মোহাম্মদ জনি, শ্রীভূমি।
বরাক তরঙ্গ, ২২ জুলাই : প্রবল বর্ষণ ও প্রতিকূল আবহাওয়াকেও উপেক্ষা করে উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হলো পাথারকান্দির ঐতিহ্যবাহী ১০১তম নব রথযাত্রা মহোৎসব। সকাল থেকেই আকাশ মেঘাচ্ছন্ন ছিল। দুপুরের পর শুরু হওয়া টানা বৃষ্টি বিকেলের দিকে আরও তীব্র আকার ধারণ করলেও ভক্তদের উৎসাহে কোনো ভাটা পড়েনি। শিশু থেকে প্রবীণ, নারী-পুরুষ—সব বয়সের হাজারো মানুষ ছাতা, রেইনকোট কিংবা বৃষ্টিতে ভিজেই স্থানীয় মুণ্ডমালা খেলার মাঠে উপস্থিত হন।
পাথারকান্দি নব রথ পরিচালনা কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত এই মহোৎসব এ বছর ১০১ বছরে পদার্পণ করায় উৎসবের গুরুত্ব ছিল বিশেষ। শতবর্ষ পেরিয়ে নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করা এই রথযাত্রা কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠানই নয়, বরং পাথারকান্দির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অন্যতম প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।
প্রতি বছরের মতো এবারও মুণ্ডমালা খেলার মাঠে নয়টি সুসজ্জিত রথের সমাবেশ ঘটে। শ্রীশ্রী জগন্নাথদেব, বলভদ্র ও সুভদ্রার বিগ্রহ দর্শনের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেন ভক্তরা। প্রণাম, পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ এবং প্রার্থনার মধ্য দিয়ে তাঁরা পরিবারের সুখ-শান্তি ও মঙ্গল কামনা করেন। শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি, কীর্তন, ভজন ও ‘জয় জগন্নাথ’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে গোটা উৎসব প্রাঙ্গণ।
বিকেল থেকেই ৮ নম্বর জাতীয় সড়কে দেখা যায় মানুষের ব্যাপক সমাগম। ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সজ্জিত তরুণ-তরুণী, পরিবার-পরিজন ও বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতে উৎসব প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে তাঁদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ উৎসবের আবহকে আরও সমৃদ্ধ করে তোলে।
রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে মুণ্ডমালা খেলার মাঠ ও আশপাশে বসে অস্থায়ী মেলা। ধর্মীয় সামগ্রী, খেলনা, মিষ্টি, খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যের দোকানে দর্শনার্থীদের ভিড় লক্ষ্য করা যায়। শিশুদের আনন্দ, তরুণদের উচ্ছ্বাস এবং প্রবীণদের আবেগে মুখর হয়ে ওঠে পুরো মেলা প্রাঙ্গণ।
উৎসব নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া হয় কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা। পাথারকান্দি পুলিশের পাশাপাশি আধা-সামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়। যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ, জনসমাগম ব্যবস্থাপনা, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিরাপত্তাকর্মীরা দায়িত্ব পালন করেন। প্রশাসনের তৎপরতায় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই শান্তিপূর্ণভাবে মহোৎসব সম্পন্ন হয়।
প্রবল বর্ষণ সত্ত্বেও হাজারো মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ আবারও প্রমাণ করে দিল, ধর্মীয় বিশ্বাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতি মানুষের ভালোবাসাকে কোনো প্রতিকূলতাই দমিয়ে রাখতে পারে না। ১০১তম নব রথযাত্রা মহোৎসব তাই এ বছরের অন্যতম স্মরণীয় গণ-উৎসব হিসেবে পাথারকান্দির ইতিহাসে স্থান করে নিল।



