অটল বিহারী বাজপেয়ী : এক দূরদর্শী, কবি ও মহান রাষ্ট্রনায়ক

Spread the news

প্রয়াণ দিবসে বিশেষ শ্রদ্ধাঞ্জলি

।। অধ্যাপক রাজীবমোহন পন্থ ।।
(উপাচার্য, আসাম বিশ্ববিদ্যালয়)
১৬ আগস্ট : “তিনি অত্যন্ত বিনয়ী মানুষ ছিলেন এবং কখনও নিজেকে জাহির করতেন না। এতটাই বিনয়ী ছিলেন যে, আমেরিকায় রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব গ্রহণ করার জন্য আমাকে অনুরোধ করতে তিনি নিজেই আমার সাধারণ বাড়িতে এসেছিলেন। তাঁর সেই বিনয় ছিল অতুলনীয় এবং তা আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল”—স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বলেছিলেন নানি পালকিওয়ালা।
অটলজি নিজেই বলেছিলেন, “আমি স্বপ্নের সওদাগর নই। আমার পা মাটিতে দৃঢ়ভাবে প্রোথিত।” তাঁর জনপ্রিয় একটি কবিতায় তিনি লিখেছেন, “হে ঈশ্বর, আমাকে এমন উচ্চতায় নিয়ে যেও না, যেখানে আমি আমার সহমানুষদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই।”

সাধারণ মানুষের বন্ধু, সহজ-সরল অথচ ব্যক্তিত্বময় অটলজি জন্মগ্রহণ করেন ১৯২৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর গোয়ালিয়রে। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অসাধারণ বক্তা। তাঁর ভাগ্যেই যেন লেখা ছিল দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়া। পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একেবারে শুরুর দিকে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, এই মানুষটি একদিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী হবেন। ১৯৯৬ সালে নেহরুর সেই ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবে পরিণত হয়, যদিও তাঁর প্রথম প্রধানমন্ত্রিত্ব ছিল স্বল্পস্থায়ী। পরবর্তীকালে ১৯৯৮ সালে তিনি দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হন এবং এবার মাত্র ১৩ দিনের জন্য নয়; বরং ভারতকে একবিংশ শতাব্দীতে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার যাত্রাকে সুদৃঢ় রূপ দিতে তিনি নেতৃত্ব দেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবন বিস্তৃত ছিল সাত দশকেরও বেশি সময়জুড়ে।

বিশিষ্ট সাংবাদিক প্রভু চাওলা যথার্থই বলেছেন, “তিনি হয়তো গেরুয়া দলের পিতৃপুরুষ, কিন্তু তাঁর রাজনীতি কখনও একরঙা ছিল না।” তাঁর জীবনেও ফুটে উঠেছিল ভারতের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের নানা রং।

গোয়ালিয়রের এক স্কুলপড়ুয়া অটল একবার তাঁর এক সহপাঠীর সঙ্গে জাতীয় স্তরের একটি বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে লক্ষ্ণৌ যান। লক্ষ্ণৌর চারবাগ রেলস্টেশনে তাঁর সঙ্গে যোগ দেন সেই সহপাঠী। প্রতিযোগিতার একেবারে শেষ মুহূর্তে বন্ধু জানালেন, তিনি ‘প্রস্তাবের পক্ষে’ বক্তব্য প্রস্তুত করেছেন। অটলও একই বিষয়ে পক্ষে বক্তব্য প্রস্তুত করেছিলেন। কিন্তু বন্ধুর অসহায় পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে অটল নিজেই ‘প্রস্তাবের বিপক্ষে’ বক্তব্য দিতে সম্মত হলেন। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সেই প্রতিযোগিতায় তিনিই প্রথম স্থান অধিকার করেন। সেটিই ছিল প্রথমবার, যখন তাঁর অসাধারণ বক্তৃতা-দক্ষতা বৃহত্তর পরিসরে সকলের নজরে আসে। তখনই যেন স্বাধীন ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংসদীয় বক্তার নির্মাণ শুরু হয়েছিল।

নিজস্ব কাব্যিক আবেদনের মাধ্যমে তিনি ভারতের সাধারণ মানুষের হৃদয় জয় করেছিলেন। সরাসরি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকেও আক্রমণ না করার জন্য তিনি পরিচিত ছিলেন। কিন্তু ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থা ও অসঙ্গতির বিরুদ্ধে তাঁর ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ ছিল এতটাই তীক্ষ্ণ যে, তা দোষীদের সঠিক পথে ফিরে আসার জন্য যথেষ্ট ছিল। তিনি ছিলেন একজন মহান দেশপ্রেমিক, যিনি প্রয়োজনের সময় সবসময় দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েছেন।

