বরাক তরঙ্গ, ৫ নভেম্বর : পবিত্র কোরান ও হাদিসের প্রকৃত শিক্ষাকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অনুসরণ করে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ গঠনের আহ্বানের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হলো আগরতলার প্রমোদনগরস্থিত প্রমোদনগর আলজামিয়াতুল ইসলামিয়াতুল জলিলিয়াহ জগাইবাড়ি মাদ্রাসার বার্ষিক ইসলামি সমাবেশ। নতুন প্রজন্মকে দ্বীনি ও আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে নৈতিকতা, মানবিকতা ও উত্তম চরিত্রে গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন বক্তারা।
বুধবার মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে আয়োজিত এই সমাবেশে আলেম-উলামা, শিক্ষাবিদ, সমাজকর্মী, সাংবাদিক, অভিভাবক ও ধর্মপ্রাণ মানুষের উপস্থিতিতে এক ভাবগম্ভীর ধর্মীয় পরিবেশের সৃষ্টি হয়। সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উত্তর-পূর্ব ভারতের নাইবে আমিরে শরিয়ত তথা বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ মওলানা বদরুল হক এমনি। বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, পবিত্র কোরআন কেবল তেলাওয়াতের গ্রন্থ নয়, বরং মানবজাতির জীবন পরিচালনার পূর্ণাঙ্গ পথনির্দেশিকা। ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক দায়িত্ব, লেনদেন, ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই কোরআনের শিক্ষা অনুসরণ করা প্রত্যেক মুসলমানের কর্তব্য।

তিনি বলেন, বর্তমান সমাজে নৈতিক অবক্ষয়, হিংসা-বিদ্বেষ, অন্যায় ও অশান্তি থেকে মুক্তি পেতে ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা এবং পবিত্র কোরআনের আদর্শকে জীবনে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ধর্মীয় অনুশাসনকে শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে বাস্তব জীবনে তার প্রতিফলন ঘটাতে হবে।
নতুন প্রজন্মের চরিত্র গঠনের প্রসঙ্গে তিনি অভিভাবকদের উদ্দেশে বলেন, সন্তানদের শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। তাদের মধ্যে ধর্মীয় জ্ঞান, নৈতিকতা, শিষ্টাচার, মানবিকতা ও উত্তম চরিত্রের বিকাশ ঘটানোও জরুরি। দ্বীনি শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত একটি প্রজন্মই ভবিষ্যতে সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবে।

মাদ্রাসার মুহতামিম তথা ত্রিপুরা রাজ্য নাদওয়ার সম্পাদক মাওলানা জাকির হোসেন আলজলিলীর পৌরোহিত্যে অনুষ্ঠিত সমাবেশে অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন ত্রিপুরার বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সমাজসেবী মওলানা ড. জাহিরুল হক, দাওধারানী সিদ্দিকিয়া ফাজিল মাদ্রাসার প্রবীণ শিক্ষক মাওলানা মুফতি সফিকুল ইসলাম এবং সোনাপুর আহমাদিয়া সিনিয়র মাদ্রাসার প্রাক্তন শিক্ষক মওলানা মুফতি আব্দুল কাদির। বক্তারা দ্বীনি শিক্ষার প্রসার, শিক্ষার্থীদের নৈতিক ও চারিত্রিক উৎকর্ষ সাধন এবং সমাজে সম্প্রীতি ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
দিনব্যাপী এই অনুষ্ঠানের প্রথম অধিবেশনে মাদ্রাসার ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। শিক্ষার্থীদের মেধা, প্রতিভা ও সৃজনশীলতার বিকাশের লক্ষ্যে আয়োজিত এসব অনুষ্ঠানে তাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য। সন্ধ্যার পর শুরু হয় সমাবেশের দ্বিতীয় অধিবেশন। ধর্মীয় আলোচনা, কোরান-হাদিসের আলোকে জীবন গঠনের নসিহত এবং আলেম-উলামাদের মূল্যবান বক্তব্যে মুখরিত হয়ে ওঠে মাদ্রাসা প্রাঙ্গণ। রাত প্রায় ১২টা পর্যন্ত চলে এই অধিবেশন।
এদিনের অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল মাদ্রাসার বার্ষিক মুখপত্র ‘জামিয়া দর্পণ’-এর দ্বিতীয় সংখ্যার আনুষ্ঠানিক উন্মোচন। প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ও বিভিন্ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরার ক্ষেত্রে এই প্রকাশনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন উপস্থিত বিশিষ্টজনেরা। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে লেখালেখি ও জ্ঞানচর্চার আগ্রহ বাড়াতেও এই উদ্যোগ সহায়ক হবে বলে মত প্রকাশ করা হয়।

সমাবেশে আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সমাজকর্মী রামানন্দ দেববর্মা, জম্পুইজলা প্রেসক্লাবের সম্পাদক শিবু দেববর্মা, পাথারকান্দি সাংবাদিক সংস্থার সম্পাদক মুজির উদ্দিন, মহরম আলী, সুহেল আলম, আমজাদ হোসেন, মাওলানা তাজেল ইসলাম, সাদেক মিয়া, সাংবাদিক মুহাম্মাদ মামুনসহ এলাকার বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি ও গণ্যমান্য নাগরিক।
উল্লেখ্য, দ্বীনি শিক্ষার প্রসারের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের মধ্যে নৈতিকতা, মানবিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা জাগ্রত করার লক্ষ্যে এ ধরনের বার্ষিক ইসলামী সমাবেশ বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। শিক্ষার সঙ্গে আদর্শ চরিত্র গঠনের সমন্বয় ঘটিয়ে একটি সুস্থ ও সম্প্রীতিপূর্ণ সমাজ নির্মাণের বার্তাই উঠে আসে এবারের সমাবেশে।
সমাবেশ শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়ায় অভ্যর্থনা কমিটির সভাপতি মাওলানা মুজিবুর রহমান এবং সম্পাদক গোলাপ মোস্তফা আলেম-উলামা, অতিথি, অভিভাবক, স্বেচ্ছাসেবক, এলাকার জনগণ ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। সকলের সম্মিলিত সহযোগিতা ও অংশগ্রহণেই অনুষ্ঠানটি সফল হয়েছে বলে তাঁরা জানান।



