।। প্রদীপ দত্তরায় ।।
(লেখক প্রাক্তন ছাত্রনেতা ও গৌহাটি হাইকোর্টের আইনজীবী)
৩ আগস্ট : নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে সিজেপির ডাকে যে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে এটাকে কেন্দ্র করে সারাদেশেই রাজনৈতিক মহলে বিশেষ চর্চা চলছে। যুবশক্তি একত্রিত হলে এর প্রভাব কেমন পড়তে পারে এর জ্বলন্ত উদাহরণ সিজেপির এই আন্দোলন। শাসক এবং বিরোধী দল নিজ নিজ মতো করে এই আন্দোলনকে ব্যাখ্যা করে চলেছে। সিজেপির প্রতি সমর্থন জানিয়ে পরিবেশবিদ সনম ওয়াংচুক অনশন ধর্মঘটে বসেছিলেন। আদালতের নির্দেশ পেয়ে তাকে শেষ পর্যন্ত অনশন ভঙ্গ করানো হয়েছে। অনেক জল ঘোলার পর সিজেপির দাবি মেনে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান ইস্তফা দিয়েছেন। এরপর সিজেপিও আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে চুক্তি মোতাবেক আন্দোলনে জড়িতদের বিরুদ্ধে পুলিশ যেসব এফআইআর করেছে সেগুলি প্রত্যাহার করে নিতে হবে। এই শর্ত অনুযায়ী বিহার, পশ্চিমবঙ্গ এবং অসম সরকার এফ আই আর প্রত্যাহার করার কথা ঘোষণা করেছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের পর পরীক্ষা বাতিল হওয়ায় বহু মেধাবী ছাত্র-ছাত্রী হতাশার শিকার হয়ে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছে। এই ঘটনা আন্দোলনের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে সাহায্য করে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠন, রাজনৈতিক দল, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এই বিক্ষোভ সমাবেশে শামিল হয়। কেবল তাই নয় এই আন্দোলনের জের ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের ২২টি বড় শহর এবং আরো দু ডজন ছোট শহরে ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলন ব্যাপক মাত্রায় ছড়িয়ে পড়ার জন্যই কেন্দ্র আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে বাধ্য হয়। বিজেপির আন্দোলনে সারাবিশ্বের মানুষ নজর রেখেছেন। অনেকেই এই আন্দোলনের প্রয়োজন ছিল বলে মত প্রকাশ করেছেন। জলবায়ু আন্দোলনকর্মী গ্রেটা থুনবার্গ লন্ডনের সমাবেশে যোগ দিয়ে বলেন, “এই আন্দোলন গোটা বিশ্বকে নতুন আশার আলো দেখিয়েছে”।
ককরোচ জনতা পার্টির এই বিক্ষোভ সমাবেশ চলাকালে সেখানে দেশবিরোধী, আইনবিরোধী, সমাজবিরোধী কিছু স্লোগানবাজি হয়। দেশকে টুকরো টুকরো করা, ৩৭০ ধারা বিলুপ্তির প্রসঙ্গ সহ নানা রাজনৈতিক ইস্যু নিয়ে স্লোগান এবং পোস্টার হাতে নিয়ে বিক্ষোভে সামিল হয়েছে এক শ্রেণির মানুষ। তখন থেকেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছিল এরা কারা ? এঁরা তো ছাত্রছাত্রী নয়। এঁরা বিভিন্ন রাজনৈতিক শিবিরের মানুষ। এই বিক্ষোভ সমাবেশকে হাতিয়ার করে সরকার বিরোধী তাদের মনোভাব প্রকাশ করে বিক্ষোভ আন্দোলনকে বিপথে চালিত করা লক্ষ্য ছিল তাদের। কিন্তু পরিস্থিতি সেদিকে মোড় না নেওয়ায় তাদের ষড়যন্ত্র বানচাল হয়ে গেছে। যন্তর মন্তরে আন্দোলন এবং ২০ জুলাই সংসদ চলো অভিযানের সময় দেশবিরোধী স্লোগান