১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় অটলজিই প্রথম ব্যক্তিদের একজন, যিনি দৃঢ়ভাবে শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সাহসী সিদ্ধান্তগুলির প্রশংসা করেছিলেন। গোটা বিশ্বের সামনে তাঁর দেশপ্রেম আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল, যখন তিনি প্রথমবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে হিন্দিতে ভাষণ দেন। আন্তর্জাতিক মঞ্চে হিন্দিতে ভাষণ দেওয়া প্রথম ভারতীয় হিসেবে তিনি বিশ্বসভায় ভারতের এক নতুন পরিচয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

এটি শুধু শতাব্দীর পর শতাব্দী পরাধীনতার মানসিকতায় আবদ্ধ ভারতীয়দের মনে গভীর প্রভাব ফেলেনি, বরং বিশ্বের সামনে এক আত্মবিশ্বাসী ভারতের নতুন ভাবমূর্তিও তুলে ধরেছিল। পাকিস্তান যখন পারমাণবিক অস্ত্রের শক্তি বাড়িয়ে তুলছিল, তখন তাঁর নেতৃত্বেই পোখরান-২ পারমাণবিক পরীক্ষা সংঘটিত হয়। এতে গোটা বিশ্ব বিস্মিত হয়ে পড়ে এবং মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ও পাকিস্তানের আইএসআই কার্যত হতবাক হয়ে পড়ে। এটি ছিল একটি সাহসী কৌশলগত পদক্ষেপ—প্রতিবেশী দেশ থেকে আসা সম্ভাব্য হুমকির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে। তবে যুদ্ধংদেহী জাতীয়তাবাদ কখনও তাঁর আদর্শ ছিল না। তাঁর বিশ্বাস ছিল, শক্তি ছাড়া শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।

তাঁর কবিতাতেও তাঁর লড়াইয়ের মানসিকতার প্রতিফলন ঘটেছে। তিনি লিখেছিলেন, “হার মানব না, নতুন করে সংঘাতে অবতীর্ণ হব।” এবং জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে তিনি এই মনোভাবেরই প্রমাণ রেখেছেন।

তিনি বিশ্বাস করতেন, সব প্রতিবেশী দেশের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান থাকা উচিত। ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্ক উন্নত করার লক্ষ্যে তিনি বাসে করে লাহোর সফর করেছিলেন। কিন্তু সেই সদিচ্ছার বিশ্বাসঘাতকতার পর গোটা বিশ্ব প্রত্যক্ষ করেছিল কার্গিল যুদ্ধে ভারতের দৃঢ় প্রতিরোধ এবং পাকিস্তানের পরাজয়।

আগরা শীর্ষ সম্মেলনের সময়ও গোটা ভারত টেলিভিশনের পর্দায় তাঁর দৃঢ়তা প্রত্যক্ষ করেছিল, যখন পাকিস্তানের জেনারেল পারভেজ মোশাররফ বেশ অপ্রত্যাশিতভাবেই সেই সম্মেলন ছেড়ে চলে যান। কিন্তু দেশের স্বার্থের প্রশ্নে অটলজি ছিলেন সত্যিই ‘অটল’—অবিচল ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

পাকিস্তানের কেউ যখন মন্তব্য করেছিলেন, “কাশ্মীর ছাড়া পাকিস্তান অসম্পূর্ণ,” তখন অটলজি অত্যন্ত শান্তভাবে জবাব দিয়েছিলেন, “আমরাও মনে করি, পাকিস্তান ছাড়া ভারত অসম্পূর্ণ।” বিনয়ী অটলজি তাঁর নিজস্ব ব্যঙ্গাত্মক অথচ মার্জিত ভঙ্গিতে অত্যন্ত কঠিন বার্তাও এমনভাবে পৌঁছে দিতে পারতেন যে, প্রতিপক্ষের কাছে আর কোনও উত্তর থাকত না।

দৃঢ় হিন্দু বিশ্বাসে আস্থাশীল হওয়া সত্ত্বেও দেশের বৃহত্তর স্বার্থে প্রয়োজনে নিজের দলের বিরুদ্ধেও অবস্থান নিতে তিনি কখনও পিছপা হননি। তিনি সবসময় ‘রাজধর্ম’-এর ঊর্ধ্বে ‘রাষ্ট্রধর্ম’কে স্থান দিয়েছেন। রাজনৈতিক বিরোধীদের লাগাতার আক্রমণ সত্ত্বেও তিনি তাঁর ধর্মনিরপেক্ষ ও উদার রাজনৈতিক অবস্থান থেকে বিচ্যুত হননি।

