।। প্রদীপ দত্তরায় ।।
(লেখক প্রাক্তন ছাত্রনেতা ও গৌহাটি হাইকোর্টের আইনজীবী)
২৮ জুলাই : বরাক উপত্যকায় গৌহাটি হাইকোর্টের স্থায়ী বেঞ্চ স্থাপনের দাবি দীর্ঘদিনের। কিন্তু এই দাবি আদায়ের জন্য যে পথ গ্রহণ করা উচিত তা এতদিন করা হয়নি। ভারতীয় জনতা পার্টির নির্বাচনী ইশতেহারে ডিব্রুগড় এবং শিলচরের হাইকোর্টের বেঞ্চ স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিলো। এর কারণ হলো বিচার ব্যবস্থার সুফল যাতে উজান অসম এবং দক্ষিণ অসমের মানুষ ভোগ করতে পারেন সেজন্যই এই বেঞ্চ স্থাপনের প্রস্তাব। যোগাযোগের প্রতিকূলতা দূর করে এবং ব্যয় সাশ্রয় করার জন্যই বেঞ্চ দু’টি স্থাপন করার যৌক্তিকতা রয়েছে। অসমের পূর্ববর্তী সরকার তাদের ভিশন ডকুমেন্টে ডিব্রুগড় ও শিলচরে গৌহাটি হাইকোর্টের বেঞ্চ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করেছিল। যদিও ডিব্রুগড়ের ক্ষেত্রে কিছু বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছিল, শিলচরের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের গণদাবি ও জরুরি প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও এখনও তেমন কোনও অগ্রগতি হয়নি। তবে বরাকে হাইকোর্টের স্থায়ী বেঞ্চ স্থাপনের দাবিতে গড়ে ওঠা কমিটির সদস্যরা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার দারস্ত হলে তিনি তাদের সম্ভাব্য সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। অর্থাৎ রাজ্য সরকার চায় বরাকে হাইকোর্টের ব্ঞ্চে স্থাপন করা হোক। হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির সঙ্গেও কমিটির সদস্যরা সাক্ষাৎ করেছেন এবং বেঞ্চ স্থাপনের যুক্তি তুলে ধরেছেন। এই সাক্ষাৎ ইতিবাচক বলে আশা প্রকাশ করেছেন কমিটির সদস্যরা। প্রধান বিচারপতি প্রতিনিধিদলকে আশ্বস্ত করেছেন যে বিষয়টি যথাযথ কর্তৃপক্ষের বিবেচনার জন্য প্রেরণ করা হবে। এখানে থেমে থাকলে হবে না। প্রয়োজনে এই দাবিটি জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরতে হবে এবং বুঝাতে হবে একটি পশ্চাৎপদ অঞ্চলকে সাংবিধানিক ও ন্যায়বিচারের অধিকার দেওয়ার জন্য মানুষ যে আওয়াজ তুলেছেন তা নিরর্থক নয়। এই দাবির প্রতি অন্যান্য অঞ্চলের মানুষেরও সমর্থন আদায় করতে হবে।
শিলচরে কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনের পর কোন আন্দোলন তেমন ভাঙ্গা বেঁধে উঠতে পারেনি। তবে এবার হাইকোর্টের বেঞ্চ স্থাপনের জন্য গণআন্দোলন গড়ে উঠতে শুরু করেছে। শিলচর, শ্রীভূমি, হাইলাকান্দি এবং হাফলং জেলা বারের সদস্যরা বরাকে হাইকোর্টের স্থায়ী বেঞ্চ স্থাপনের সমর্থন করে এগিয়ে এসেছেন। কেবল আইনজীবীরাই নন এই দাবির প্রতি বিভিন্ন অরাজনৈতিক সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, সামাজিক সংগঠন, সাংস্কৃতিক সংগঠন সমর্থন করে এগিয়ে এসেছে। দাবির পক্ষে জনমত গঠন করছে উপত্যকার বিভিন্ন স্থানে জনসভার আয়োজন করে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ অভিযান চালানো হচ্ছে। হাজার হাজার মানুষ এই দাবিপত্রে ইতিমধ্যে স্বাক্ষর করেছেন। বরাকে হাইকোর্টের বেঞ্চ স্থাপন কতটা প্রয়োজনীয় তা এখন অধিকাংশ মানুষই উপলব্ধি করতে পারছেন। যারা বিভিন্ন মামলা মকর্দমায় জড়িত তারা জানেন বরাক থেকে গুয়াহাটি গিয়ে উচ্চ আদালতে মামলা লড়ার কাজটি খুবই কঠিন। প্রতিকূল যাতায়াত ব্যবস্থা, ব্যয় বহুল থাকার ব্যবস্থা, আইনজীবীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা সব ক্ষেত্রেই নানা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়। এতে করে সময় এবং অর্থ দুটোই অপচয় হয়। গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র মানুষের পক্ষে এই ব্যয়ভার বহন করা সহজ হয় না। খরচের ভয়ে কেউ যদি মামলা চালানোর ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকেন তাহলে তার পক্ষে ন্যায় লাভ করা সম্ভব নয়। তাই অনেকে সম্পদ বিক্রি করে ন্যায় বিচারের জন্য হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন।
