বরাক তরঙ্গ, ২৪ অক্টোবর : স্বাধীনতা সংগ্রামী তথা বিশিষ্ট সমাজসেবী শচীন্দ্র মোহন দত্ত ওরফে লাখুদার স্মৃতিকে অমলিন রাখতে তাঁর মর্মর মূর্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে শিলচরের সর্বোদয় ট্রাস্ট। এই মহতী উদ্যোগকে সফল করে তুলতে ২৫ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদান করলেন সীতানাথ কর।
শনিবার শিলচরের মেহেরপুর অঞ্চলের পাঁচঘরি লেনে প্রয়াত অধ্যাপক ড. সুবীর করের বাড়িতে আয়োজিত এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে সর্বোদয় ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক তথা আইনজীবী শেখর পাল চৌধুরীর হাতে এই অর্থের চেক তুলে দেন সীতানাথ কর। উল্লেখ্য, তাঁর কাকা তাম্রপত্রপ্রাপ্ত স্বাধীনতা সংগ্রামী সত্যেন্দ্র কিশোর কর ছিলেন শচীন্দ্র মোহন দত্তের সহযোগী। লাখুদার স্মৃতি সংরক্ষণে সর্বোদয় ট্রাস্টের এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন সিতানাথ কর।
তিনি বলেন, শচীন্দ্র মোহন দত্ত রামকৃষ্ণনগরের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে তিনি নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সমাজসেবার কাজে নিয়োজিত করেছিলেন। তাঁর স্মৃতি ও কর্মধারাকে আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এই মহৎ উদ্যোগে সামান্য আর্থিক সহযোগিতা করতে পেরে তিনি নিজেকে ধন্য মনে করছেন।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে রামকৃষ্ণনগর ওয়েলফেয়ার সোসাইটির মুখ্য উপদেষ্টা ড. গিরিধারী কর বলেন, লাখুদা ছিলেন সর্বজনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব। আবালবৃদ্ধবনিতা সকলের কাছেই তিনি ছিলেন আপনজন। সমাজসেবার পাশাপাশি শিশুদের শিক্ষা বিস্তারেও তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর মতো মানুষের আদর্শকে সমাজের সামনে তুলে ধরার উদ্যোগ গ্রহণ করায় তিনি সর্বোদয় ট্রাস্টকে ধন্যবাদ জানান।
শিলচর পূর্ত সড়ক বিভাগের কার্যনির্বাহী প্রকৌশলী অনিরুদ্ধ নাগ বলেন, শচীন্দ্র মোহন দত্ত ছিলেন এক কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব। সারা জীবন দেশ ও সমাজের কল্যাণে কাজ করে গিয়েছেন তিনি। তাঁর আদর্শকে যথাযথ মর্যাদায় তুলে ধরা বর্তমান প্রজন্মের কাছে অত্যন্ত জরুরি। তাঁর মর্মর মূর্তি প্রতিষ্ঠিত হলে তা আগামী প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণার আলোকবর্তিকা হয়ে উঠবে। পাশাপাশি, প্রতি বছর তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি হবে, যা যুবসমাজকে সমৃদ্ধ করবে।
প্রবীর কুমার রায় চৌধুরী তাঁর বক্তব্যে শচীন্দ্র মোহন দত্তকে রামকৃষ্ণনগরের প্রকৃত রূপকার হিসেবে অভিহিত করেন। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে রামকৃষ্ণনগরের উন্নয়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। গত শতকের সত্তরের দশকের গোড়ার দিকে শিলচরে এসে তিনি বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজে আত্মনিয়োগ করেন। শিলচরের শরৎপল্লিতে সর্বোদয় স্কুল প্রতিষ্ঠা এবং মালুগ্রামের গান্ধীঘাটে সর্বোদয় পাঠশালা গড়ে তোলা ছিল তাঁর উল্লেখযোগ্য কীর্তি।

শিশুশিক্ষার প্রসারে তিনি নিজের উপার্জিত অর্থের পাশাপাশি উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদও ব্যয় করেছিলেন। ‘শিশু নষ্ট তো জাতি নষ্ট’—এই আদর্শকে সামনে রেখে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কাজ করে গিয়েছেন তিনি। প্রবীরবাবুর মতে, লাখুদা তাঁর কর্মময় জীবনের মধ্য দিয়ে সমাজে স্থায়ী ছাপ রেখে গিয়েছেন।
সর্বোদয় ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক শেখর পাল চৌধুরী বলেন, লাখুদার মর্মর মূর্তি কেবল একটি স্মৃতিসৌধ হবে না, এটি তাঁর আদর্শ, ত্যাগ ও সমাজসেবার চিরন্তন প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। মূর্তি দেখে নতুন প্রজন্ম তাঁর জীবনসংগ্রাম, মানবপ্রেম এবং সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের কল্যাণে তাঁর অবদান সম্পর্কে জানতে উৎসাহিত হবে।
তিনি আরও জানান, সর্বোদয় ট্রাস্টের কর্মকাণ্ডে অনুপ্রাণিত হয়ে অনেক সহৃদয় ব্যক্তি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন। ভবিষ্যতে পাঠশালাটিকে ধীরে ধীরে উচ্চবিদ্যালয়ে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি, মর্মর মূর্তি প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি লাখুদার সমাধিক্ষেত্রের উন্নয়নেও উদ্যোগ নেওয়া হবে।
শচীন্দ্র মোহন দত্তের জীবনাদর্শ ও সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে সর্বোদয় ট্রাস্টের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন উপস্থিত বিশিষ্টজনেরা।



