উজান অসমের বন্যা : ধ্বংসলীলার পাশাপাশি বহুত্ববাদী সমন্বয়ের সাক্ষী হয়ে থাকবে

Spread the news

।। প্রদীপ দত্তরায় ।।
(লেখক ছাত্র সংগঠন আকসার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও গৌহাটি হাইকোর্টের আইনজীবী)
২৪ আগস্ট : অবর্ণনীয় ধ্বংসলীলার শেষে উজান অসমের শিবসাগর, চরাইদেও, যোরহাট, গোলাঘাট, শোণিতপুর ও কার্বিআংলং জেলার অধিকাংশ এলাকা থেকে বন্যার জল ধীরেগতিতে হলেও অপসৃত হচ্ছে, যদিও নিচু জমিতে এখনো জল জমে রয়েছে। শিবসাগর জেলার বৃহত্তম কৃষিজমি জোকাইচুখ এখনো জলমগ্ন হয়ে আছে। এইসব জেলার স্থানীয় বয়স্ক বাসিন্দারা বলছেন যে চরাইদেও এবং শিবসাগর জেলায় গত পঞ্চাশ বছরে এমন ভয়াবহ বন্যা তাঁরা প্রত্যক্ষ করেননি। ব্রহ্মপুত্রের বিভিন্ন উপনদী, সে মিতং হোক , দিখৌ বা ধনশিরি হোক , যেভাবে অতি অল্প সময়ে এবার বিস্তীর্ণ জনপদকে গ্রাস করেছিল,সেই ভয়াবহ স্মৃতি ভুক্তভোগীদের এখনো তাড়া করে বেড়াচ্ছে। শিবসাগর জেলার গৌরীসাগর বা চরাইদেও জেলার নেপালিকুঠি গ্রামের একটি বাড়িও বন্যার ধ্বংসলীলা থেকে রেহাই পায়নি। এরকম অসংখ্য গ্রাম এখনো জনশুন্য হয়ে বন্যার সাক্ষ্যবহন করছে। সবকিছু পলি আর কাঁদামাটির চাদরে ঢাকা পড়েছে।

সরকারি হিসেব অনুযায়ী এই বন্যায় এখন অবধি প্রাণ হারিয়েছেন ১০০ জন, ত্রান শিবিরে আশ্রিত ৫০০০০ এবং আক্রান্ত হয়েছেন ১,৪০,০০০ মানুষ। ৪৫৬ টি গ্রাম জলমগ্ন হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ১২০০০ একর কৃষিজমি। প্রাকৃতিক নিয়মে বন্যা শেষ হবে, কিন্তু যেসব কৃষক পরিবার সর্বসান্ত হলেন, যারা গবাদি পশু সহ বাড়িঘর হারালেন তাঁদের এর মাশুল গুনতে হবে আগামী অনেকদিন ধরে।

সরকারি তরফে ইতিমধ্যে প্রতি মৃতের পরিবারকে এককালীন নয়লাখ টাকা অনুদানের ঘোষণা করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন এই ভয়াবহ বন্যাত্রানে ১০০০ কোটি টাকার প্রয়োজন হবে এবং সরকারের পক্ষ থেকে তা বরাদ্দ করা হবে।

তবে এরকম অভাবনীয় দুর্যোগ একদিকে যেমন স্বল্পসময়ের মধ্যে ধ্বংসের আখ্যান তৈরি করে,একই সাথে মানুষের চেতনাকে ও জাগিয়ে তুলে, দৈনন্দিন জীবনের স্বার্থপরতার গন্ডি পেরিয়ে মানুষ সর্বহারা মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দৃঢ় তাগিদ বোধ করে, স্বপ্রনোদিত হয়ে সাহায্য, সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। অতীতে এটা বারবার দেখা গেছে। অসমের এবারের দুর্যোগে ও তেমন এক যৌথ মানবিক উদ্যোগের দৃশ্যকল্প আমরা দেখতে পেলাম, যা ভাষা,ধর্মের গন্ডি পেরিয়ে আগামীতে এই রাজ্যের বহুত্ববাদী সমন্বয়ের সাক্ষী হয়ে থাকবে, বলে আমার বিশ্বাস।

