
৩১ অক্টোবর : ইজরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচনে কোনও পক্ষই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন নিশ্চিত করতে পারেনি। চূড়ান্ত ফলাফলে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট ৫৩টি আসন পেয়েছে। অন্যদিকে, বিরোধী জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন। আরব নেতৃত্বাধীন দুই দল জয়েন্ট লিস্ট ও রা’আম পেয়েছে মোট ১৯টি আসন। ফলে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে বিকল্প সরকার গঠনের সম্ভাবনা থাকলেও জোটের সমীকরণ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
শুক্রবার প্রকাশিত চূড়ান্ত ফলাফল অনুযায়ী, ১২০ আসনের নেসেটে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি এককভাবে ২৭টি আসন পেয়েছে। বিরোধী জোটের প্রধান দল গাদি আইজেনকটের ইয়াশার পেয়েছে ২১টি আসন। নাফতালি বেনেটের বি’ইয়াচাদ পেয়েছে ১২টি, জয়েন্ট লিস্ট ১১টি এবং ডেমোক্র্যাটস ও রাআম পেয়েছে আটটি করে আসন। নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ, যা কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ।
নেতানিয়াহুবিরোধী জোটের সঙ্গে আরব দল দু’টি যুক্ত হলে মোট আসন দাঁড়াবে ৬৭টিতে, যা সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার চেয়ে বেশি। তবে বিরোধী শিবিরের কয়েকটি দল আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট সরকার গঠনের বিরোধিতা করায় এই সমীকরণ বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়েছে।
নেতানিয়াহুকে সরিয়ে বিকল্প সরকার গঠনের লক্ষ্যে বৃহস্পতিবার বিরোধী শিবিরের নেতারা দফায় দফায় বৈঠক করেন। ডেমোক্র্যাটস দলের চেয়ারম্যান ইয়ার গোলান রাআমের চেয়ারম্যান মনসুর আব্বাস, ইয়াশারের চেয়ারম্যান গাদি আইজেনকট এবং বিরোধী নেতা ইয়ার লাপিদের সঙ্গে আলোচনা করেন। অন্যদিকে, বি’ইয়াচাদের চেয়ারম্যান নাফতালি বেনেটও আইজেনকট ও গোলানের সঙ্গে বৈঠক করেন।
টাইমস অব ইজরায়েলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিরোধী জোটের চারটি ইহুদি নেতৃত্বাধীন দলের মধ্যে ইয়াশার, বি’ইয়াচাদ ও ইজরায়েল বেইতেনু আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট সরকার গঠনের বিরোধিতা করেছে। বিপরীতে, ডেমোক্র্যাটসের চেয়ারম্যান গোলান আরব দলগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন। ফলে আরব দলগুলোর ১৯টি আসন বিরোধীদের সম্ভাব্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে পারলেও সরকার গঠনের পথ এখনো পরিষ্কার নয়।

শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে লাপিদ বিরোধী শিবিরের সমর্থকদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বিরোধীরা সরাসরি ও নিরঙ্কুশ জয় চেয়েছিলেন, কিন্তু তা হয়নি। তবে নেতানিয়াহুর জোট আগের পার্লামেন্টের ৬৮টি আসন থেকে কমে ৫৩টিতে নেমেছে। এই ফলকে বিরোধীদের জয় হিসেবে উল্লেখ করে লাপিদ বলেন, ব্যবধান কম হলেও জয় জয়ই।
নেতানিয়াহুর জোটের ৫৩টি আসনের মধ্যে অতি-রক্ষণশীল ইহুদি দল শাস পেয়েছে ছয়টি এবং ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম পেয়েছে সাতটি আসন। লাপিদ এই ১৩টি আসনকে এমন দলগুলোর বলে উল্লেখ করেন, যারা নিজেদের জায়নবাদী হিসেবে বিবেচনা করে না। তাঁর মতে, এই আসনগুলো বাদ দিলে নেতানিয়াহুর জোটের বাকি আসন থাকে ৪০টি। তবে এই হিসাব বিরোধী জোটের সরকার গঠনের নিশ্চয়তা দেয় না।
এদিকে, নিজেদের ডানপন্থী জোটের ঐক্য ধরে রাখতে তৎপর নেতানিয়াহুও। বৃহস্পতিবার জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ও ওতজমা ইহুদিতের চেয়ারম্যান ইতামার বেন-গভিরের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেন তিনি। একই দিনে রিলিজিয়াস জায়নিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান বেজালেল স্মোট্রিচের সঙ্গেও আলোচনা করেন নেতানিয়াহু। বৈঠকগুলোতে ডানপন্থী জোটের ঐক্য ধরে রাখা এবং বিরোধীদের নেতৃত্বে সরকার গঠনের সম্ভাবনা ঠেকানোর বিষয়টি গুরুত্ব পায়। টাইমস অব ইজরায়েলের খবরে বলা হয়েছে, শরিকদের সঙ্গে একসঙ্গে থাকার বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছেন নেতানিয়াহু।
সরকার গঠনের আলোচনার পাশাপাশি নতুন নেসেটের অধিবেশনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন আইজেনকট। তাঁর দল পার্লামেন্টের অধিবেশন শুরু হলে কয়েকটি বিল উত্থাপনের পরিকল্পনা করছে। এর মধ্যে সব ইজরায়েলি নাগরিকের জন্য সামরিক বাহিনীতে নিয়োগ অথবা জাতীয় সেবা বাধ্যতামূলক করা, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা ও হত্যাকাণ্ডের তদন্তে রাষ্ট্রীয় কমিশন গঠন এবং বাজেট বরাদ্দের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার প্রস্তাব রয়েছে।

নতুন নেসেটের শপথ অনুষ্ঠান আগামী ১০ নভেম্বর হওয়ার কথা। সরকার গঠনের আলোচনা দীর্ঘায়িত হলেও নির্ধারিত দিনেই পার্লামেন্টের অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। জোট গঠনে সমঝোতা না হলে রাজনৈতিক অচলাবস্থা দীর্ঘ হতে পারে; এমনকি নতুন নির্বাচনের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
নির্বাচনে বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ ঘিরেও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেইতের প্রধান ডেভিড জিনি এবং কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির চেয়ারম্যান বিচারপতি নোয়াম সোলবার্গের সঙ্গে বৈঠক করেন আইজেনকট। তিনি বলেন, বিদেশি হস্তক্ষেপ হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত করে বলার সময় এখনো আসেনি। তদন্তকারী সংস্থাগুলোকে রাজনৈতিক চাপের বাইরে থেকে কাজ করতে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ডিন লিভনে ব্যাপক নির্বাচনী জালিয়াতির অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেছেন। নির্বাচন কমিটি জানিয়েছে, বিদেশি হস্তক্ষেপ ও ভোট জালিয়াতির অভিযোগের তদন্ত চূড়ান্ত ফলাফলে প্রভাব ফেলবে না। আইন মেনে ভোট দেওয়া আরব নাগরিকদের সামগ্রিকভাবে সন্দেহের চোখে না দেখার বিষয়েও সতর্ক করেছে সংস্থাটি।
তথ্যসূত্র: টাইমস অব ইজরায়েল, খবর : দৈনিক ইনকিলাব পত্রিকা ডিজিটাল।