গৌহাটি হাইকোর্টে বরাক উপত্যকা থেকে প্রায় ৩০ শতাংশ মামলা জমা পড়ে। এই মামলা লড়ার জন্য এ অঞ্চলের মানুষকে যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রতিকূলতা সত্ত্বেও গুয়াহাটি যাতায়াত করতে হয়। বরাক উপত্যকার গ্রামাঞ্চলের মানুষ সাধারণত এখানকার আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে থাকেন। অনেকে ভালো করে শুদ্ধ বাংলা বলতে পর্যন্ত পারেন না কাজেই তাদের পক্ষে অসমীয়া ভাষায় আইনজীবীদের সঙ্গে বার্তালাপ করা সহজ হয় না। মক্কেলরা যদি তার মনের ভাব ঠিকমতো প্রকাশ করতে না পারেন বা ঘটনার বিবরণ ঠিকভাবে বুঝিয়ে বলতে না পারেন তাহলে আইনজীবীর পক্ষে সেই মামলা লড়া খুব সহজ হয় না। এক্ষেত্রে অনেক সময় বরকের মক্কেলরা মধ্যস্থতাকারীর সাহায্য নিতে বাধ্য হন। এই মধ্যস্থতাকারীদের পিছনে টাকা পয়সা খরচ করতে হয়। মধ্যস্থতাকারীরা আইনজীবী ঠিক করে দেওয়া এবং মামলার বিষয় আইনজীবীকে বুঝিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করে থাকেন। তাছাড়া কিছু ব্যক্তি বিশেষ হাইকোর্টের আইনজীবীর কাছে মামলা তুলে দেওয়ার জন্য কমিশন নিয়ে থাকেন। এগুলো কোনো লুকানো বিষয় নয়। সব মিলিয়ে বরাকের মক্কেলদের মামলা করার ব্যয় বেড়ে যায়। বরাকে হাইকোর্টের বেঞ্চ স্থাপন হয়ে গেলে অহেতুক অনেক খরচ বেঁচে যেতে পারে। বিশেষ করে যাতায়াতের খরচ, গুয়াহাটিতে থাকার খরচ, মধ্যস্থতাকারীদের অর্থ প্রদানের খরচ সহ অন্যান্য রাহা খরচ।
আমি ব্যক্তিগতভাবে বরাকে গৌহাটি হাইকোর্টের স্থায়ী বেঞ্চ স্থাপনের যৌক্তিকতা তুলে ধরে গৌহাটি বার সংস্থার সাধারণ সম্পাদকের কাছে চিঠি পাঠিয়েছি। তাতে আমি লিখেছি, আমি ১৯৯৫ সাল থেকে গৌহাটি হাইকোর্ট বারের একজন নিয়মিত সদস্য (এনরোলমেন্ট নং ১০৮/১৯৯৫; সদস্যপদ নং ০১০৯০, তারিখ ১৩.০২.১৯৯৬)। গত ত্রিশ বছরের আইনজীবী জীবনে, শিলচর থেকে আমি বরাক উপত্যকার অসংখ্য মামলাকারীর পক্ষে গৌহাটি হাইকোর্টে সওয়াল করেছি। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমার মক্কেলদের শিলচর থেকে গুয়াহাটি যাতায়াত এবং আদালতের কার্যক্রম চলাকালীন আমার আবাসনের অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হয়েছে। এই আর্থিক বোঝা বিশেষত বরাক উপত্যকার গ্রামীণ ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল শ্রেণির মানুষের জন্য অত্যন্ত কষ্টসাধ্য, যার ফলে ন্যায়বিচার লাভ করা কঠিন ও ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। বরাক উপত্যকায় প্রায় ৪৫ লক্ষ মানুষের বসবাস, এবং গৌহাটি হাইকোর্টে বিচারাধীন মামলাগুলির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই অঞ্চল থেকে আসে। তা সত্ত্বেও, মামলাকারীদের প্রায় বারো ঘণ্টা ভ্রমণ করে গৌহাটি পৌঁছাতে হয়, থাকার ব্যবস্থা করতে হয় এবং উল্লেখযোগ্য ভ্রমণ ব্যয় বহন করতে হয়। বরাক উপত্যকা ও গুয়াহাটির মধ্যে সড়ক ও রেল যোগাযোগ, বিশেষ করে বর্ষাকালে, প্রায়ই অনির্ভরযোগ্য হয়ে পড়ে, ফলে দুর্ভোগ আরও বৃদ্ধি পায়। এছাড়াও অপরিচিত শহরে আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ ও আইনি পরিষেবা গ্রহণের ক্ষেত্রেও বহু মামলাকারী ভাষাগত ও ব্যবহারিক সমস্যার সম্মুখীন হন। এই প্রসঙ্গ উল্লেখ করে আমি বার সংস্থার সাধারণ সম্পাদকের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছি। বরাক উপত্যকায় গড়ে ওঠা হাইকোর্ট বেঞ্চ ডিমান্ড ইমপ্লিমেন্টেশন কমিটি, যেখানে বরাক উপত্যকার বিশিষ্ট আইনজীবী ও সম্মানিত সমাজনেতারা যুক্ত রয়েছেন, এই দাবির পক্ষে ব্যাপক জনসমর্থন গড়ে তুলেছে। কমিটির একটি প্রতিনিধিদল গৌহাটি হাইকোর্টের মাননীয় প্রধান বিচারপতি এবং অসমের মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বরাক উপত্যকায় একটি স্থায়ী বেঞ্চ প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন। এই প্রেক্ষাপটে, আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে গৌহাটি হাইকোর্ট বার সংস্থার সমর্থন ও অনুমোদন এই দীর্ঘদিনের দাবিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে বিশেষ গুরুত্ব ও নৈতিক শক্তি প্রদান করবে। এই সমর্থন বরাক উপত্যকার মানুষের জন্য ন্যায়বিচারে সমান ও কার্যকর প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার সম্মিলিত প্রচেষ্টাকে আরও শক্তিশালী করবে। অতএব, আমি আপনার নিকট এবং গৌহাটি হাইকোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সম্মানিত কার্যনির্বাহী কমিটির নিকট বিনীত আবেদন জানাচ্ছি যে, বরাক উপত্যকায় গৌহাটি হাইকোর্টের একটি স্থায়ী বেঞ্চ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবটি সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করে আপনাদের সর্বাত্মক সমর্থন প্রদান করবেন। এই পদক্ষেপ হাজার হাজার মামলাকারীর দুর্ভোগ বহুলাংশে লাঘব করবে এবং সকলের জন্য সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার সাংবিধানিক লক্ষ্য পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
বরাকে গৌহাটি হাইকোর্টের স্থায়ী বেঞ্চ স্থাপন করতে হলে হাইকোর্টের বার সংস্থার সক্রিয় সহযোগিতার প্রয়োজন রয়েছে। এই সংস্থার সহযোগিতা ছাড়া বিষয়টির জটিলতা দূর করা সহজ হবে বলে মনে হয় না। এ প্রসঙ্গে একটি কথা উল্লেখ করার প্রয়োজন যে হাইকোর্টকে উত্তর গুয়াহাটিতে স্থানান্তর করার জন্য রাজ্য সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছিল তাতে হাইকোর্ট বার সংস্থার সমর্থন নেই। সংস্থার সদস্যরা এর প্রতিবাদ করেছেন। আইনজীবীরা এই ইস্যুতে ধর্মঘট পর্যন্ত করেছেন। ফলে হাইকোর্টের ভবন স্থানান্তরের প্রক্রিয়াটি অগ্রসর হয়নি। কাজেই রাজ্য সরকার চাইলেই বরাকে হাইকোর্টের বেঞ্চ স্থাপন করার যে সহজ হবে তা কিন্তু নয়। এক্ষেত্রে গৌহাটি বার সংস্থার সদিচ্ছার মনোভাব খুবই প্রয়োজন। তাদের সমর্থন আদায়ের জন্য হাইকোর্ট বেঞ্চ দাবি কমিটির সদস্যদের আরো সক্রিয় ভূমিকা পালনে এগিয়ে আসতে হবে। তবে বরাকে হাইকোর্টের স্থায়ী বেঞ্চ স্থাপনের এই দাবি যদি গণদাবিতে রূপান্তরিত হয়ে বিশাল আকার ধারণ করে তখন সরকার এবং বিচার বিভাগের পক্ষ থেকে এটাকে নস্যাৎ করার কোনও উপায় থাকবে না। পরিস্থিতি তেমন হলে হাইকোর্ট বার সংস্থাও একে সমর্থন না করে পারবে না। তাছাড়া বরাকের যে কোনও সমস্যার সমাধানের জন্য অনেক কাঠ-খর পোড়াতে হয় এটা এ অঞ্চলের মানুষ খুব ভালোভাবেই জানেন। তাই দাবি আদায়ের জন্য আটঘাট বেঁধে আমজনতাকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলনমুখী মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। গণস্বাক্ষর সংগ্রহের কর্মসূচি চালিয়ে যেতে হবে। এ উপত্যকার সবাইকে বুঝাতে হবে এই দাবি আদায়ের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু। জনগণের ন্যায় বিচারের স্বার্থেই এই বেঞ্চ স্থাপন করা প্রয়োজন, এটা সর্বস্তরের জনগণকে বোঝাতে হবে। তাহলে দাবি আদায় করা হয়তো কঠিন হবে না। কমিটির নেতৃবৃন্দ সেই লক্ষ্য সামনে রেখেই কাজ করে যাচ্ছেন। তাদের সেই নিরলস প্রচেষ্টা ফলপ্রসু হবে। আমি আশাবাদী বিলম্ব হলেও বরাকের মানুষের এই গণ দাবি একদিন না একদিন পূরণ হবেই।
(মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)



