মোহাম্মদ জনি, শ্রীভূমি।
বরাক তরঙ্গ, ৩ অক্টোবর : শারদোৎসবের আবহে যখন সর্বত্র দুর্গাপূজার প্রস্তুতি তুঙ্গে, তখন নিজস্ব ধর্মীয় বিশ্বাস, সামাজিক রীতি ও জাতিগত সংস্কৃতিকে সামনে রেখে দুর্গোৎসবের আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত লোয়াইরপোয়া জিপির বড় হাতাইছড়া বস্তির বর্মন সম্প্রদায়ের মানুষ। এবার তাঁদের ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপূজা নবম বর্ষে পদার্পণ করছে। ফলে নবম বর্ষকে স্মরণীয় করে তুলতে বাড়তি কিছু কর্মসূচিরও আয়োজন করা হচ্ছে। চলতি বছরের পূজা পরিচালনার জন্য সম্প্রতি স্থানীয়দের উদ্যোগে নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে। সভাপতি হয়েছেন বাবুল বর্মন এবং সাধারণ সম্পাদক সাধন দেববর্মা। কমিটি গঠনের পর থেকেই মণ্ডপ সাজসজ্জা, প্রতিমা নির্মাণ, ধর্মীয় আচার এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি চলছে জোরকদমে।
আয়োজকদের কথায়, বড় হাতাইছড়ার বর্মন সম্প্রদায়ের দুর্গাপূজার অন্যতম বিশেষ বৈশিষ্ট্য নবমীর ‘মানসিক পূজা’। সংকল্প অনুযায়ী ভক্তরা এই পূজায় অংশ নেন। তাঁদের নিজস্ব ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী এই বিশেষ অনুষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ব্যক্তি ‘অচাই’। মূল পূজার ধর্মীয় আচার ব্রাহ্মণের মাধ্যমে সম্পন্ন হলেও সংকল্পিত পূজায় অচাইয়ের নেতৃত্বে নিজস্ব পরম্পরা অনুসরণ করা হয়। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী পশু-পাখি বলির প্রথাও এই পূজার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বলে জানান আয়োজকরা।
ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত পাঁচ দিন ধরে পূজার আয়োজন করা হবে। অষ্টমীতে থাকবে নয়জন কুমারীর কুমারী পূজা। পাশাপাশি প্রতিদিন দেবীর উদ্দেশ্যে দু’বার অন্নভোগ নিবেদন এবং ভক্তদের জন্য দুপুর ও রাতে মহাপ্রসাদের ব্যবস্থা থাকবে।
এই পূজার অন্যতম আকর্ষণ দেবী প্রতিমার সাজসজ্জা। শাড়ির পাশাপাশি বর্মন সম্প্রদায়ের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী পোশাকে দেবীকে সাজানোর রীতি রয়েছে। এবারও সেই পরম্পরা বজায় রাখার পরিকল্পনা রয়েছে আয়োজকদের। এর পাশাপাশি পূজার দিনগুলিতে নিজস্ব সাংস্কৃতিক নৃত্য ও গীত পরিবেশনের আয়োজন করা হবে।
প্রতিদিনের প্রতিযোগিতামূলক আরতিও এই দুর্গোৎসবের বিশেষ আকর্ষণ। স্থানীয়দের পাশাপাশি দূরদূরান্তের শিল্পী ও প্রতিযোগীরাও এতে অংশ নেন। সন্ধ্যার পর পূজামণ্ডপ ও সংলগ্ন এলাকা তাই পরিণত হয় প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক মিলনস্থলে।
আয়োজকদের মতে, তাঁদের কাছে দুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার পাশাপাশি সামাজিক সম্প্রীতি ও মিলনের এক গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী এবং সর্বস্তরের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে আনন্দ ভাগ করে নেওয়াই তাঁদের মূল লক্ষ্য।
পূজা কমিটির সভাপতি বাবুল বর্মন, সাধারণ সম্পাদক সাধন দেববর্মাসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা সকল ধর্মপ্রাণ মানুষ ও দর্শনার্থীকে এই দুর্গোৎসবে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁদের আশা, নবম বর্ষের এই আয়োজনেও মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে বড় হাতাইছড়ার দুর্গোৎসব আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে।