দুর্যোগের প্রাথমিক বিহ্বলতা কাটিয়ে উঠার পরই সারা রাজ্যের মানুষ বন্যার্তদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। একদিকে যেমন সেনাবাহিনী এনডিআরএফ ও এসডিআরএফ জওয়ানরা প্রায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিভিন্ন দুর্গম জায়গায় আটকে থাকা বন্যার্তদের উদ্ধার কাজ চালিয়েছেন, তেমনি বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সদস্যরাও রীতিমতো মাঠে নেমে তাঁদের সহযোগিতা করেছেন।যারা ব্যক্তিগতভাবে আক্রান্ত এলাকায় যেতে পারেননি তাঁরাও সাধ্যমত অর্থ সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন, কেউ সরকারি ত্রান তহবিলে দান করেছেন,কেউ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মাধ্যমে আর্ত মানুষের জন্য অর্থ বা প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাঠিয়েছেন। এদের অধিকাংশের অবদানের খবর আমরা পাইনি, যারা দাতা তাঁরা স্বাভাবিকভাবেই তা প্রকাশ্যে আনতে চাননি। তবে সার্বিক ভাবে এই যৌথ সাহায্য প্রাথমিক স্তরে বন্যার্তদের ত্রানে ব্যাপক ভূমিকা নিয়েছে।

আসামের সামাজিক মাধ্যমের কনটেন্ট ক্রিয়েটাররা এবারের বন্যাত্রানে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছেন। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের সাহায্যে তাঁরা তহবিল গড়ে অর্থ সহ, বিভিন্ন খাদ্য সামগ্রী, ত্রিপল, ওষুধপত্র ইত্যাদি বিতরণ করছেন। হময় গগৈ, অভয়ব ভুঁইয়া, ভাস্কর দত্তদের মতো সামাজিক মাধ্যমের প্রভাবকরা শুধু নৌকায় নয়, দুর্গম এলাকায় কোথাও বুকজল ঠেলে হেঁটে, কোথাও বা সাঁতরে আটকে পড়া মানুষদের প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছেন। ২২ বছর বয়সী কন্টেন্ট ক্রিয়েটর প্রদুনয় বরুয়া তাঁর সঞ্চয় থেকে ১৬টি প্রত্যন্ত গ্রামের প্রায় ১০০০ এমন পরিবার, যাঁরা এখনও সরকারি সাহায্য পাননি, তাঁদের প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দিয়েছেন। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সম্প্রতি বলেছিলেন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, জনগণের দানের প্রয়োজনীয়তা নেই। এই মন্তব্য নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনা হবার পর অবশ্য তিনি এইসব কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন যদিও ৭০ জন এইধরনের ইউটিউবারদের হিসাবপত্র নিরীক্ষা করার কথাও বলেছেন।

এ ছাড়া বন্যার্তদের সাহায্যে এগিয়ে এসেছে গুয়াহাটি প্রেস ক্লাব। পঞ্জীকৃত সাংবাদিকদের সাহায্যে তাঁরা স্বাস্থ্য শিবিরের আয়োজন করছেন। গরিমা শইকিয়া গর্গের উদ্যোগে জুবিন গর্গ ফ্যানস ক্লাবের পক্ষ থেকে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রয়েছে।

এই ব্যাপারে রাজ্যের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিশিষ্ট ব্যাক্তিরাও স্বপ্রনোদিত হয়ে উদ্যোগ নিয়েছেন। প্রাক্তন সাংসদ তথা বিশিষ্ট গন্ধ ব্যাবসায়ী বদরুদ্দীন আজমল, তাঁর আজমল ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে ইতিমধ্যে ১০০ কোটি টাকার বন্যা ত্রাণ প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন, যা আক্রান্ত ১০০০০ পরিবারের বাসগৃহ, ১০০০০ পরিবারের শৌচালয়, এবং বিভিন্ন আর্থিক সহায়তায় ব্যবহৃত হবে বলে তিনি জানিয়েছেন। বন্যাত্রানে তার এই ধরনের বৃহৎ আর্থিক সহায়তার ঘোষণা সারা দেশের নজর কেড়েছে। বন্যার্তদের পাশে নিঃস্বার্থভাবে দাঁড়ানোর জন্য স্বঘোষিত জাতীয়তাবাদী নেতা শৃঙ্খল চলিহার মা নিজে গোমোছা পড়িয়ে তাকে সম্মান জানিয়েছেন,যা নিয়ে রাজ্যে রাজনীতিও হচ্ছে। ত্রাণ সামগ্রী দিয়ে যেমন সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন ইউএসটিএম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মাহবুবুল হক তেমনি সুদুর মুম্বাই থেকে ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে শিবসাগর জেলায় উপস্থিত হয়েছিলেন বিখ্যাত জনহিতৈষী হুসেইন মনসুরি। তিনি শুধু সামগ্রী বিতরণই নয় বন্যার্তদের সাথে কয়েকদিন কাটিয়েছেন, তাঁদের সুখ দুঃখের কথা শুনেছেন, পুনর্বাসনে নিজে উপস্থিত থেকে সাহায্য করেছেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন ধ্বংসলীলার সময় মানুষের জাতি ধর্ম দেখেনা, তেমনি এই মানবিক উদ্যোগে জাতি ধর্ম ইত্যাদি ভেদাভেদ অপসৃয়মান। যে বিভাজনের রাজনীতি গত কয়েক বছর ধরে রাজ্যের জনজীবনকে প্রভাবিত করেছিল , সাময়িক হলেও এই মুহূর্তে তা প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে। বন্যার প্রলয় সবকিছুকে ছাপিয়ে আবার জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সারা রাজ্যের মানুষকে একাত্ম করে দিয়েছে। বহু ভাষিক, বহু সংস্কৃতির এই রাজ্য আবার স্বমহিমায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।

উজান অসমের এবারের বন্যার পরিপ্রেক্ষিতে বরাক উপত্যকার বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও ব্যক্তিবর্গ ত্রাণ সংগ্রহ ও বিতরণে অগ্রনী ভূমিকা নিয়েছে, যা অভূতপূর্ব। এর আগে, এমনকি ২০২২ শে শিলচরের প্রলয়ঙ্করী বন্যার সময়ও দুই উপত্যকার এমন সমন্বয় দেখা যায়নি। এতে এটা প্রমাণিত যে সমন্বয়ের কথা প্রকাশ্যে বলতে হয়না, সমন্বয়ের মানসিকতা এই উপত্যকার জনগণের অন্তর্নিহিত স্বাভাবিকতা। রাজনৈতিক নেতৃত্বের এটি অনুধাবন করা অত্যন্ত জরুরী। বৃহত্তর আসামের যে স্বপ্ন দেখানো হয় রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে এই উপত্যকার নাগরিকরা স্বেচ্ছায় এবং আন্তরিকভাবে তার সহযাত্রী হতে ইচ্ছুক। কিন্তু তারজন্য সরকারকে মনোযোগ দিয়ে,আন্তরিক হয়ে এখানকার সুখ দুঃখের কথা শুনতে হবে, সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী হতে হবে।

বরাক উপত্যকার যন্ত্রনার শেষ নেই। সাম্প্রতিক রাস্তাঘাটের দুর্ভোগ তার জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ। এখানকার ছেলে মেয়েদের চাকরি নেই, শিল্পদ্যোগ স্থাপনে সরকারি ভূমিকা ন্যুনতম, বাইরের সাথে যোগাযোগের জন্য রেলপথ,সড়কপথ অপ্রতুল, সরকারি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যাবস্থা ধুঁকছে। ডিলিমিটেশন করে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব সঙ্কুচিত করা হয়েছে, শিলচর লোকসভা আসনকে সংরক্ষিত করায় রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে। এবং বঞ্চনার এই ইতিহাস আজকের নয়, স্বাধীনতার পর থেকেই এটি বহমান। দিশপুরে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়, কিন্তু এই উপত্যকার ভাগ্য আর বদলায় না। এজন্যই মধ্যে যধ্যে বরাক উপত্যকার পৃথকীকরণের দাবি উঠে।

দিসপুরের যেসব নেতা মন্ত্রীরা বৃহত্তর সমন্বয়ের কথা বলেন, তাঁরা এই উপত্যকার নাগরিকদের মনের নাগাল পেতে একবার প্রকৃত অর্থে আন্তরিক হবেন কি?
(মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *