অপারেশন সিঁদুর থেকে জাতীয় নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্য, কৃষ্ণমূর্তি স্মারক বক্তৃতায় প্রাক্তন সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদী

Spread the news

দীপ দেব, শিলচর।
বরাক তরঙ্গ, ৩ নভেম্বর : জাতীয় নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি, সামরিক প্রস্তুতি থেকে শুরু করে জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা পরিষেবা—বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা ও মতামত তুলে ধরলেন ভারতের প্রাক্তন সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদী। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় শিলচরের কাছাড় ক্যানসার হাসপাতাল ও গবেষণা কেন্দ্রের উদ্যোগে হাসপাতাল চত্বরে আয়োজিত মর্যাদাপূর্ণ ‘ডাঃ এস. কৃষ্ণমূর্তি স্মারক বক্তৃতা’ অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত থেকে তিনি এসব বিষয়ে বক্তব্য রাখেন।

মাঙ্গলিক প্রদীপ প্রজ্বলনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। বক্তব্যের শুরুতে জেনারেল দ্বিবেদী ২০২৫ সালের মে মাসে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর পরিচালিত ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর প্রেক্ষাপট ও অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, ৭ ও ৮ মে-র মধ্যবর্তী রাতে তিন বাহিনীর সমন্বয়ে এই অভিযান পরিচালিত হয়েছিল। এটি কোনও ঘোষিত যুদ্ধ ছিল না, বরং সন্ত্রাসবাদী পরিকাঠামো ধ্বংসের লক্ষ্যে পরিচালিত একটি সুনির্দিষ্ট অভিযান ছিল।

অভিযানের নামকরণ প্রসঙ্গে তিনি জানান, ২৯ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে আলোচনার সময় প্রধানমন্ত্রীই ‘অপারেশন সিঁদুর’ নামটি প্রস্তাব করেছিলেন। তাঁর কথায়, ভারতের লক্ষ্য পাকিস্তানকে ধ্বংস করা ছিল না, বরং সন্ত্রাসবাদী এবং তাদের মদতদাতাদের পরিকাঠামো নির্মূল করাই ছিল অভিযানের উদ্দেশ্য। তিনি জানান, দেশের ২৪৪টি জেলায় নাগরিক প্রতিরক্ষা মহড়া চালানোর পাশাপাশি নির্দিষ্ট সামরিক অভিযানের মাধ্যমে সন্ত্রাসবাদীদের নয়টি প্রধান ঘাঁটি ধ্বংস করা হয়। সাধারণ নাগরিকদের প্রাণহানি এড়াতে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে জেনারেল দ্বিবেদী বলেন, ভারত বরাবরই শান্তি, আলোচনা ও কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে। তবে চিনের পাশাপাশি পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের পরিবর্তিত সম্পর্ক এবং পশ্চিম এশিয়ার অস্থির পরিস্থিতি ভারতের নিরাপত্তা ও সামরিক কৌশলের ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ও জলসংকট এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, এত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও দেশটি বাজেটের উল্লেখযোগ্য অংশ সামরিক খাতে ব্যয় করছে। তবে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারত হস্তক্ষেপ করবে না বলেও স্পষ্ট করেন তিনি। পাশাপাশি আধুনিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সাইবার হামলা ও বিশ্বজুড়ে আধিপত্যবাদী প্রবণতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

সামরিক পেশা ও চিকিৎসা পরিষেবার মধ্যে তুলনা টেনে প্রাক্তন সেনাপ্রধান বলেন, সৈনিক এবং চিকিৎসকদের কর্মজীবনের মধ্যে গভীর মিল রয়েছে। উভয় পেশার মানুষই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে মানুষের জীবন রক্ষা ও সেবার কাজে নিয়োজিত থাকেন। তাঁর মতে, সৈনিক কিংবা চিকিৎসক—কেউই প্রকৃত অর্থে অবসর গ্রহণ করেন না। মানুষের প্রতি সেবার মানসিকতা আজীবন তাঁদের মধ্যে থেকে যায়।

জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা গবেষণার প্রসঙ্গে তিনি রোগ নিরাময়ের পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধ এবং প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। যুদ্ধক্ষেত্র হোক কিংবা চিকিৎসাক্ষেত্র, সময়মতো বিপদের পূর্বাভাস ও যথাযথ পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন তিনি। আগামী ৯ নভেম্বর থেকে ওষুধের সর্বোচ্চ খুচরা বিক্রয়মূল্য (এমআরপি) কমানোর সিদ্ধান্তকেও স্বাগত জানান জেনারেল দ্বিবেদী।

কাছাড় ক্যানসার হাসপাতাল ও গবেষণা কেন্দ্রের প্রশংসা করে তিনি প্রতিষ্ঠানটিকে একটি ‘গণআন্দোলন’ হিসেবে অভিহিত করেন। হাসপাতালের উন্নয়ন ও জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডে ডাঃ রবি কান্নান এবং পদ্মশ্রী ডাঃ এস. কৃষ্ণমূর্তির অবদানের ভূয়সী প্রশংসা করেন তিনি। ২০১৮ সালে নিজের প্রথম হাসপাতাল সফরের স্মৃতিচারণ করে বর্তমান অগ্রগতি দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেন প্রাক্তন সেনাপ্রধান।

অনুষ্ঠানে স্বাগত ভাষণ দেন হাসপাতালের চেয়ারপার্সন ডাঃ সুজিত নন্দী পুরকায়স্থ। স্মারকপত্র উপস্থাপন করেন পদ্মশ্রী ডাঃ রবি কান্নান এবং ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন হাসপাতালের সাধারণ সম্পাদক মৃদুল মজুমদার। অনুষ্ঠানে ডাঃ কুমারকান্তি দাস, তৈমুর রাজা চৌধুরী-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের পরিসমাপ্তি ঘটে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *