ে ওঠে আরও বর্ণিল।সকাল সাতটা থেকে নয়টার মধ্যে বিভিন্ন ইদগাহে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। তবে কিছু এলাকায় আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা ও মাঠের প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে বিকল্প ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হয়।

বৃহত্তর কটামণি এলাকার কটনপুর ঈদগাহে নামাজ আদায়ে সাময়িক অসুবিধা সৃষ্টি হওয়ায় কটনপুর গ্রামের ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা কটামণি বাজার জামে মসজিদে ঈদের নামাজ আদায় করেন।এছাড়াও ডেঙ্গারবন্দ, ইছারপার, রাধামাধবপুর, ছলামনা, নাগ্রা, মানিকবন্দ, ঝেরঝেরি, উত্তর ঝেরঝেরি, বাজারিছড়া, কালাছড়া, চন্দ্রপুর, লোয়াইরপোয়া, বৈঠাখাল, কাঁঠালতলি, জালালনগর, লক্ষ্মীপুর, হাটখলা, চাঁন্দখিরা, ডেফলআলা, জুড়বাড়ি, কাবাড়িবন্দ, করমপুর, ডেউবাড়ি ও কাসেরগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকার মসজিদ ও ইদগাহ ময়দানে যথাসময়ে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ মুসল্লির উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো অঞ্চল।

নামাজ শেষে বিশ্বশান্তি, সাম্য, মানবকল্যাণ ও দেশবাসীর সুখ-সমৃদ্ধি কামনায় অনুষ্ঠিত হয় বিশেষ মোনাজাত। মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, শান্তি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে মুক্তির জন্যও দোয়া করা হয়। পরে কুরবানির ধর্মীয় তাৎপর্য ও আত্মত্যাগের শিক্ষা নিয়ে আলোচনা করেন ইসলামিক চিন্তাবিদ, আলেম-ওলামা ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ। তাঁদের বক্তব্যে উঠে আসে কুরবানি কেবল পশু জবাইয়ের আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং আত্মশুদ্ধি, মানবসেবা, ত্যাগ ও সামাজিক সাম্যের এক অনন্য শিক্ষা।

ঈদের নামাজ শেষে শুরু হয় হৃদ্যতা ও সৌহার্দ্যের আরেক অনুপম অধ্যায়। একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি ও কুশল বিনিময়ের মধ্য দিয়ে ছড়িয়ে পড়ে ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্বের উষ্ণতা। আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও প্রতিবেশীদের বাড়িতে চলতে থাকে শুভেচ্ছা বিনিময়। শিশু-কিশোরদের নতুন পোশাক, হাতে খেলনা আর ঘরে ঘরে সেমাই, ফিরনি ও নানা পদের খাবারের সুবাসে মুখর হয়ে ওঠে গ্রামীণ পরিবেশ। ছোটদের উচ্ছ্বাস আর বড়দের আন্তরিক আপ্যায়নে ঈদের আনন্দ পায় পূর্ণতা।প্রতিটি ইদগাহ সংলগ্ন এলাকাতেই বসে ছোট ছোট ঈদমেলা। গ্রামীণ কুটির শিল্প, খেলনা, কসমেটিকস, মিষ্টান্ন ও ফাস্টফুডের দোকানগুলোতে ছিল উপচে পড়া ভিড়। শিশুদের কোলাহল, তরুণদের আনন্দ আর পরিবারের সম্মিলিত উপস্থিতিতে মেলাগুলো পরিণত হয় গ্রামীণ সংস্কৃতির এক প্রাণবন্ত চিত্রে। দুপুর পর্যন্ত চলা এসব মেলায় মানুষের মিলন ঘটে এক অপার আনন্দঘন পরিবেশে।উৎসবকে শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ রাখতে প্রশাসনও ছিল তৎপর। পুলিশ প্রশাসন, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক ও গ্রাম্যপ্রহরীরা দায়িত্ব পালন করেন নিষ্ঠা ও সতর্কতার সঙ্গে। কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। সামগ্রিকভাবে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকায় স্বস্তি প্রকাশ করেন সাধারণ মানুষ।সব মিলিয়ে এবারের পাথারকান্দির ঈদ-উল আজহা হয়ে উঠেছে ধর্মীয় মর্যাদা, সামাজিক সম্প্রীতি ও মানবিক মূল্যবোধের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। প্রতিকূল সময়েও মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর এই আয়োজন নিঃসন্দেহে এলাকাবাসীর আন্তরিকতা, সহমর্মিতা ও ঐক্যের এক অনন্য প্রতিফলন হয়ে থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *