বাংলা সাহিত্য‌ সভার প্রতিষ্ঠা দিবস উদযাপিত গুয়াহাটিতে

Spread the news

বরাক তরঙ্গ, ১৭ জুলাই : “বাংলা সাহিত্য সভা, অসম”-এর পঞ্চম প্রতিষ্ঠা দিবস কেন্দ্রীয়ভাবে পালিত হলো গুয়াহাটি মহানগরীর বর্ষাপাড়াস্থিত ঐতিহ্যমণ্ডিত সাউথ পয়েন্ট স্কুলে ১৪ জুলাই। অনুষ্ঠানের শুরুতেই বাংলা সাহিত্য সভার সাধারণ সম্পাদক ড. প্রশান্ত চক্রবর্তী বৃহত্তর গুয়াহাটি শাখার ‘দশভুজা’ সহযাত্রীদের (জয়া নাথ, মৌসুমি শিকদার, মোনালিসা ভট্টাচার্য, সঞ্চিতা ভাদুড়ি ভট্টাচার্য, সোমা দেব, মামণি বিশ্বাস, নবনীতা দত্ত, রমা রয়, সংঘমিত্রা দেব) সাহিত্য সভার বিভিন্ন অনুষ্ঠান সুচারুরূপে সম্পন্ন করবার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান। তারপর তিনি সাহিত্য সভার কার্যাবলির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেন।

এরপর অনুষ্ঠানটি শুরু হয় গণেশ বন্দনার সঙ্গে ঈশা সাহার অপূর্ব ভরত নাট্যম নৃত্যের মধ্য দিয়ে। পরবর্তী অনুষ্ঠান মায়া সরকারের দু’টি সুন্দর সংগীত পরিবেশন। গুণী শিল্পী পায়েল চক্রবর্তী কিছু সংকলিত আধুনিক বাংলা গানের সাথে নৃত্য পরিবেশন করেন। সাউথ পয়েন্ট স্কুলের ছাত্রী অন্তরা দাস পরিবেশন করেন দুটি অপূর্ব অসমিয়া ও বাংলা সংগীত। ওই স্কুলেরই আরেকজন ছাত্রী নিধি নিয়োগী অত্যন্ত সুন্দর নৃত্য পরিবেশন করেন।

শিলচরের দুই ক্ষুদে শিল্পী প্রদত্তা শীল ও শৌনক দত্ত পুরকায়স্থ অসাধারণ কবিতা আবৃত্তি করে দর্শকদের আপ্লুত করে।

ইতিমধ্যে সাহিত্য সভার বিশিষ্ট উপদেষ্টা ও সংবিধান প্রণেতা, চিন্তাশীল লেখক দেবব্রত রায়চৌধুরী সস্ত্রীক অনুষ্ঠানে উপস্থিত হলেন। মাত্র কিছুদিন পুর্বে তিনি আশি বৎসর বয়সে পদার্পণ করেন। সেই উপলক্ষ্যে সভার পক্ষ থেকে পাণ্ডু-মালিগাঁও শাখার সভাপতি সুদেষ্ণা দেবরায় চন্দ ও বৃহত্তর গুয়াহাটি শাখার সভাপতি অসীম সরকার তাঁকে অসমের ঐতিহ্যপূর্ণ একখানি ফুলাম গামোছা, একটি স্মৃতিচিহ্ন ও সাহিত্য সভা দ্বারা প্রকাশিত কিছু বই ও একখানি মানপত্র দিয়ে সংবর্ধনা জ্ঞাপন করেন। মানপত্রটি পাঠ করেন সভার আরেকজন বিশিষ্ট উপদেষ্টা তথা সুপরিচিত বাচিক শিল্পী ও সমাজকর্মী অজিতকুমার সেন। দেবব্রত রায়চৌধুরী তাঁর নাতিদীর্ঘ লিখিত ভাষণে সাহিত্য সভার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তাঁর দীর্ঘ জীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতার সাথে উদ্বাস্তু জীবনের করুণ কাহিনি বর্ণনা করেন।তিনি অসমিয়া, বাঙালি ও জনজাতিদের একতাবদ্ধ হবার ব্যাপারে জোর দিয়ে বলেন যে, ভবিষ্যতের অশনি সংকেত তথা উদ্বাস্তু দুঃসহ যন্ত্রণা একমাত্র তাহলেই হয়তো ঠেকানো যাবে।