দেওয়া এবং পুলিশের উপর হামলা চালানোর ঘটনায় যারা যুক্ত তাঁরা আসলেই দাগি অভিযুক্ত। জানা গেছে, আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া ২০১৮ ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের মামলা নথিভুক্ত রয়েছে। দিল্লি পুলিশ শহরের বিভিন্ন স্থানে ফেসিয়াল রিকগনিশন সিস্টেম বসিয়েছিল। এই সিস্টেমের আপলোড হওয়া চেহারা এবং সিসিটিভি ফুটেজ থেকে পাওয়া চেহারাগুলি বিশ্লেষণ করেই পুলিশ খুঁজে পেয়েছে এই দাগি অভিযুক্তদের উপস্থিতি। এদের মধ্যে অনেকের বিরুদ্ধেই খুন, খুনের চেষ্টা, ধর্ষণ, ডাকাতি, ছিনতাই অপহরণ, অস্ত্র আইনে অপরাধ, মাদকদ্রব্য পাচার সংক্রান্ত মামলা রয়েছে। পুলিশের উপর হামলা চালানোর পিছনে এরাই মূলত এটা এখন বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠছে। দিল্লি পুলিশ অবশ্য আগেই সন্দেহ প্রকাশ করেছিল ছাত্র আন্দোলনে মিশে গিয়েছে কিছু অপরাধ প্রবণ মানসিকতার মানুষ। দিল্লি পুলিশের এ কথা প্রায় এখন প্রতিয়মান হচ্ছে। পুলিশের পক্ষ থেকে এই রিপোর্ট আদালতে পেশ করা হবে। ফলে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সুপ্রিম কোর্টে যে মামলা দায়ের করা হয়েছিল তার সুবিচার করার ক্ষেত্রে আদালত উপযুক্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারবে।
কিছু কিছু ঘটনাকে সামনে রেখে একটি মহল থেকে প্রচার করা হয়েছিল ককরোচ জনতা পার্টির এই আন্দোলন বিদেশি মদদ পুষ্ট। বিদেশের আর্থিক মদত নিয়েই আন্দোলন চালানো হচ্ছে বলে যখন প্রশ্ন উঠতে শুরু করে তখন কেন্দ্রীয় বিদেশ মন্ত্রক জানিয়ে দেয় এদের বিদেশি আর্থিক মদত মেলার অভিযোগটি সত্য নয়। আন্দোলন চলাকালে একটি মহল থেকে আন্দোলনকারীদের চিনের দালাল, পাকিস্তানের দালাল এই ধরনের শব্দ প্রয়োগ করে মনোবল ভাঙ্গার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু এতে কোনো লাভ হয়নি। বরং দেশের বুদ্ধিজীবী মহল যুবকদের এই আন্দোলনকে যথাযথ বলে মর্যাদা দিয়েছেন। এমনকি আরএসএস নেতা মোহন ভাগবত পর্যন্ত বলেছেন যুব প্রজন্মের কথা কেবল শুনলেই হবে না তাদের প্রশ্নের জবাব দেওয়াও প্রয়োজন। অর্থাৎ যুব প্রজন্মের উপর তারও যথেষ্ট আস্থা রয়েছে এটা প্রমাণ করে দিয়েছেন। একশ্রেণির মিডিয়া এই আন্দোলনকে বিদেশী মদদপুষ্ট আন্দোলন বলে দেগে দিয়ে তাদের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করতে চেয়েছিল। এর পরিনাম অন্যান্য মিডিয়ার কিছু মানুষ যখন আন্দোলনস্থলে গিয়ে তা সম্প্রচার করার চেষ্টা করেন তখন মিডিয়া কর্মীদের সেখানে হেনস্থা করে সরিয়ে দেওয়া হয়। এ বিষয়কে কেন্দ্র করেও বেশ কিছু জল ঘোলা করার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে মিডিয়া যে এই আন্দোলনের সম্পর্কে নীরব ছিল না এটা সত্য কথা। মিডিয়া নীরব ভূমিকা নিলে আন্দোলন সারাদেশব্যাপী এভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারতো না। কারণ কেবল সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে এত ব্যাপক প্রভাব সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। তাছাড়া সোশ্যাল মিডিয়াতে যারা সরব ভূমিকা পালন করেছে এর মধ্যে মেন স্টিম মিডিয়ার মানুষও রয়েছেন।
ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলন দমনের নামে পুলিশ যে পেলেট গান ও লাঠিচার্জ করেছে এ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের হয়েছে। মামলার শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট অন্তর্বর্তী আদেশ দিয়ে বলেছে ১৮ বছরের নিচে বয়স যে সব পড়ুয়ার তাদেরকে বিনা শর্তে মুক্তি দিতে হবে। তবে যাদের বিরুদ্ধে অপরাধের মামলা রয়েছে তাদের মুক্তি দেওয়া যাবে না। প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের বেঞ্চে এই মামলার শুনানি চলছে। আন্দোলন চলাকালে পুলিশের উপর যে হামলা হয়েছে তারও খতিয়ে দেখবে আদালত। সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মার্কন্ডেও কার্টজু বলেছেন প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলনে যুক্ত যুব প্রজন্মকে বিনা শর্তে রেহাই দিতে হবে। তবে যাদের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই নানা ধরনের মামলা রয়েছে তাদের জন্য ছেড়ে দেওয়া না হয়। তাহলে একটা বাজে পরম্পরা তৈরি হয়ে যাবে। দেশের প্রখ্যাত আইনজীবী, সাংবাদিক সহ অন্যান্য পেশার দায়িত্বশীল নাগরিকরাও একই ধরনের মনোভাব প্রকাশ করে চলেছেন। যুব প্রজন্মকে শান্তিপূর্ণ উপায়ে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রকাশের সুপরামর্শ দিয়েছেন অনেকেই। বিশিষ্ট সমাজকর্মী আন্না হাজারে বলেছেন তিনি বহুবার অনশন ধর্মঘট করেছেন। এই আন্দোলন শান্তিপূর্ণ এবং গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে করতে হয়। সিজেপিকে বিষয়টি মাথায় রাখতে পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তবে সিজিপি এই আন্দোলনে যুক্ত প্রত্যেককেই মুক্তি দেওয়ার দাবিতে অনড় রয়েছে। তারা প্রয়োজনে ফের আন্দোলন মুখী হবে বলেও জানিয়ে দিয়েছে। এক্ষেত্রে সিজিপিকে একটি কথা মনে রাখতে হবে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান সরাসরি যুক্ত ছিলেন না। তথাপি এর দায় স্বীকার করে তিনি ইস্তফা দিয়েছেন। কাজেই আন্দোলনের সময় পুলিশের উপর হামলার দায়ক সিজেপি অস্বীকার করতে পারে না। আন্দোলনে যেসব সমাজবিরোধী ও দেশবিরোধী শক্তি যুক্ত হয়ে পড়েছিল তাদের চিহ্নিত করে পৃথক করার দায়িত্ব থেকে বিজেপি নিজেকে সরিয়ে রাখতে পারে না। তবে বিজেপি সভাপতি অভিজিৎ দীপকে অবশ্য কোনো কোনো রাজ্যে ছাত্রদের উপর পুলিশের নিগ্রহ চলছে, এই অভিযোগ এনেছেন। বলেছেন এসব বন্ধ না হলে তারা ফের রাজপথে আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবে।
কেন্দ্রের সঙ্গে বৈঠক শেষ হওয়ার পর সিজিপি আন্দোলন প্রত্যাহার করে। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্রপ্রধান ইস্তফা দেওয়ার পর আন্দোলনের বিজয় হয়েছে এটা ধরে নিয়ে সিজেপি নেতারা উৎসবের মতো বিষয়টি উদযাপনে মেতে ওঠে। সিজেপির এই উদযাপনকে সবাই ভালো চোখে দেখছে না। বিশেষ করে সিজেপির মুখপাত্র সৌরভ দাস যে পার্টিতে অংশগ্রহণ করে তাতে শৃংখলার অভাব দেখা দিয়েছে। তাছাড়া তার সঙ্গে দিল্লি দাঙ্গার ঘটনায় অভিযুক্ত ওমর খালিদের সঙ্গে যে ছবি প্রকাশ পেয়েছে, তার নিয়ে নেট দুনিয়ায় তুমুল প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সৌরভ ওমর খলিদকে নির্ভীক নেতা হিসেবে প্রশংসায় ভাসিয়েছেন। এ বিষয়টি অনেকের কাছেই দৃষ্টিকটু লেগেছে। ঘটনা সিজেপির ভাবমূর্তিতে কিছুটা হলেও বিরূপ প্রভাব ফেলবে বলে মনে করা হচ্ছে। পরিবেশবিদ ও বিজ্ঞানী সনম ওয়াংচুক বলেছেন উদযাপনে সংযত থাকা বাঞ্ছনীয়। সিজেপি নেতারা যাতে দেশবিরোধী এবং নানা অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সংস্পর্শ এড়িয়ে চড়ে এমন পরামর্শ দিয়েছেন দেশের বুদ্ধিজীবীরা। পড়ুয়াদের জন্য ন্যায় বিচার চাইতে গিয়ে তারা যেন সংকীর্ণ রাজনীতির শিকার না হয় সে কথাটাও অনেকেই স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।
এদিকে, বারংবার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী অশ্বিনী উপাধ্যায় বলেন-গত ২৫ বছরে সারা দেশে ২০০ বার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। যার জন্য আনুমানিক ১২ কোটি মানুষ সমস্যায় পড়েছে। কিন্তু প্রতিবারই একে অপরকে দোষারোপ, অভিযোগ পাল্টা অভিযোগ, রাজনৈতিক বাতাবরণ গরম হলেও প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ করা যায়নি।এ কান্ডে কিছু নিচুতলার লোকজন ধরা পরে কিন্তু অধরা থেকে যায় মাস্টার মাইন্ডরা ,তাই তদের বিরুদ্ধে যত দিন না কঠোর আইন, দ্রুত বিচার এবং কঠিন শাস্তি হচ্ছে, ততদিন দেশে পেপার লিক্ বন্ধ করা সম্ভব হবে না, যারা পেপার লিক্ করে, সেই সব মাস্টারমাইন্ডরা কোটি কোটি টাকার মালিক, তারা অর্থ এবং ক্ষমতার জোরে তদন্ত, সাক্ষ প্রমাণ এবং বিচার ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে। প্রশ্নপত্র ফাঁসির ঘটনা ঠেকাতে কেন্দ্র এবার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এ বিষয়ে ইতিমধ্যে সংসদে আইন উত্থাপন করা হয়েছে এবং লোকসভায় তা ধ্বনি ভোটে পাস হয়ে গেছে। নতুন এই আইনে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় যুক্ত প্রমাণিত হলে তাকে ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং দশ কোটি টাকা জরিমানা আদায়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। যদিও বিরোধীরা এই আইনের সারবত্তা নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন কিন্তু অধিকাংশ মানুষ এই আইনকে স্বাগত জানিয়েছেন। আন্দোলনকারী সি জে পি নেতাদের সঙ্গে আলোচনার সময় এই ধরনের কঠোর আইন আনা হবে এ কথা জানানো হয়েছিল।
আমাদের দেশে দুর্নীতির শাখা প্রশাখা বিভিন্ন স্তরে বিস্তৃত হয়ে রয়েছে। দুর্নীতিকে সমূলে উৎপাটন করতে হলে দুর্নীতিতে প্রশ্রয়দাতা যারা তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় দুর্নীতি নির্মূল করা সহজ কাজ নয়। দেশে অনেক কঠোর আইন রয়েছে কিন্তু সব ক্ষেত্রে এর যথাযথ প্রয়োগ দেখতে পাওয়া যায় না। যেকোনো দুর্নীতির মামলায় দেখা যায় চুনোপুটিরা ফেঁসে গেছে , কিন্তু রাঘব বোয়ালরা নিজেদের রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে। এটাই আমাদের দুর্ভাগ্য। এই রাঘব বোয়ালদের কিভাবে নিরস্ত্র করা যায় এর উপর অধিক গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে যারা কোটি কোটি টাকার খেলায় মত্ত হয়েছে তাদের দমন করতে না পারলে পরীক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখা কঠিন। প্রশ্নপত্র ফাঁস বিরোধী নতুন আইনটি চালু হওয়ার পর এক্ষেত্রে সরকারের নজরদারি আরো বাড়িয়ে দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। প্রশ্নপত্র তৈরির সঙ্গে যাদের যুক্ত করা হবে তাদের পারিবারিক ইতিহাস দেখে নেওয়া সরকারের প্রয়োজন রয়েছে। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক রঙ নয়, ব্যক্তির ভাবমূর্তি এবং সমাজ চেতনার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। প্রশ্ন তৈরীর শিক্ষক অধ্যাপকরা যদি নীতিনিষ্ঠ হন তাহলে এটা ফাঁস হওয়ার সম্ভাবনা অনেকটাই কমে আসবে।
সবশেষে বলতে চাই দেশের জেন-জি’রা এই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে দেশকে এক দিশা দেখিয়েছে। সঙ্গে, বিগত ১২ বছর ধরে চলতে থাকা ঘুণে ধরা বিজেপি আইটি সেলের একচেটিয়া প্রপোগান্ডাকেও ওরা এক লহমায় চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছে। এই আন্দোলনে যে শুধুমাত্র পড়ুয়ারাই সামিল হয়েছিলেন তা কিন্তু একদমই নয়, বরং এই আন্দোলনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে জড়িত হয়েছিলেন সমাজের প্রত্যেক বঞ্চিত, অবহেলিত জনগণ। যা দেখে কার্যতঃ শাসক শিবির একেবারে কোনঠাসা হয়ে পড়েছে। ওরা দুঃস্বপ্নেও কোনদিন ভাবতে পারেনি যে, ভারতের যুব প্রজন্মের ডাকে গোটা দেশবাসী একটানা ৩৬ দিন ধরে রাস্তায় সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ধরনা প্রদর্শন করবে। বিজেপির আইটি সেলের মুষ্টিমেয় কিছু ব্যক্তি ভালো করেই জানে যে, ওদের এই ঐক্যবদ্ধতাকে ভাঙা এতো সহজ নয়। তাই ওরা একেবারে মুসড়ে পড়েছে। দেশে নবপ্রজন্মের আন্দোলনের যে ধারা গড়ে উঠেছে তা দুর্নীতি নির্মূল করার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। এই যুবশক্তিকে উপেক্ষার নজরে দেখার কোনো সুযোগ নেই। তবে এই যুবশক্তি যাতে রাজনীতিক কুশীলবদের হাতের পুতুল হয়ে না দাঁড়ায় সে দিকেও তাদের খেয়াল রাখতে হবে। যুব শক্তিকে হাতিয়ার করে কোনও কোনও রাজনৈতিক দল তাদের গোপন এজেন্ডা পূরণের চেষ্টা করতে পারে। এগুলির অনেক সময় দেশের সামগ্রিক হিতের পরিপন্থীও হতে পারে। তাই সিজেপি নেতাদের শান্তিপূর্ণ এবং গণতান্ত্রিক পথ অনুসরণ করে এগিয়ে চলতে হবে। দেশের স্বার্থরক্ষা যদি তাদের উদ্দেশ্য হয় তাহলে এক্ষেত্রে তাদের বিচক্ষণতার সঙ্গে পদক্ষেপ করতে হবে। তাহলে দেশের সিংহভাগ মানুষের সমর্থন তাদের প্রতি থাকবে এতে কোন সন্দেহ নেই। অন্যথায় তাঁরা তাদের ভীত খুব কম সময়েই হারিয়ে ফেলবে। এটা অনুধাবন করা প্রয়োজন।
(মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)



