১২৯ বছরেও ‘বাড়ির মেয়ে’ দুর্গা, চৌধুরীবাড়ির পুজোয় অটুট ঐতিহ্য

Spread the news

দীপ দেব, শিলচর।  
বরাক তরঙ্গ, ১৮ অক্টোবর : সময়ের সঙ্গে বদলেছে বাড়ির ঠিকানা, পরিবর্তন এসেছে পুজোর রীতিতেও। মাটির প্রতিমার পরিবর্তে এসেছে নিমকাঠের স্থায়ী মূর্তি, বন্ধ হয়েছে মহিষ বলির প্রথা। তবু ১২৯ বছর ধরে অটুট রয়েছে চৌধুরীবাড়ির দুর্গাপুজোর ঐতিহ্য। পরিবারের কাছে দেবী দুর্গা শুধুই আরাধ্য দেবী নন, তিনি ঘরের মেয়ে, যাঁর আগমনে প্রতি বছর আনন্দে মেতে ওঠেন পরিবারের সদস্যরা।

শিলচর এনএন দত্ত রোডের চৌধুরীবাড়িতে দীর্ঘ ১২৯ বছর ধরে চলে আসছে এই পারিবারিক দুর্গাপুজো। পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, দীনেশচন্দ্র চৌধুরী ও নন্দিনীবালা দেবীর হাত ধরে শিলচরে নতুন করে এই পুজোর সূচনা হয়। প্রবীণ সদস্যা নলিনীবালা চৌধুরীর স্বপ্নাদেশকে দেবীর আহ্বান হিসেবে মেনে অম্বিকাপট্টির পূর্বপাড়ায় সামান্য সঞ্চয় নিয়ে শুরু হয়েছিল পুজো। ‘মৎস্য পুরাণ’-এ বর্ণিত দেবীপূজা পদ্ধতি অনুসরণ করেই আজও পুজোর আয়োজন করা হয়।

বর্তমানে চৌধুরীবাড়ির পুজো চলছে পরিবারের বর্তমান ঠিকানায়, গত ২৮ বছর ধরে। মাঝখানে প্রায় পাঁচ বছর পুজো বন্ধ থাকলেও পরে ফের তা শুরু হয়। একসময় এই পুজোয় মহিষ বলির প্রচলন ছিল, যা ১৯৫১ সাল পর্যন্ত চলেছিল। পরবর্তীকালে সেই প্রথা বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে দেবীর পায়ে সিঁদুর অর্পণের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয় বিশেষ আচার। গত তিন বছর ধরে নিমকাঠের স্থায়ী প্রতিমায় পুজো হয়ে আসছে।

দীর্ঘদিন ধরে পুজোর দায়িত্ব সামলেছেন স্বর্ণালী চৌধুরী। ২০০৭ সাল পর্যন্ত তাঁর তত্ত্বাবধানেই চলেছে পুজোর যাবতীয় আয়োজন। এরপর থেকে সেই দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন তাঁর পুত্র, পেশায় শিক্ষক অর্জুন চৌধুরী। পাশাপাশি পুজোর খুঁটিনাটি আচার-অনুষ্ঠান দেখভাল করেন পরিবারের সদস্যা শুভলক্ষ্মী চৌধুরী।

চৌধুরীবাড়ির পুজোর অন্যতম আকর্ষণ তিথি মেনে দেবীকে সাজানো ও নানা সামগ্রী নিবেদনের ঘরোয়া রীতি। মহালয়ার পর থেকেই শুরু হয়ে যায় ঘরের মেয়ের বাপের বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি। প্রতিপদে দেবীকে দেওয়া হয় আয়না ও চিরুনি। দ্বিতীয়ায় নিবেদন করা হয় আলতা, সিঁদুর ও ফিতে। তৃতীয়ায় থাকে তেল ও কাজল, আর চতুর্থীতে দেওয়া হয় বস্ত্র। পঞ্চমী থেকে দেবীর হাতে তুলে দেওয়া হয় অস্ত্র ও অলঙ্কার। ষষ্ঠী থেকেই শুরু হয় মূল দুর্গোৎসব।

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পরিবারের সদস্যরা নিষ্ঠার সঙ্গে এই ঐতিহ্য বহন করে চলেছেন। সময় বদলেছে, বদলেছে পুজোর কিছু রীতিনীতি, কিন্তু বদলায়নি বিশ্বাস। চৌধুরীবাড়ির দুর্গা আজও পরিবারের কাছে সেই চিরচেনা ‘বাড়ির মেয়ে’, যাঁর আগমন ঘিরে ফিরে আসে মিলন, আবেগ আর শিকড়ের টান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *