শিক্ষক সংকট, বিদ্যালয় একত্রিকরণ, অবকাঠামোর দুর্বলতা ও ডিজিটাল শিক্ষার সীমাবদ্ধতা নিয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ; শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক সংস্কারের দাবি
মোহাম্মদ জনি, শ্রীভূমি।
বরাক তরঙ্গ, ২২ জুলাই : অসম বিধানসভার চলতি বর্ষাকালীন অধিবেশনে রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন দক্ষিণ করিমগঞ্জের বিধায়ক আমিনুর রশিদ চৌধুরী। বুধবার শিক্ষা বিভাগের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি শিক্ষক সংকট, বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত দুর্বলতা, বিদ্যালয় একত্রিকরণ নীতি, ডিজিটাল শিক্ষার সীমাবদ্ধতা এবং উচ্চশিক্ষার উন্নয়ন নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উত্থাপন করেন।
বিধানসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে আমিনুর রশিদ চৌধুরী বলেন, একটি রাজ্যের সার্বিক উন্নয়নের ভিত্তি হচ্ছে শিক্ষা। শিক্ষার মান উন্নত না হলে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা সম্ভব নয়। তাই শিক্ষা খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি। তিনি বলেন, রাজ্যের বহু সরকারি বিদ্যালয়ে এখনও পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, বিজ্ঞানাগার, কম্পিউটার ল্যাব, গ্রন্থাগার, বিশুদ্ধ পানীয়জল ও স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগারের অভাব রয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে এই সমস্যাগুলি আরও প্রকট। ফলে শিক্ষার্থীরা মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বিদ্যালয় একত্রিকরণ নীতির প্রসঙ্গ তুলে বিধায়ক বলেন, অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের দূরবর্তী বিদ্যালয়ে যেতে হচ্ছে, যা বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার ছাত্রছাত্রীদের জন্য সমস্যার সৃষ্টি করছে। শিক্ষার সুযোগ যাতে কোনোভাবেই সংকুচিত না হয়, সে বিষয়ে সরকারকে আরও সংবেদনশীল হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
শিক্ষক সংকটের বিষয়টিকেও তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, রাজ্যের বহু বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক পদ শূন্য পড়ে রয়েছে। এর ফলে অনেক স্কুলে একজন বা দুজন শিক্ষককে একাধিক শ্রেণির দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে, যা পাঠদানের মানকে প্রভাবিত করছে। তিনি দ্রুত শূন্যপদ পূরণ, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষক বদলি ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর করার দাবি জানান।
প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার ওপর জোর দিয়ে আমিনুর রশিদ চৌধুরী বলেন, বর্তমান সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), তথ্যপ্রযুক্তি, রোবোটিক্স ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। সেই বাস্তবতায় স্মার্ট ক্লাসরুম, ডিজিটাল লার্নিং প্ল্যাটফর্ম, কম্পিউটার শিক্ষা এবং কর্মমুখী প্রশিক্ষণের সুযোগ আরও সম্প্রসারণের প্রয়োজন রয়েছে।
উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও তিনি গবেষণার পরিকাঠামো উন্নয়ন, আধুনিক গবেষণাগার স্থাপন, যুগোপযোগী পেশাভিত্তিক কোর্স চালু এবং শিল্প প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের উপযোগী করে গড়ে তুলতে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার প্রসারেরও দাবি জানান তিনি।
অধিবেশন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপচারিতায় বিধায়ক বলেন, তিনি যে বিষয়গুলি বিধানসভায় উত্থাপন করেছেন, তা শুধু দক্ষিণ করিমগঞ্জ নয়, সমগ্র অসমের শিক্ষা ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র। শিক্ষা একটি জাতির মেরুদণ্ড উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতিটি শিশুর মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। শিক্ষিত, দক্ষ ও আত্মনির্ভর যুব সমাজই আগামী দিনের শক্তিশালী অসম গঠনের ভিত্তি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
রাজনৈতিক মহল ও শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, শিক্ষক নিয়োগ, বিদ্যালয়ের পরিকাঠামো উন্নয়ন, ডিজিটাল শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং দক্ষতাভিত্তিক পাঠক্রম বাস্তবায়নের মতো বিষয়গুলি রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। চলতি বিধানসভা অধিবেশনে শিক্ষা নিয়ে এই বিস্তৃত আলোচনাকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।



