শেষ পর্ব
।। প্রদীপ দত্তরায়।।
(লেখক ছাত্র সংগঠন আকসার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও গৌহাটি হাইকোর্টের আইনজীবী)
২৮ অক্টোবর : ইসিআইনেট/ ইআরওনেট
নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা পরিচালনার ডিজিটাল ব্যবস্থা ইআরওনেট এবং তার পরবর্তী বৃহত্তর প্ল্যাটফর্ম ইআরসিনেট-কে ঘিরেও বিতর্কের সুত্রপাত হয়েছে । প্রশ্ন উঠেছে—ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজে ব্যবহৃত সফটওয়্যার কি আইননির্ধারিত ক্ষমতাসম্পন্ন নির্বাচনী আধিকারিকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করতে পারে?
গোয়ার ঘটনা এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, গোয়ায় ৯৭ জন ভোটারকে প্রথমে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি’ বা তথ্যগত অসংগতির কারণে চিহ্নিত করা হলেও পরে তাঁদের বৈধ বলে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু ইসিআইনেট ব্যবস্থায় একবার নাম বাদ পড়লে তা পুনর্বহালের জন্য প্রয়োজনীয় ‘রোলব্যাক’ ব্যবস্থা না থাকায় তাঁদের নাম চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় ফিরিয়ে আনা যায়নি বলে অভিযোগ ওঠে। গোয়ার মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দপ্তর এ বিষয়ে এক সপ্তাহে আটটি ই-মেল পাঠিয়েছিল বলেও সংবাদে প্রকাশিত হয়।
অন্য একটি ঘটনায়, গোয়ার সান্তা ক্রুজ বিধানসভা এলাকার একই পরিবারের ছয় সদস্য বাড়ি বদলানোর পর ঠিকানা পরিবর্তনের জন্য নির্ধারিত ফর্ম ৮ জমা দেন। কিন্তু ইআরওনেট-এ তাঁদের এপিক বা ভোটার পরিচয়পত্রের রেকর্ড না পাওয়ায় আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয় বলে তাঁদের অভিযোগ। এরপর বম্বে হাইকোর্টের গোয়া বেঞ্চ প্রশ্ন তোলে—সফটওয়্যার আবেদন গ্রহণ করতে পারছে না বলে কি বৈধ ভোটারের নাম বাদ পড়তে পারে? আদালত স্পষ্ট করে যে, প্রশাসনিক সফটওয়্যার আইনকে অতিক্রম করতে পারে না; খসড়া ভোটার তালিকাও নাম বাদ দেওয়ার স্বয়ংসম্পূর্ণ ভিত্তি হতে পারে না।
পশ্চিমবঙ্গেও অনেক ইআরও এবং বিএলওরা অভিযোগ করেছেন যে তাঁরা চাইলেও কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রয়োজনীয় তথ্য আপলোড করতে পারছেন না বা একবার করলেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে তা বদলে যাচ্ছে বা বদলে দেওয়া হচ্ছে।
এই ঘটনাগুলি থেকে নির্বাচন কমিশনের সফটওয়্যার ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা, সংশোধনের সুযোগ, সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা এবং দায়বদ্ধতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

এসআইআর এর মাধ্যমে এখন অবধি ১৬টি রাজ্য ও তিনটি ইউনিয়ন টেরিটেরির ভোটার তালিকা সংশোধিত হয়েছে। মোট ভোটার বাদ পড়েছেন প্রায় ১৩ কোটি। লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির জন্য বাদ পড়ার সংখ্যা ১ কোটি ৭০ লক্ষ।
৮. কমিশনের বয়ান ও সর্বশেষ পদক্ষেপ:
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের বহু চর্চিত রিপোর্টে বলা হয়েছে যে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে ১০ মাসে ১৪ বার লিখিত নোট পাঠিয়েছেন বাকি দুই কমিশনার। অনেক সিদ্ধান্ত তাঁদের অন্ধকারে রেখে নেওয়া হয়েছে। যৌথ বৈঠক হয়নি, বৈঠকের কার্যবিবরণী লিপিবদ্ধ, ইত্যাদি। এসব মিথ্যা হলে দুই কমিশনার প্রকাশ্যে তার বিরোধিতা করে বক্তব্য পেশ করতে পারতেন। কিন্তু তা তাঁরা করেননি। পরিবর্তে আমরা কি দেখলাম? প্রথম নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে একটি লিখিত বিবৃতি দেওয়া হল যে সমস্ত সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতভাবেই নেওয়া হয়েছে। এরপর একটি যৌথ বৈঠক শেষে কিছু বক্তব্য পেশ করা হল, ভোটার তালিকা সংশোধনের ক্ষেত্রে কিছু পদক্ষেপের কথা জানানো হল। আনম্যাপড ও লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সির নোটিসপ্রাপ্ত ভোটারদের বাড়িতে বুথ লেভেল অফিসারদের (BLO) পাঠিয়ে নথি সংগ্রহ, প্রয়োজনে অনলাইন শুনানি, গৃহহীন ও অসহায় ভোটারদের জন্য বিশেষ সহায়তা শিবির এবং বাদ পড়া ভোটারদের নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্তির সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি ইসিআইনেট ব্যবস্থার আইনসম্মততা ও প্রযুক্তিগত কার্যকারিতা খতিয়ে দেখতে বিশেষজ্ঞ-সহ কমিটি গঠনের কথাও জানানো হয়। সম্প্রতি এইসব ব্যাপারে সমস্ত রাজ্যে পুনরায় নির্দেশ পাঠানো হয়েছে, এমনকি ফর্ম ৬ থেকে নতুন সংযোজনীও বাদ দেওয়া হয়েছে। পুরোনো ফর্ম দিয়েই আবার নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তির আবেদন করতে পারবেন।
৯. এস আই আর এর উদ্দেশ্য:
নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকার ঝাড়াই পোছাই এ প্রতিবার চলে। প্রশ্ন উঠতেই পারে হটাৎ করে সারা দেশে এস আই আর করার সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হল? এর একটি ঘোষিত উদ্দেশ্য রয়েছে। এস আই আর এর মাধ্যমে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী শনাক্ত করা এবং তাদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়াই এই ঘোষিত উদ্দেশ্য। এই উদ্দেশ্য নিয়ে কারোর কোন দ্বিমত থাকার কথা নয়। কোন সচেতন নাগরিকই চাইবেন না যে কোন অবৈধ অনুপ্রবেশকারী এদেশে থাকুক বা পরিচয় লুকিয়ে সরকারি সুযোগ সুবিধার লাভ তুলুক। কিন্তু অনুপ্রবেশকারী খুঁজতে গিয়ে সাধারণ বৈধ নাগরিকদের কিভাবে অসুবিধা ভোগ করতে হয় এবং চূড়ান্ত ফলাফল কি দাঁড়ায় তা আমরা আসাম এন আর সির সময় প্রত্যক্ষভাবে দেখেছি। অনুপ্রবেশ যে আমাদের দেশে হচ্ছে না,তা মোটেই নয়। পেটের বা নিরাপত্তার বা একটু ভালো জীবনযাপনের তাগিদে প্রান্তিক মানুষ কাঁটাতার ডিঙোয়,সীমানা