-: আমার চোখে দুর্গাপুজো :-
।। অপরাজিতা ভট্টাচার্য ।।
(গবেষক, আসাম বিশ্ববিদ্যালয়)
১৮ অক্টোবর : দুর্গাপূজো বাঙালির জীবনে শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি বাঙালির জীবনের এক ঐতিহ্য, আবেগ, অনুভূতির দিক। টানা ৩৬৫ দিন বাঙালিরা এই দিনটির প্রতীক্ষায় বসে থাকে। দুর্গাপূজা মানেই একজন বিবাহিত নারীর তার পিত্রালয়ে আসার মুহুর্তকেই বোঝায়। শরতের নীল আকাশ, সাদা কাশফুল, শিউলির মিষ্টি গন্ধ এবং ঢাকের আওয়াজে বাঙালির মনে জেগে ওঠে এক অনাবিল আনন্দ। আমার চোখে দুর্গাপুজো এমন একটি উৎসব, যা অতীতের ঐতিহ্যকে সঙ্গে নিয়ে বর্তমান সমাজের পরিবর্তনশীল জীবনধারার সঙ্গে মিলেমিশে এক নতুন রূপ ধারণ করেছে। অতীতকালে দুর্গাপুজো মানেই ছিল বনেদিআনায় ঘেরা আভরণ। চারিদিকে পারিবারিক আভিজাত্যপূর্ণ সমাবেশ। কিন্তু বর্তমান সমাজে বারোয়ারি পুজো এবং সার্বজনীন দুর্গোৎসবের প্রচারের ফলে আনন্দের মাত্রা হয়ে যায় আরও দ্বিগুণ। পুজোর প্রায় মাসখানেক আগে থেকেই পাড়ায় পাড়ায় চাঁদা তোলার তাগিদ মনে করিয়ে দেয় মায়ের আগমন বার্তা।

বর্তমান সমাজে দুর্গাপুজোর চিত্র অনেকটাই পরিবর্তিত হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি, শিল্পকলা, আলোকসজ্জা এবং অভিনব মণ্ডপ নির্মাণ দুর্গোৎসবকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়কে কেন্দ্র করে মণ্ডপসজ্জা মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। দুর্গাপুজো আজ বহু মানুষের জীবিকা অর্জনেরও গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। মৃৎশিল্পী, আলোকশিল্পী, ঢাকি, পোশাক ব্যবসায়ী, ক্ষুদ্র বিক্রেতা ও নানা পেশার মানুষ এই উৎসবের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত। কিন্তু বর্তমান সমাজের পুজোর পাশাপাশি তীব্র যানজট, কোলাহল, শব্দদূষণ, পাস্টিকের ব্যবহার, পরিবেশদূষণের মতো যন্ত্রণা জনজীবনের জন্য উদ্বেগের বিষয়।
আগে যেমনভাবে বিসর্জনের সময় প্রত্যেকে মিলে গান করত-
‘মাকে ভাসাইয়া জলে, কী ধন লইয়া যাবো ঘরে?
ঘরে গিয়ে মা বলিব কারে/গো মা, কোথায় যাবে?’
কিন্তু বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে যখন ডিজে নাচের ভঙ্গিমা দেখা যায়, তখন মন কিছুটা হলেও ভারাক্রান্ত হয়। তারপরও বলব সময়ের সঙ্গে তাল মেলানোর জন্য এটাকেও মেনে নিতেই হবে। আর যাইহোক আমাদের ‘Back Dated’ এই তকমা লাগালে চলবে না। আসলে আমার কাছে দুর্গাপুজো মানেই একটি Nostalgic পরিবেশ। মহালয়ার পরেই কতটা জামা হয়েছে এবং হবে সে নিয়ে আনন্দ, খেলনা বন্দুক কেনা, মা-বাবা এবং পরিবারের সাথে ঠাকুর দর্শনে যাওয়া, Pandal Hopping, রাস্তার পাশের এগরোল, বেলুন কতই না আবদার। কিন্তু বর্তমানে আমার পক্ষে তা আর হয়ে ওঠে না, তাঁদের বয়স্কতার দরুন।

দুর্গাপুজো হোক সকল মানুষের মিলনক্ষেত্র, যেখানে ধর্ম, জাতি, শ্রেণি ও অর্থনৈতিক অবস্থানের ভেদাভেদ ভুলে সবাই আনন্দে সামিল হতে পারে। আমার চোখে দুর্গাপুজো অতীতের ঐতিহ্য এবং বর্তমানের আধুনিকতার এক সুন্দরতম সমন্বয়। দেবী দুর্গার অসুরবধ অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির জয়ের প্রতীক। এই প্রতীকী তাৎপর্য আমাদের অন্যায়, কুসংস্কার, বৈষম্য ও অমানবিকতার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখায়। তাই দুর্গাপুজো শুধু কয়েক দিনের উৎসব নয়; এটি মানবিকতা, সম্প্রীতি, নারীশক্তি ও সামাজিক ঐক্যের এক চিরন্তন বার্তা। এই চেতনাকে ধারণ করতে পারলেই দুর্গোৎসব সত্যিকার অর্থে সার্থক হয়ে উঠবে।



