বরাক তরঙ্গ, ২৫ জানুয়ারি : উত্তর ত্রিপুরায় আতঙ্কের আরেক নাম পাথরবোঝাই ডাম্পার। একের পর এক দুর্ঘটনা, থামছে না প্রাণহানি। ফের এক মর্মান্তিক পথ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন জেঠু ও ভাইপো। ঘটনাকে ঘিরে জাতীয় সড়ক অবরোধ করে ক্ষোভে ফেটে পড়লেন সাধারণ মানুষ। আট নম্বর জাতীয় সড়ক যেন আর যাতায়াতের পথ নয়, রীতিমতো মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে।
শনিবার রাতে চুরাইবাড়ি থানাধীন শনিছড়া বাজার সংলগ্ন ৮ নম্বর অসম–আগরতলা জাতীয় সড়কে এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন বাগবাসা গ্রাম পঞ্চায়েতের ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা তপন দাম (৫৩) এবং তাঁর ১৪ বছরের ভাইপো আয়ুষ দাম। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তপন দাম ভাইপোকে সঙ্গে নিয়ে শনিছড়া বাজারের দিকে যাচ্ছিলেন। সেই সময় পেছন দিক থেকে আসা একটি তীব্রগতির পাথরবোঝাই ডাম্পার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তাঁদের সজোরে ধাক্কা মেরে পালিয়ে যায়।
ধাক্কার তীব্রতায় দু’জনেই রাস্তায় ছিটকে পড়েন। স্থানীয় বাসিন্দারা ছুটে এসে তাঁদের উদ্ধার করে শনিছড়া প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক আয়ুষ দামকে মৃত ঘোষণা করেন। তপন দামের অবস্থাও আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাঁকে ধর্মনগর জেলা হাসপাতালে পাঠানো হয়। কিন্তু সেখানেও শেষরক্ষা হয়নি—চিকিৎসা শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর মৃত্যু হয়। এক রাতেই নিভে গেল একটি পরিবারের দুই প্রদীপ। শোকস্তব্ধ গোটা বাগবাসা এলাকা।
ঘটনার খবর পুলিশকে জানানো হলেও অভিযোগ, দীর্ঘ সময় পুলিশ ঘটনাস্থলে না পৌঁছানোয় ক্ষোভে ফেটে পড়েন স্থানীয়রা। উত্তেজিত জনতা জাতীয় সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে অবরোধে বসেন। পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছান বাগবাসা বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক যাদব লাল নাথ। তবে তাঁর উপস্থিতিতেও জনরোষ প্রশমিত হয়নি। অবরোধকারীদের প্রশ্ন—ঘটনার পর এত দেরিতে পুলিশ কেন এল?
অবরোধকারীদের দাবি, রাতভর বেপরোয়া গতিতে ডাম্পার চলাচলের কারণেই একের পর এক প্রাণ ঝরছে। এই মৃত্যুমিছিল বন্ধ করতে রাত ১০টা থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত জাতীয় সড়কে পাথরবোঝাই ডাম্পার চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পরে ঘটনাস্থলে পৌঁছান মহকুমা পুলিশ আধিকারিক জয়ন্ত কর্মকার। তিনি যথাযথ তদন্ত, দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তাঁর আশ্বাসে শেষ পর্যন্ত অবরোধ প্রত্যাহার করা হয়।
এদিকে, পুলিশ দ্রুত অভিযান চালিয়ে দুর্ঘটনায় জড়িত TR05C-1847 নম্বরের ডাম্পারটি আটক করে। গ্রেফতার করা হয় চালক জোয়েল আহমেদ (৩৫), বাড়ি পানিসাগরের রামনগর এলাকায়। পুলিশ জানিয়েছে, ডাম্পারের কাগজপত্র যাচাইসহ চালকের বিরুদ্ধে একাধিক ধারায় মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু হয়েছে।
এই দুর্ঘটনায় গোটা এলাকা জুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। একই সঙ্গে ডাম্পারের বেপরোয়া দৌরাত্ম্য নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে—আর কত প্রাণ গেলে প্রশাসনের টনক নড়বে? জাতীয় সড়ক কি তবে শুধু ডাম্পারের জন্য, সাধারণ মানুষের জন্য নয়?