একজন মহান দূরদর্শী নেতা হিসেবে তিনি ভারতীয় অর্থনীতিকে গভীর সংকট থেকে বের করে এনেছিলেন। তিনি যখন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার ছিল ভয়াবহ সংকটের মধ্যে। কিন্তু তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বের শেষে ভারতের হাতে ছিল স্বস্তিদায়ক পরিমাণের বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয়।

তাঁর সরকারের অনুসৃত উদারীকরণ, বিশ্বায়ন ও বেসরকারিকরণের নীতিগুলি ভারতকে অগ্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায় এবং আন্তর্জাতিক স্তরে ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর মেয়াদে তিনি এমন অনেক সাফল্য অর্জন করেছিলেন, যা অন্য কোনও নেতা আগে করতে পারেননি। তাঁর স্বপ্নের প্রকল্প ‘গোল্ডেন কোয়াড্রিল্যাটারাল’ ভারতকে পুনরায় বিশ্বের ‘সোনার পাখি’ হয়ে ওঠার লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়ার পথ প্রশস্ত করেছিল। তাঁর নেতৃত্বে ভারতের পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনৈতিক ও শিল্পোন্নয়ন এবং বিশ্বনেতা হিসেবে ভারতের মর্যাদা নতুন গতি লাভ করে। বলা হয়, “ক্ষমতা মানুষকে দুর্নীতিগ্রস্ত করে এবং নিরঙ্কুশ ক্ষমতা মানুষকে সম্পূর্ণরূপে দুর্নীতিগ্রস্ত করে।” কিন্তু মাওয়ের এই বহুল উদ্ধৃত সত্য অটলজির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়নি। তিনি ক্ষমতার সব শিখরে পৌঁছেছিলেন। ভারতের রাজনীতিতে তিনি ছিলেন সবচেয়ে ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের একজন। তবুও ক্ষমতা তাঁর বিনয়, মানবিকতা ও কোমল হৃদয়কে বিন্দুমাত্র কলুষিত করতে পারেনি। ক্ষমতা তাঁর অন্তর্নিহিত কবিসত্তাকে কখনও পরাভূত করতে পারেনি।

প্রকৃতিপ্রেমী অটলজি মায়ের মতো প্রকৃতির কোলে গভীর শান্তি খুঁজে পেতেন। প্রকৃতির সান্নিধ্যই তাঁকে ভারতীয় রাজনীতির বস্তুবাদী ও কলুষিত পরিবেশ থেকে কিছুটা দূরে রাখত। প্রতি বছর মানালিতে তাঁর কিছুটা সময় কাটানো শুধু ব্যস্ত রাজনৈতিক ও জনজীবন থেকে তাঁকে সতেজ হওয়ার সুযোগই দিত না, বরং তাঁর সৃষ্টিশীলতাকেও সমৃদ্ধ করত। তাঁর কবিতায় যার সুন্দর প্রতিফলন দেখা যায়।

সাত দশকেরও বেশি সময় দেশসেবা করা এক রাষ্ট্রনায়ক, এক দূরদর্শী নেতা, এক অনন্য সংসদীয় ব্যক্তিত্ব এবং দেশের প্রতি অতুলনীয় নিষ্ঠার অধিকারী মানুষ—সর্বোপরি একজন মহান মানবিক ব্যক্তিত্ব, যিনি মতাদর্শগত পার্থক্য সত্ত্বেও সকলের ভালোবাসা অর্জন করেছিলেন—অটলজি স্বাধীনতার পর ভারতীয় রাজনীতিতে দেখা সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বদের অন্যতম হয়ে ছিলেন। তাঁর সমগ্র রাজনৈতিক জীবন ছিল নিষ্কলুষ। তিনি শুধু তাঁর সময়ের মানুষের কাছেই আদর্শ নন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও তিনি এক অনুপ্রেরণার উৎস। ভারতীয় রাজনীতির এই ‘অজাতশত্রু’ মানুষের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবেন এবং সকল ভারতীয়কে অনুপ্রাণিত করে যাবেন।

ভারতের গৌরবময় অতীত থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া মূল্যবোধকে তিনি ধারণ করেছিলেন এবং ভারতের উন্নয়নের লক্ষ্যে তা প্রয়োগ করেছিলেন এক দূরদর্শী ভবিষ্যৎ-চিন্তার সঙ্গে। তিনি আজ আমাদের মধ্যে নেই, কিন্তু তিনি যে পথ দেখিয়ে গেছেন, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পথ দেখিয়ে যাবে। ভারতকে একবিংশ শতাব্দীর দ্বারপ্রান্তে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সেই মহান নেতাকে মানুষ চিরকাল স্মরণ করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *