বরাক তরঙ্গ, ১১ মার্চ : আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে বুধবার গুরুচরণ বিশ্ববিদ্যালয়ের কনফারেন্স হলে গুরুচরণ বিশ্ববিদ্যালয়ের কিরণশশী উইমেন্স সেল এবং ইস্টার্ন ক্রনিকল–এর যৌথ উদ্যোগে একটি নারী সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সম্মেলনের মূল বিষয় ছিল “সকল নারী ও কন্যাদের জন্য অধিকার, ন্যায়বিচার ও কার্যকর পদক্ষেপ।”
সম্মেলনে বিশিষ্ট অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অসম পুলিশের দক্ষিণ রেঞ্জের ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল জয়শ্রী খেরসা, আইনজীবী বিথিকা আচার্য, ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপিকা সুপর্ণা রায়, স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ মনিকা দেব এবং ইস্টার্ন ক্রনিকল-এর সম্পাদক ডা. সুজাতা চৌধুরী ধর। কিরণশশী উইমেন্স সেলের কোষাধ্যক্ষ ড. দীপা নাথ স্বাগত ভাষণ প্রদান করেন।
সভাপতির বক্তব্যে গুরুচরণ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নিরঞ্জন রায় প্রাচীন ভারতীয় দর্শনের আলোকে মানব জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, জ্ঞান ও সচেতনতার মাধ্যমে মানুষ মায়া থেকে সত্যের দিকে অগ্রসর হয়। নারীর ক্ষমতায়নের প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন যে, বর্তমানে নারীর উন্নয়ন থেকে নারী-কেন্দ্রিক এবং নারী-নেতৃত্বাধীন উন্নয়নের দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটছে, যা ২০৪৭ সালের মধ্যে একটি উন্নত ভারত গড়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি “জেন্ডার ডিভিডেন্ড”-এর ধারণার উপর জোর দিয়ে বলেন, ভারতের বিশ্বগুরু হওয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে সবক্ষেত্রে নারীদের অধিক অংশগ্রহণ অপরিহার্য। তিনি তরুণীদের দেশ গঠনে নেতৃত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।
জয়শ্রী খেরসা নারীদের নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিভিন্ন বাস্তব পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, যৌন হয়রানির অভিযোগ জানানোর জন্য একটি অনলাইন পোর্টাল এবং ইলেকট্রনিক কমপ্লেইন বক্স চালু রয়েছে। টোল-ফ্রি নম্বর ১১২-এ ফোন করেও হয়রানির অভিযোগ জানানো যায় এবং শীঘ্রই জিপিএস-সুবিধাযুক্ত পুলিশ যানবাহন দ্রুত সাড়া দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত হবে। তিনি নির্ভয়ে অভিযোগ জানানোর জন্য উৎসাহ দেন এবং সকল আগ্রহী নারীর জন্য আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ শিবিরের কথাও উল্লেখ করেন।
ড. প্রদীপ্তা দে কিরণশশী নাগকে স্মরণ করে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তিনি নাগকে একজন দূরদর্শী শিক্ষাবিদ, সমাজসেবী ও দানশীল ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন এবং জানান যে তিনি প্রতিষ্ঠানের সূচনায় ১০,০০০ টাকা দান করেছিলেন।

অধ্যাপিকা সুপর্ণা রায় নারীদের বহুমুখী ভূমিকার কথা তুলে ধরে তাঁদের শক্তি, ধৈর্য ও নিষ্ঠার প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, বৈদিক যুগ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত বহু অনুপ্রেরণাদায়ী নারী নেতৃত্বের উদাহরণ রয়েছে। তাঁর মতে, নারীর প্রতি অপরাধের মূল কারণ সমাজে নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়। প্রকৃত ক্ষমতায়ন আসে আত্মবিশ্বাস, সচেতনতা এবং অন্তর্নিহিত শক্তি থেকে।
বিথিকা আচার্য বলেন, লিঙ্গ বৈষম্য সমাজের অগ্রগতির একটি বড় বাধা। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে ভারতের সংবিধান নারী-পুরুষ সকলের সমান অধিকার নিশ্চিত করেছে। তিনি নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উইমেন্স সেল, পুলিশ এবং অন্যান্য সহায়ক ব্যবস্থার ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন এবং একটি সম্মানজনক ও নিরাপদ সমাজ গঠনে পুরুষদের সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানান।
ডা. সুজাতা চৌধুরী ধর “Give to Gain” ধারণার আলোকে সমাজে ইতিবাচক অবদান রাখার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, প্রতি বছর ৮ মার্চ জাতিসংঘের উদ্যোগে পালিত আন্তর্জাতিক নারী দিবস কেবল উদযাপনের দিন নয়; এটি নারীদের সৃজনশীলতা, নেতৃত্ব, লালনশীলতা ও পরিবর্তন আনার ক্ষমতাকে স্বীকৃতি দেওয়ার দিন। তিনি সামাজিক মাধ্যমে তথ্যের আগে মতামত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করে মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের প্রতি সমান গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।
ডাঃ মনিকা দেব সমাজের পরিবর্তিত মানসিকতার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এক সময় যেখানে পুত্রসন্তানের প্রতি বেশি আগ্রহ দেখা যেত, এখন কন্যাসন্তান জন্মকেও আনন্দের সঙ্গে স্বাগত জানানো হয়। তিনি উল্লেখ করেন যে একটি পরিবারের প্রকৃত শক্তি নারী ও পুরুষ উভয়ের অবদানের উপর নির্ভর করে।
অনুষ্ঠানে একটি ইন্টারঅ্যাকটিভ সেশনও অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে গুরুচরণ বিশ্ববিদ্যালয়ের শৈক্ষিক নিবন্ধক ড. অভিজিৎ নাথ উপস্থিত ছিলেন। বিকম দ্বিতীয় সেমেস্টারের ছাত্রী প্রিয়াংশী রায়ের পরিবেশিত উদ্বোধনী নৃত্যের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। ধন্যবাদ সূচক বক্তব্য রাখেন ড. মনিষা গোস্বামী এবং পুরো অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ড. শ্রেষ্ঠা কর।