পরবর্তী পর্যায়ে ছিল পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান।বাংলা সাহিত্য সভার প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে “বাংলা সাহিত্য সভা, অসম” ও “মজলিশ সংলাপ” পত্রিকার বিশেষ সহযোগিতায় গত ৫ জুলাই “বসে লেখো প্রতিযোগিতা” আয়োজন করা হয়। ‘ক’ ও ‘খ’ এই দু’টি ভাগে ভাগ করে প্রতিযোগিতাটি করা হয়েছিল। এই প্রতিযোগিতায় প্রতিযোগিদের লেখা যাচাই বাছাই করেছেন এই সভারই দুইজন সদস্য কবি ও সম্পাদক তুষারকান্তি সাহা ও সাহিত্যিক সজল পাল। এই প্রতিযোগিতায় দুটি বিভাগের ১ম, ২য় ও ৩য় স্থানাধিকারী ছয় জনকে নগদ অর্থ যথাক্রমে ২০০০, ১৫০০,‌১০০০টাকা, একটি মেডেল ও শংসাপত্র প্রদান করা হয়।প্রতিযোগিতায় যোগদানকারী সকল প্রতিযোগীকে একটি মেডেল ও শংসাপত্র প্রদান করা হয়। বিশেষভাবে উল্লেখ্য, এই অর্থমূল্য সাহিত্য সভার বিশিষ্ট উপদেষ্টা অজিতকুমার সেন তাঁর স্ত্রী মীরা সেনের স্মৃতির উদ্দেশে প্রদান করেছেন। প্রতিযোগিতার স্থানাধিকারি সকল প্রতিযোগীদের লেখা “মজলিশ সংলাপ” পত্রিকায় প্রকাশ করা হবে।

বাংলা সাহিত্য সভার বিশিষ্ট উপদেষ্টা পদ্মশ্রী অজয় দত্তকেও এদিন বিশেষ সংবর্ধনা জ্ঞাপন করা হয়। অন্যান্য নিমন্ত্রিত বরেণ্য অতিথিবর্গদের মধ্যে শিলচরের বিধায়ক ডা. রাজদীপ রায়, উদারবন্দের বিধায়ক রাজদীপ গোয়ালা, বিশিষ্ট সমাজকর্মী প্রশান্ত রায়, শল্য চিকিৎসক সৈকত মল্লিক সহ বহু গুণীমানী সভার সৌষ্টব বৃদ্ধি করেছেন। মুখ্য উপদেষ্টা পদ্মশ্রী অজয় দত্ত,
বিশিষ্ট উপদেষ্টা সাউথ পয়েন্ট স্কুলের কর্ণধার কৃষ্ণাঞ্জন চন্দ, বাংলা সাহিত্য সভার অন্যতম উপদেষ্টা দেবব্রত রায়চৌধুরী, বিশ্বজিৎ সেনগুপ্ত, অজিতকুমার সেন, সভাপতি খগেনচন্দ্র দাস, সম্পাদক ড. প্রশান্ত চক্রবর্তী এবং বরেণ্য অতিথিগণ মিলে মঙ্গল দীপ প্রজ্বলন করেন। দীপ স্ত্রোত্র পাঠ করেন গুয়াহাটি শাখার সাধারণ সম্পাদক (সাংস্কৃতিক) তথা বিশিষ্ট শিল্পী মৌসুমি শিকদার।

