।। প্রদীপ দত্তরায় ।।
(লেখক ছাত্র সংগঠন আকসার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও গৌহাটি হাইকোর্টের আইনজীবী)
২৭ সেপ্টেম্বর : পুর নিগম ভোট দরজায় কড়া নাড়ছে। এই নির্বাচন দুটো কারণে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমতঃ প্রায় ছ’বছর পর শিলচরে পুরভোট হচ্ছে। এবং দ্বিতীয়ত পুরসভা থেকে পুর নিগমে উত্তরিত হবার পর এটাই প্রথম পুরনিগম নির্বাচন । তাই সেই অর্থে এটি ঐতিহাসিকও বটে।
বর্তমানে ৪২ টি ওয়ার্ডের সবকটিতেই প্রার্থীরা জোরদার প্রচার চালাচ্ছেন। বিভিন্ন ধরনের প্রতিশ্রুতি শোনা যাচ্ছে। এটা বলা বাহুল্য যে পুরভোটে স্থানীয় ইস্যুই প্রাধান্য পায়। তাই পুরনিগমের অধীনে বর্ধিত শিলচরের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানই প্রচারের আলোয় আসা উচিত। এটি দুর্ভাগ্যের বিষয় যে নির্বাচনের আগে প্রার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতার শংসাপত্র এবং দু’টি ওয়ার্ডে প্রার্থীদের মনোনয়ন প্রত্যাহার নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, যা মূল ইস্যু থেকে নাগরিকদের দৃষ্টি সরিয়ে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছে। সে যাইহোক, যারা এবার নির্বাচিত হবেন, তাঁদের উপর জনগনের ব্যাপক প্রত্যাশা থাকবে। এবং এই গুরুদায়িত্ব আগামীতে তাঁরা কতটা দক্ষতার সাথে সামলাতে পারবেন,তার উপরই শহর শিলচরের নাগরিকদের প্রাপ্তির অভিলেখ ও ভাগ্য নির্ধারিত হবে।
শহর শিলচরের বর্তমান অন্যতম সমস্যা বন্যা ও জমা জলের দুর্ভোগ। বিশেষতঃ জমা জলের সমস্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। যদিও সরকারি ভাবে বিজেপি ও কংগ্রেস দলের নির্বাচনী ইস্তেহার এখনো প্রকাশিত হয়নি তবুও বিজেপি দলের রাজ্য সভাপতি দিলীপ শইকিয়া বলেছেন যে শিলচরের নিকাশি ব্যাবস্থা ও জলাবদ্ধতা দুরীকরণে তাঁদের বিজ্ঞানভিত্তিক স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেবার পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁদের পরিকল্পনা মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে শহরের গুরুত্বপূর্ণ খালগুলিকে গভীর ও প্রশস্ত করা, জমা জলের সমস্যা সমাধানে বিভিন্ন এলাকায় পাম্পিং স্টেশন স্থাপন করা এবং আরসিসি ঢাকনা যুক্ত নালা তৈরি ও নিময়িত পরিস্কার। কংগ্রেস দলও তাঁদের নির্বাচনী প্রচারে নিকাশি ও জমা জলের সমস্যা সমাধানে শাসক দলের দীর্ঘ ব্যর্থতা উল্লেখ করে এটিকে মূল নাগরিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। একই সঙ্গে নির্বাচিত হলে এর সমাধানে সুপরিকল্পিত উদ্যোগ নেবার অঙ্গীকার করেছে।
সমস্যা হচ্ছে শিলচরবাসী গত তিন/চার দশক ধরে এই ধরনের প্রতিশ্রুতি বারবার শুনে আসছেন। কিন্তু সমাধানের পরিবর্তে সমস্যাটি উত্তরোত্তর আরো গুরুতর হচ্ছে।
তাই স্বভাবতই প্রশ্ন আসে যে, কোথায় খামতি রয়েছে ? আসুন ব্যাপারটি একটু সরেজমিনে খতিয়ে দেখা যাক।
২০২২ সালের প্রলয়ঙ্করী বন্যার পর সরকারের তরফে রাঙিরখাল সংস্কারের একটি বৃহৎ প্রকল্প ঘোষণা করা হয়। পুরো রাঙির খালের দীর্ঘ ১৭ কিমি এই সংস্কারের কাজে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। প্রকল্প বরাদ্দ ১৪.০৬ কোটি। রাজ্যের মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী ২০২২ সালে এর শিলান্যাস করেন।
এবার এই কাজের অগ্রগতি একটু খতিয়ে দেখা যাক। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি অবধি সরকারি খাতায় এই প্রকল্পের অগ্রগতি ২৭.৪২ শতাংশ। ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ এর রিপোর্টে বলা হচ্ছে এর দশ কিমি অংশে প্রায় কোন কাজই হয়নি। প্রতিরোধ দেওয়ালের (গার্ড ওয়াল) কাজ সম্পন্ন হয়েছে শুধু ১০০ মিটার অংশে। চন্ডীচরন রোড থেকে শিলচর শ্মশান ঘাটের বিপরীতে এসে এই কাজ থমকে রয়েছে। এটাও বলা হয়েছে যে খাল থেকে যেসব মাটি ও আবর্জনা উত্তোলন করা হয়েছিল খালের পাশে তা ঢাই করে রাখায় ফের খালে পড়ে জলধারণ ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে।
রাঙিরখাল ছাড়াও নিকাশি ব্যবস্থার জন্য প্রাকৃতিক খালগুলোর মধ্যে শিঙ্গিরখাল, লঙ্গাইখাল এবং বাছাইখাল গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো সবকটিরই জলধারণ ও পরিবহন ক্ষমতা ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। মূল কারন আবর্জনা ও অন্যান্য পদার্থ জমে তলদেশ ভরাট হয়ে পড়া। দরকার আমূল সংস্কার। বিগত বছরে শিঙ্গির খালের ৬০০ মিটার অংশের সংস্কার হয়েছে। বাকি সংস্কার আটকে আছে, যদিও দীর্ঘদিন ধরে এ ব্যাপারে চেষ্টা চলছে। বাকি খালগুলির অবস্থাও তথৈবচ।
সংস্কারে বিলম্বের পেছনে মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়:
১. খালের জমি জবরদখল ও খালের উপর সেতু সহ বিভিন্ন অবৈধ কাঠামো তৈরি করা।
২. খালে ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় নাগরিকদের দ্বারা নিয়মিত প্লাস্টিক ও অন্যান্য আবর্জনা ফেলা।
৩. খালের থেকে উত্তোলিত মাটি ও আবর্জনা খালের পাশে জমা করে রাখা।
৪. এবং সর্বোপরি প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রিতা।
এটা শহরবাসীর সৌভাগ্য বলতে হবে যে ২০২২ এর পর থেকে শহর স্বল্পসময়ে তেমন অতিবৃষ্টির কবলে পড়েনি। নাহলে হয়তো আবার বন্যার অপরিসীম দুর্ভোগ পোহাতে হত শহরবাসীকে।
ঠিকাদারের ঠিকঠাক কাজ না করার অভিযোগ, কাজে গতি আনার জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের বারবার বৈঠক, জনসমক্ষে মন্ত্রী দ্বারা ঠিকাদারকে ভর্ৎসনা, সামাজিক মাধ্যমে নাগরিকদের ক্ষোভ ও প্রতিবাদ, বারবার নাগরিক আন্দোলন সবই আমরা দেখেছি। কিন্তু সবশেষে এই দীর্ঘসূত্রিতার দায় যে সরকার এবং প্রশাসনের উপর বর্তায় তা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। একই সাথে যতটুকু অগ্রগতি হয়েছে তার পেছনে নাগরিক আন্দোলনের যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে এটাও মেনে নিতে হবে।
এবারে আসি দ্বিতীয় সমস্যায়- জমা জল এবং জলাবদ্ধতার সমস্যা। এটা মনে রাখতে হবে যে পুর্বোল্লিখিত সমস্যা থেকে এটি বিচ্ছিন্ন নয় বরং এখানে কার্যকরী যোগসূত্র রয়েছে। কারণ শহরের কৃত্রিম নালাসমূহ দিয়ে যে জল নিষ্কাশিত হয় তা অবশেষে মূল খালগুলিতেই পরিবাহিত হয়।
ইদানিং অল্প বৃষ্টিতেই লিঙ্ক রোড, এন এস অ্যাভিনিউ, সোনাই রোড, শিলংপট্টি, বিলপার সহ বিভিন্ন এলাকা জমা জলের কৃত্রিম বন্যায় প্লাবিত হয়, যা কিছুদিন আগেও দেখা যায়নি। নিত্যযাত্রী এবং শিক্ষার্থীদের দূষিত জল ঠেলে কাজেকর্মে, স্কুল কলেজে যেতে হয়। এ এক অবর্ণনীয় দুর্ভোগ। অথচ প্রতিরছরই স্থানীয় নিকাশি প্রকল্পের অধীনে ছোট বা মাঝারি নালা তৈরি হয়। গত এক বছরে শহরের বিভিন্ন এলাকায় আর সিসি স্ল্যাবের ঢাকনাযুক্ত নালা তৈরি করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে, অর্থও ব্যয় হচ্ছে কিন্তু সমস্যা কমছে না। এর কারণ কি ?
মূল কারন হিসেবে যেসব বিষয় চিহ্নিত হতে পারে:
১. সমন্বয়হীন নিকাশি নালা ব্যাবস্থা।
২. প্রাকৃতিক নিকাশি খালসমুহের সংকোচন।
৩. অনিয়ন্ত্রিত এবং অনঅনুমোদিত ভবন সহ বিভিন্ন পরিকাঠামো নির্মাণ
৪. পলি ও আবর্জনা জমা হওয়া
৫. সরকারি বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সমন্বয় হীনতা-নালা সংস্কার করতে গিয়ে জল সরবরাহের বা গ্যাস সরবরাহের পাইপলাইন অনেক ক্ষেত্রেই বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়।
৬. কালভার্ট ও কংক্রিট সেতুজনিত বাধা।
৭. শহর সংলগ্ন বিল এবং নিম্ন ভূমির সংকোচন।
উত্তরণ কোন পথে ?
নতুন পুরনিগমে যারা নির্বাচিত হবেন তাঁদের এই দুই সমস্যাকে অবশ্যই প্রাথমিকতা দিয়ে সমাধানে মনোযোগী হতে হবে।
দরকার একটি ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যানের বাস্তবায়ন। উল্লেখ্য যে ২০২৬ এর জুন মাসের প্রতিবেদন অনুযায়ী আসাম সরকারের “টাউন ও কান্ট্রি প্ল্যানিং” বিভাগের পক্ষ থেকে আসামের বিভিন্ন শহরের নিকাশি ব্যাবস্থার উন্নতিকল্পে এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদী মাস্টার প্ল্যান তৈরি এবং বাস্তবায়িত করার প্রয়াস নেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে কিছু শহরের পরিকল্পনা অনুমোদিত হয়েছে,কোনটি অনুমোদনের অপেক্ষায় আবার শিলচর সহ কিছু জনপদের প্রকল্প প্রস্তাব নির্মীয়মান অবস্থায় রয়েছে।
মাস্টার ড্রেনেজ প্ল্যান তৈরির সময় সাধারনত যেসব বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়:
১. বৃষ্টির জল কোথা থেকে কোথায় প্রবাহিত হয়।
২. অতিবৃষ্টির হিসেব ও তথ্য।
৩. সমগ্র শহরের খাল নালা সমূহের আন্তসংযোগ ব্যাবস্থার মানচিত্র।
৪. পাম্পিং এর প্রয়োজনীয়তা এবং পাম্পিং স্টেশনের অবস্থান ও ক্ষমতা নির্ধারণ।
৫. খাল ও নালার ধারণক্ষমতা।
৬. এক্ষেত্রে বরাক নদীর জলস্তর ও উজানের জল স্তরের তথ্য।
৭. ভবিষ্যত শহর সম্প্রসারণ।
৮. দখল ও অবৈধ নির্মাণ।
৯. বর্জ্য ও পলি ব্যাবস্থাপনা।
১০. রাস্তা ও কালভার্টের নকশা।
১১. জলাভূমি ও প্রাকৃতিক জলধারন এলাকার সম্প্রসারণ ও সংরক্ষণ।
১২. নিয়মিত রক্ষনাবেক্ষণের স্থায়ী ব্যবস্থা।
অর্থাৎ এককথায় এটি একটি সমন্বিত নিকাশি ব্যাবস্থাপনা। এবং এছাড়া শিলচরের নিকাশি ব্যাবস্থার দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার সমাধান অসম্ভব।
কিন্তু এক্ষেত্রে অনেকগুলো ধাপ পেরোতে হবে। প্রথমতঃ প্রকল্প প্রস্তাব চূড়ান্ত করা। দ্বিতীয়ত এটির অনুমোদন। তৃতীয়ত এরজন্য অর্থ বরাদ্দ হওয়া এবং চতুর্থতঃ এটির বাস্তবায়ন।
তাই আগামী পুরনিগমে যারা নির্বাচিত হবেন তাঁদের মূল দায়িত্ব হবে:
১. অবিলম্বে মাস্টার ড্রেনেজ প্ল্যানের বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া এবং সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করে উপরোক্ত ধাপগুলো যত শীঘ্র সম্ভব অনুমোদিত ও বাস্তবায়িত করা।
২. রাঙির খালকে অগ্রাধিকার ভিত্তিক প্রধান জল নিস্কাশন প্রকল্প হিসেবে ঘোষণা ও সংস্কারের কাজ শেষ করা।
৩. লঙ্গাই ও শিঙ্গির খালের পূর্ণাঙ্গ পুণরূদ্ধার।
৪. মালিনী বিল সহ শহরের নিম্ন ভূমি সমুহকে নিকাশি ব্যাবস্থার অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা ও সংরক্ষণ।
৫. প্রতি বর্ষার আগে বাধ্যতামূলক আবর্জনা ও পলি নিস্কাশন ও নালা নিরীক্ষা।
৬. বর্ষার পর কোথায় কতটা জল জমেছে সেই অনুযায়ী প্রতিরোধী পদক্ষেপ গ্রহণ।
৭. পাম্পিং স্টেশনের কার্যকারিতা ও রক্ষনাবেক্ষণের জন্য সুচিন্তিত উদ্যোগ।
৮. প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।
মনে রাখতে হবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, লেগে থাকার ক্ষমতা,দায়বদ্ধতা ও কর্মদক্ষতা থাকলে সবকিছু করা সম্ভব। তাই যে সমস্যা নিয়ে বিগত কয়েক দশক ধরে শিলচরকে ভুগতে হচ্ছে তার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের সুযোগ থাকবে যারা এবার নির্বাচিত হবেন তাঁদের হাতে। তাঁরা চাইলে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে একটি সুসংহত ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যানের বাস্তবায়ন করে শহরের অবস্থার বৈপ্লবিক পরিবর্তনের কর্ণধার হতে পারেন। সেক্ষেত্রে শহর বাসী এবং আগামী প্রজন্ম আজীবন তাঁদের কৃতিত্বের কথা স্মরণ করবেন।
তাই যারা আগামীতে ভোট দেবেন তাঁরা দলমতের উর্দ্ধে উঠে স্বচ্ছ ও শহরবাসীর প্রতি যারা সত্যিকার অর্থে দায়বদ্ধ তেমন প্রার্থীদের নির্বাচিত করুন।
অন্যথা বন্যা ও জমাজলের দুর্ভোগ থেকে শহরবাসীর নিস্তার মেলা দুস্কর।
(মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)