পেরিয়ে ঢুকে পড়ে অন্য দেশে – এ সারা পৃথিবী জুড়েই চলে। কিন্তু তার সংখ্যা কত ? আসলে এই সংখ্যা নিয়ে একটি সন্দেহ হয়তো ইচ্ছে করেই ছড়িয়ে দেওয়া হয়,যার বাস্তব ভিত্তি নেই। স্মরণ করুন আসামের প্রাক্তন রাজ্যপাল এস কে সিনহার সেই রিপোর্ট যাতে বলা হয়েছিল প্রতিদিনই রাজ্যে লক্ষাধিক অনুপ্রবেশকারী ঢুকছে, যাতে রাজ্য তথা দেশের জনবিন্যাসই পরিবর্তিত হয়ে পড়ছে। কিন্তু এন আর সির ফলাফল কি তাতে মান্যতা দিল? মোটেই নয়। আমরা জানি যে চূড়ান্ত তালিকা থেকে যে উনিশ লাখ বাদ পড়েছেন তাদের অধিকাংশই এমন যাদের ছেলের নাম এসেছে বাবার নাম আসেনি, বোনের এসেছে, ভাইয়ের আসেনি এরকম। রিজেকশন স্লিপ দিয়ে শুনানি শেষ করলে হয়তো সর্বাধিক এক/ দুই লক্ষ চূড়ান্ত তালিকায় ঠাঁই পাবেন না। আর এর বাইরে যদি কেউ অবৈধ অনুপ্রবেশকারী থেকে থাকেন তবে তাঁরা ভোট,সরকারি সুযোগ এসবের বাইরে অবস্থান করছেন,কাজেই ভোটার তালিকা সংশোধনের মাধ্যমে এদের শনাক্ত করা সম্ভব নয়। পশ্চিমবঙ্গেও এমনি কোটি কোটি অবৈধ অনুপ্রবেশকারী রয়েছে বলে একটি সন্দেহ অনেকদিন ধরে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এস আই আর এর পর যখন নির্বাচন কমিশনকে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে যে এখন অবধি কজন অবৈধ অনুপ্রবেশকারী বা রোহিঙ্গা শনাক্ত হয়েছে তখন তাঁরা এই ব্যাপারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের কাছে খোঁজ নিতে বলছেন। যখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকে জানতে চাওয়া হচ্ছে, তাঁরা নির্বাচন কমিশনের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। অসম এনআরসি,যা সুপ্রিম কোর্টের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে হয়েছে তার তথ্যকে ভিত্তি করে আমার ব্যক্তিগত ধারনা যে যদি সারা দেশে খুজেঁ বের করা সম্ভব হয় তাহলেও অবৈধ অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা পাঁচ থেকে দশ লাখের মধ্যেই থাকবে, ১৩০ কোটি জনসংখ্যার একটি দেশের ক্ষেত্রে যা অকিঞ্চিৎকর। অনুপ্রবেশ রুখতে যা দরকার,তা হল সীমান্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে জোরদার করা।

যাইহোক বিরোধীরা বলছেন যে এস আই আর করার পেছনে একটি অঘোষিত উদ্দেশ্য রয়েছে – তা হল বিরোধী ভোটারদের নাম বাছাই করে বাদ দেওয়া, মানে ‘ভোট চুরি’। যেমন, পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে সংখ্যালঘু ও মহিলা ভোটার যারা বেশিরভাগ তৃনমূল কংগ্রেসকে ভোট দিতেন তাঁদের নাম একচেটিয়াভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে তাঁদের অভিযোগ রয়েছে। আবার যারা বিজেপির সমর্থক তাঁরা বলছেন যে যদি তাই হয় তবে জ্ঞানেশ কুমার ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও কিকরে তিনটি রাজ্যে বিরোধীরা জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে?
এই প্রসঙ্গে বিখ্যাত ভোট বিশেষজ্ঞ তথা সাংবাদিক প্রনয় রায়ের একটি প্রতিবেদন উল্লেখযোগ্য। পশ্চিমবঙ্গের বিগত নির্বাচনের ভোট সমীক্ষায় তিনি এস আই আর এর ফলে বিজেপি দল কিভাবে লাভবান হয়েছে তার তথ্য পেশ করেছিলেন। তার যুক্তিকে পাল্টা চ্যালেঞ্জ জানিয়ে পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির পক্ষ থেকে এমন পাঁচটি বিধানসভা কেন্দ্রের তথ্য দেওয়া হয় যেখানে এস আই আরএ উপরের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি নাম বাতিল হয়েছে এবং তার সবটাতেই বিজেপি প্রার্থী পরাস্ত হয়েছেন। এর বিপরীতে এমন পাঁচটি বিধানসভা কেন্দ্রের তথ্য দেওয়া হয় যাতে এস আই আর এ নীচের দিক দিয়ে সবচেয়ে কম নাম বাতিল হয়েছে অথচ সবকটিতেই বিজেপি প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে প্রনয় রায় তাঁর ডিকোডার পোর্টালে দেখিয়েছেন যে পাঁচটি আসনে বিজেপি প্রার্থীরা পরাজিত হয়েছেন গত ভোটেও সেসবে গড়ে বিরোধী প্রার্থীর ভোট ৩০ শতাংশের বেশি ছিল। কিন্তু এস আই আর এর ফলে এসবে বিজেপি প্রার্থীদের পক্ষে এবার গড়ে ১০ শতাংশ ভোট সুইং হয়েছে। অন্যদিকে যে পাঁচটি আসনে বিজেপি প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন বলে দেখানো হয়েছে তার তিনটিতে গতবারও বিজেপি প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। বাকি দুইটিতেও খুব কম পার্থক্যে হেরেছিলেন। এই পাঁচটিতে এবার বিজেপি প্রার্থীর পক্ষে ভোট সুইং হয়েছে মাত্র দুই শতাংশ। অর্থাৎ নির্বাচনে হারজিত সার্বিক শতাংশের পার্থক্যের উপর নির্ভরশীল। এসআইআর ভোট বাড়ালেও তা নির্বাচনী ফলাফলকে অনেক সময় প্রভাবিত না-ও করতে পারে।
সাধারণ আম নাগরিকদের সাথে গনতান্ত্রিক ব্যাবস্থার একমাত্র সম্পর্ক পাঁচ বছর পর পর ভোটাধিকার প্রয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ। মধ্যবর্তী সময় সবাই আয়কর এবং বিক্রয়করের মাধ্যমে তাদের কষ্টার্জিত আয়ের একটি অংশ সরকারের হাতে তুলে দেন তাদের সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে। যদি কেউ মনে করেন যে কাঙ্খিত উন্নয়ন হয়নি তবে আগামীতে একমাত্র ভোটাধিকারের মাধ্যমেই তা প্রতিফলিত করতে পারেন। তাই নির্বাচনী ব্যাবস্থা শুধু নিরপেক্ষ হওয়াই সুস্থ গনতন্ত্রের প্রাথমিকতা নয়, এই ব্যাবস্থা সম্বন্ধে জনগণের উপলব্ধি ও আস্থা সমস্ত সন্দেহের ঊর্ধ্বে এবং ভরসাযোগ্য থাকা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথা গনতন্ত্রের মুল ভিত্তিই নড়বড়ে হয়ে যায়।
ভারতের মতো দেশ, যা বিশ্বের বৃহত্তম গনতন্ত্র, এবং যার গনতান্ত্রিক ঐতিহ্য সারা বিশ্বে সম্মানিত সেখানে তাই নির্বাচন কমিশন নিয়ে সাম্প্রতিক বহুবিধ বিতর্ক মোটেই কাম্য নয়। দরকার ছিল নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে সবকিছু নিয়ে স্পষ্টীকরণ তুলে ধরা, যারা প্রশ্ন তুলছেন তাঁদের নিয়ে আলোচনার টেবিলে বসা। এক্ষেত্রে সরকারি হস্তক্ষেপও অবাঞ্ছিত ছিল,কারণ নির্বাচন কমিশন একটি স্বতন্ত্র সংস্থা। আন্দোলন দমনে সরকারি পদক্ষেপে সন্দেহ আরো ঘনীভূত হচ্ছে।
গনতন্ত্রে বিরোধী মতকে গুরুত্ব দেওয়া প্রাথমিক কর্তব্য। কাজেই এই উৎসবের মরশুমে যে অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছে তার প্রতিবিধানে আলোচনায় ফিরুক নির্বাচন কমিশন এবং রাস্ট্র। জনগনের আস্থা ও বিশ্বাসকে পুণর্স্থাপিত করতে হলে এছাড়া বিকল্প নেই।
(মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)