পদ্মশ্রী অজয় দত্ত ও অন্যান্য বরেণ্য অতিথিদের অসমের ঐতিহ্যমণ্ডিত ফুলাম গামোছা, স্মারক, সাহিত্যসভার কিছু মুদ্রিত পুস্তক ও মানপত্র দিয়ে সংবর্ধনা জ্ঞাপন করা হয়।নবতিপর পদ্মশ্রী অজয় দত্ত তাঁর সংক্ষিপ্ত ভাষণের প্রথমেই বলেন যে, তিনি নিজেকে কখনোই বৃদ্ধ মনে করেন না, সারাজীবন তিনি কাজ করেই যেতে চান। তিনি গুয়াহাটি শহরের অন্যতম পুরাতন বাসিন্দা। তাঁর কথায়, ১৯৬০ সাল পর্যন্ত গুয়াহাটিতে কারও মনে তেমন কোনো বিভেদ ছিল না। সকল ভাষা ও ধর্মের লোকেরা এক আশ্চর্যরকম প্রীতিমিলনের বন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন।১৯৬০ সাল পরবর্তী যে বিভেদ বা নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি হয়েছে তার বিরুদ্ধে তিনি বরাবর সোচ্চার হয়েছেন। সকল ভাষাভাষীর ভেতর তিনি মিলনের সেতু বন্ধনের কাজ করেছেন ও আজীবন করে যাবেন। তিনি বলেন, বাংলা সাহিত্য সভা এই মিলনের কাজ করছে বলেই সভার জয়যাত্রা অব্যাহত রয়েছে।

সাহিত্য সভার সাধারণ সম্পাদক ড. প্রশান্ত চক্রবর্তী তাঁর ভাষণে বলেছেন অসমের প্রায় ৫০০ স্কুলে বাংলা সাহিত্যসভা প্রণীত-সম্পাদিত-অনূদিত পাঠ্যপুস্তক পড়ানো হয়। সরকারের পক্ষ থেকে পাঠ্যপুস্তক অনুবাদ ও প্রণয়নের কাজ বাংলা সাহিত্য সভাকেই দেওয়া হয়েছে। বরাকের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে আন্তরিক আনন্দ প্রকাশ করে তিনি বলেন, সাহিত্য সভা দুই উপত্যকার সত্তা ও সমন্বয়ের সাঁকো হিসেবে সর্বদা কাজ করে যাবে। কোনো অপশক্তি এই জয়যাত্রাকে আটকাতে পারবে না। শিলচরের চিকিৎসক বিধায়ক ডা.রাজদীপ রায় ভাষণে তাঁর প্রয়াত পিতা বিমলাংশু রায়ের কথা বারবার উল্লেখ করেন এবং পিতার আদর্শ তাঁকে পথ চলবার প্রেরণা জুগিয়েছে। তাই তিনি ২০০৯-এ পিতা বিমলাংশু রায়ের মৃত্যুর পর বিদেশের বাস উঠিয়ে স্বভূমিতে ফিরে আসেন ও পিতার প্রদর্শিত পথে ধরে দেশমাতৃকার সেবায় ব্রতী হন। পেশায় চিকিৎসক এই বিধায়ক আরও বলেন, এখনও তিনি রোগীদের অস্থিগত শল্য চিকিৎসা করেন।সাহিত্য সভার আন্তরিক সাফল্য কামনা করে তিনি বলেন যে, এই সভা দীর্ঘায়িত করবার জন্য পরবর্তী পঞ্চাশ বছরের পরিকল্পনা করে রাখা প্রয়োজন।
উধারবন্দের বিধায়ক সুবক্তা রাজদীপ গোয়ালা অসম তথা দেশমাতৃকার জয়ধ্বনির সাথে ভাষণ আরম্ভ করেন। তাঁর সংক্ষিপ্ত ভাষণে তিনি বাংলা সাহিত্য সভার সকল কল্যাণকর কার্যে পাশে থাকবেন বলে আশ্বাস দেন।
বিশিষ্ট সমাজকর্মী প্রশান্ত রায় বাংলা সাহিত্য সভার কার্যের ভূয়সী প্রশংসা করেন ও সভার উন্নতিকল্পে ৫০০০১ টাকা দান করেন। গুয়াহাটির বিখ্যাত শল্য চিকিৎসক সৈকত মল্লিক মাতৃভাষা বাংলার প্রতি গভীর আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, ডাক্তারি জীবনে মান্য বা প্রমিত বাংলা ব্যবহার কম হয়, কিন্তু কেবল ভালোবাসার টানেই বাংলা সাহিত্য‌সভায় এসে বাংলা ভাষায় কথা বলার আনন্দ পাচ্ছেন।

বৃহত্তর গুয়াহাটি ও পান্ডু -মালিগাঁও শাখার পক্ষ থেকে অসীম সরকার ও সুদেষ্ণা দেবরায় চন্দ সাহিত্য সভার রাজ্যিক সভাপতি খগেনচন্দ্র দাস, রাজ্যিক কোষাধ্যক্ষ শিশির সেনগুপ্ত, রাজ্যিক সাধারণ সহ সম্পাদক সন্দীপন দত্ত পুরকায়স্থ, সম্পাদক ড.প্রশান্ত চক্রবর্তী ও বিশিষ্ট উপদেষ্টা অজিতকুমার সেন মহাশয়কে ফুলাম গামোছা ও একটি স্মৃতিচিহ্ন দিয়ে সংবর্ধনা জানান। এই সংবর্ধনা পর্বটি পরিচালনা করেন বৃহত্তর গুয়াহাটি শাখার সম্পাদক জয়া নাথ।
অনুষ্ঠানের পরবর্তী ও একদম শেষ পর্বে বিশিষ্ট নৃত্যশিল্পী মাল্যশ্রী চৌধুরী অপূর্ব সুন্দর নৃত্য পরিবেশন করেন।

সংগীতশিল্পী শ্রেয়া নাথের অসাধারণ দুটি গান পরিবেশন দর্শকদের মুগ্ধ করে দেয়। পাণ্ডু -মালিগাঁও শাখার সদস্য সুকণ্ঠী অনন্যা দেব একটি সুন্দর সংগীত পরিবেশন করেন। এরপর
গুরু-শিষ্য জুটির অনন্য যুগলবন্দি ছিল। পাণ্ডু কলেজের অধ্যাপক ড. সঞ্জয়চন্দ্র দাসের অপূর্ব লোকসংগীত ও সাথে তাঁর গুরু কটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. প্রশান্ত চক্রবর্তীর হারমোনিয়াম বাদন দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হয়।

সমস্ত অনুষ্ঠানে সংগীত শিল্পীদের সহযোগিতা করেছেন তবলায় জিষ্ণু চৌধুরী ও কি-বোর্ডে সঞ্জয়
রায়। সম্পূর্ণ অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন অমল চক্রবর্তী, সঞ্চিতা ভাদুড়ি ভট্টাচার্য ও ড.প্রশান্ত চক্রবর্তী। সেদিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট সংগীত শিল্পী মিতা সেন, বিশিষ্ট বাচিক শিল্পী রীতা চন্দ, বিশিষ্ট লেখক ও বাচিক শিল্পী অনুরাধা পাত্র, প্রাক্তন সাংবাদিক লেখক পীযূষ সাহা, সমাজকর্মী সঞ্জয় দাস প্রমুখ।

পাণ্ডু-মালিগাঁও শাখার পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন শাখার সম্পাদক সংস্থিতা দেব রায়, দীপক ভদ্র, সুকুমার ব্যানার্জি, অপর্ণা দাস, শুক্লা বসাক, অনন্যা মজুমদার, রাণু বসাক, সুতপা রায়, পূর্ণিমা রায়চৌধুরী ও মিতালি বসু।

সাহিত্য সভার জন্মদিন উপলক্ষে চা, সান্ধ্য জলযোগ সহ নৈশভোজের এলাহি ব্যবস্থা ছিল সভার অন্যতম পৃষ্ঠপোষক স্বনামধন্য ক্যাটারার সোনা দত্তের ব্যবস্থাপনায়। শেষ পাতে ছিল পায়েসান্ন। সভার বৃহত্তর গুয়াহাটি শাখা ও পাণ্ডু-মালিগাঁও শাখার যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা দিবসের অনুষ্ঠান সুচারুরূপে সম্পন্ন হয়েছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *