।। প্রদীপ দত্তরায়।।
(লেখক প্রাক্তন ছাত্রনেতা ও গৌহাটি হাইকোর্টের আইনজীবী)
২৮ মে : এবার উনিশ মে ভাষা শহিদ দিবস পালনে যে ব্যাপক হারে জনসমাবেশ ঘটে এটা শুভ লক্ষণ বলা যায়। অন্যান্য বারের রেকর্ড ভঙ্গ করে এবার ভাষা শহিদ দিবসের অনুষ্ঠানে ব্যাপক জনসমাগম ঘটেছে। তারাপুর রেলস্টেশন, শ্মশান ঘাট এবং গান্ধীবাগে এত মানুষের উপস্থিতি এর আগে ঘটেনি। ভাষা শহিদ দিবসকে কেন্দ্র করে উনিশের পথ চলা ১৭ মে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক মঞ্চের উদ্যোগে আয়োজন করা হয়। এরপর ১৯ মে ফের শোভাযাত্রা আয়োজন করা হয় তাতে প্রচুর পরিমাণে মানুষ যোগ দিয়েছেন। সমাজের সব শ্রেণির মানুষের এই যোগদান ভাষা চেতনার ক্ষেত্রে ইঙ্গিতবাহী বলে মনে করা যেতে পারে। মিছিলে পা মিলিয়েছেন জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে ছাত্র, যুবক, সমাজের বিভিন্ন স্তরের সচেতন মানুষ। ১৯ মে বিশাল মহাপথচলা সফল করে তোলার জন্য রুপম সাংস্কৃতিক সংস্থার সম্পাদক নিখিল পালের উদ্যোগে এক সভায় বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। ওই সভায় সর্বসম্মতক্রমে ১৯ মে বিশাল মিছিল বের করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সভা থেকে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এই মিছিলে যোগ দেওয়ার জন্য আহ্বান জানানো হয়। এই আহানে ইতিবাচক সাড়া দেখতে পাওয়া গেছে। যোগ দিয়েছেন অসংখ্য মানুষ। এবার ভাষা শহীদ দিবস পালন সার্থক হয়েছে। কারণ কেবল এই তিনটি স্থানই নয়, প্রতিটি পাড়ায় পাড়ায় যেখানে ভাষা শহিদ বেধে রয়েছে সেখানেই ছোট ছোট অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সে অনুষ্ঠানগুলোতেও জনসমাগম ছিল চোখে পড়ার মতো। ভাষা শহিদ দিবস পালন নিয়ে সচেতনতা গড়ে তুলতে কিছু কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে সচেতনতামূলক আলোচনা সভার আয়োজন করেছিল। এরো প্রভাব পড়েছে এবারের অনুষ্ঠানে।
আশির দশকে ভাষা শহিদ দিবস পালনের অনুষ্ঠানে এত জনসমাবেশ ঘটতে দেখা যায়নি। হাতেগোনা কিছু পরিচিত মুখ সকালে রেল স্টেশন, শ্মশান এবং দুপুরে গান্ধীবাগে জড়ো হয়ে ভাষা শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ নিবেদন করতেন। এরমধ্যে কিছু প্রশাসনের ব্যক্তি কয়েকজন জনপ্রতিনিধি এবং কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের ভাষা প্রেমিক জনসাধারণ থাকতেন। এক কথায় বললে কিছু চেনা মুখ কেই প্রতিবার অনুষ্ঠান পালন করতে দেখা যেত। কিছু কিছু সাংস্কৃতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা এই অনুষ্ঠানে যোগ দিতেন।ছাত্র-ছাত্রীদের সংখ্যা খুবই নগণ্য থাকতো। কিন্তু ভাষা আন্দোলনের সুবর্ণ জয়ন্তী বর্ষে ১৯ মে উদযাপন কমিটির উদ্যোগে বিশাল মিছিল করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। সেবার বিশাল মিছিল ছাড়াও গান্ধীবাগে পৃথক মঞ্চ বানিয়ে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় গান্ধীভবনের ভেতর চিত্রাংকন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। সারাদিনব্যাপী এই অনুষ্ঠানে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের অংশগ্রহণ আলাদা মাত্রা এনে দেয়। অনুষ্ঠানকে সফল করে তোলার জন্য তৎকালীন স্কুল ইন্সপেক্টর জালাল উদ্দিন মজুমদার ইতিবাচক ভূমিকা নিয়ে প্রতিটি স্কুলের প্রধানকে ভাষা শহিদ দিবসের অনুষ্ঠান পালনে পড়ুয়াদের অংশগ্রহণে উৎসাহিত করার বার্তা দিয়েছিলেন। সেবার থেকেই ধীরে ধীরে জনসমাগম বাড়তে শুরু করে। এর পরের বছরগুলিতে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক মঞ্চ সহ অন্যান্য স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলি ভাষা শহীদ দিবসের অনুষ্ঠানকে সফল করে তুলতে ব্যাপক প্রচার অভিযান শুরু করে। এর ফলে প্রতিবছর একটু একটু করে জনসমাগম বাড়তে শুরু করে। গত বছর বরাকের আওয়াজ নামে একটি সংগঠন ময়দানে নেমে ব্যাপক সাড়া ফেলে দেয়। গত বছর ভাষা শহিদ দিবসকে কেন্দ্র করে মহাপথচলার আয়োজন করা হয়েছিল। গান্ধীবাগের সামনে আলপনা দেওয়া, দুপুরে গান্ধীবাগে অনুষ্ঠান, রক্তদান শিবির, রেল স্টেশনের মঞ্চে সারাদিনব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ইত্যাদিতে মানুষের অংশগ্রহণ ক্রমেই বাড়তে থাকে। এই দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে কলকাতা এবং বাংলাদেশ থেকেও ভাষাপ্রেমীরা প্রতিবারই ছুটে আসেন। উনিশ মে-র ঘটনা যা যথার্থভাবে প্রচার পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা ছিল তা আস্তে আস্তে কেটে যাচ্ছে। উনিশ সম্পর্কে অন্যান্য রাজ্যের মানুষ এখন জানতে পেরেছেন এমনকি এখন কেন্দ্রীয় নেতারাও এ বিষয়ে অবহিত।
উনিশ নিয়ে সচেতনতা বাড়লেও রাজ্য সরকার এখনো শিলচর রেলস্টেশনকে ভাষা শহিদ স্টেশন নামকরণের প্রস্তাবে ইতিবাচক সাড়া দেয়নি।কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং রেল মন্ত্রণালয় এই নামকরণের অনুমোদন দিলেও শুধুমাত্র আসাম সরকারের অনীহার জন্য এটা আটকে রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা গত বছর এই ইস্যুতে জোড় গলায় বলেছেন রাজ্য সরকার এনওসি দিয়ে দিয়েছে। কিন্তু এখানে এনওসি দেওয়ার কোনও বিষয় জড়িত নেই। ২০১৫ সালে কেন্দ্র আসাম সরকারকে চিঠি দিয়ে জানিয়ে দিয়েছিল ‘ভাষা শহিদ স্টেশন শিলচর’ নামকরণের বানানটা কেমন হবে তা অনুমোদন করে কেন্দ্রের কাছে পাঠাতে। কিন্তু এ চিঠির কোনও জবাব আসাম সরকার আজ অবধি দেয়নি। ফলে সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাটাই স্বাভাবিক। শিলচর রেলস্টেশনকে ভাষা শহিদ স্টেশন করার দাবিটি দীর্ঘদিনের হলেও এটা যাতে বাস্তবায়িত না হয় সেজন্য নানাভাবে প্যাঁচ কষা হচ্ছে। গতবছর ডিমাসা লেখক ফোরামের সভাপতি মুক্তেশ্বর ক্যাম্প্রাই নামের এক ব্যক্তিকে দিয়ে ১৯৬১ সালের ভাষা আন্দোলনকারীদের বাংলাদেশী আখ্যা দেওয়ানো হয়েছে। ওই ব্যক্তি স্টেশনের নামাকরণের প্রশ্নে আপত্তি দেখিয়েছে না। ওই ব্যক্তির হয়তো জানা নেই ৬১’র ভাষা আন্দোলনের বাঙালিদের সঙ্গে মণিপুরি, ডিমাসা, চা বাগান সম্প্রদায় সহ অন্যান্য জনজাতি জনগোষ্ঠীর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। কারণ এই আন্দোলন বাংলা ভাষায় রক্ষার আন্দোলন ছিল না এটা ছিল মাতৃভাষা রক্ষার আন্দোলন। ভাষা শহিদ স্টেশন নামকরণের সঙ্গে কোনও নির্দিষ্ট ভাষিকগোষ্ঠীর কোনও লাভ ক্ষতির বিষয় জড়িত নেই। ৬১ সালের আন্দোলনে ডিমাসাদের সমর্থন ছিল তাই এই জনগোষ্ঠীর মানুষ এতে আপত্তি তুলবেন না। শিলচর রেল স্টেশনের নাম ভাষা শহিদ স্টেশন হলে কোনভাষিক গোষ্ঠীর এতে কোনও ধরনের লাভ বা ক্ষতি নেই। বরং মাতৃভাষার অস্তিত্ব রক্ষার দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে নিরীহ যে ১১ জন ব্যক্তি শহিদ হয়েছিলেন তাদের সেই আত্মত্যাগের যথার্থ মূল্যায়ন এই নামকরণের মধ্যেই হতে পারে।
শিলচর রেল স্টেশনকে যাতে ভাষা শহিদ স্টেশন নামকরণ করা হয় এজন্য অসম সাহিত্য সভার কেন্দ্রীয় সভাপতি বসন্তকুমার গোস্বামী গত বছর এই দাবির সমর্থনে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর কাছে চিঠি লিখেছিলেন। কিন্তু এই চিঠি পাওয়ার পরও রাজ্য সরকার কোনও ধরনের পদক্ষেপ করেনি। অসম সাহিত্য সভার সভাপতি গত বছরের চিঠির উল্লেখ করে এবার ফের চিঠি লিখেছেন। কিন্তু কোন সাড়া মেলেনি এতে। বেসরকারিভাবে ভাষা শহিদ দিবসকে শাসক দল স্বীকৃতি দিলেও রেল স্টেশনের নামাকরণের প্রশ্নটি নিয়ে রহস্যজনক নীরবতা পালন করে থাকে। সন্দেহ করা হচ্ছে ভাষা শহিদদের সরকারিভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। তাই রেল স্টেশনের নামাকরণ ভাষা শহিদদের নামে করা হলে এটা পরোক্ষে ভাষা শহিদদের স্বীকৃতি দেওয়া হয়ে যাবে। এতে সমস্যা রয়েছে। কারণ, রাজ্য সরকারের রেকর্ডে ভাষা শহিদরা সাধারণ দুষ্কৃতী হিসেবেই লিপিবদ্ধ। গত বছর বিধানসভায় এক প্রশ্নোত্তর কালে এ কথা স্পষ্টভাবেই জানিয়েছিলেন তৎকালীন মন্ত্রী চন্দ্রমোহন পাটোয়ারি। ভাষা শহিদদের সরকারি স্বীকৃতি দিলে এই রেকর্ডও পরিবর্তন করতে হবে। ভাষা শহিদ পরিবারকে দিতে হবে ক্ষতিপূরণও। ভাষা আন্দোলনে ১৯ মে শিলচর রেল স্টেশনে পুলিশ যেগুলি চালিয়েছিল এর তদন্ত করতে মেহরোত্রা কমিশন গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু এই কমিশনের রিপোর্ট আজও প্রকাশ করা হয়নি। প্রতিবছর সেই রিপোর্ট প্রকাশের জন্য আওয়াজ তোলা হলেও রাজ্য সরকার এতে কর্ণপাত করছে না। কি ছিল সেই রিপোর্টে তা প্রকাশ্যে এলেই এই সমস্যার সমাধানের পথ খুঁজে পাওয়া যেত। কমিশনের রিপোর্ট হয়তো যথার্থই ছিল এটা প্রকাশ পেলে ভাষা শহিদদের স্বীকৃতি দেওয়া ছাড়া রাজ্য সরকারের আর কোনও উপায় থাকবে না এটা জানতে পেরেই রাজ্য সরকার বছরের পর বছর এ বিষয়টিকে ধামাচাপা দিয়ে রেখেছে। এমন সন্দেহ করার কারণ রয়েছে।
ভাষা শহিদ দিবসটি ঢাকা, কলকাতা, নয়াদিল্লি, বেঙ্গালুরু, লন্ডন সহ নানা স্থানে পালন করার খবর মিলেছে। সেইসব স্থানে সচেতন নাগরিকরা এই দিবসের তাৎপর্য উপলব্ধি করে এটা পালন করেছেন। এর মাধ্যমে দিবসটির তাৎপর্য অন্যান্য মানুষরাও ধীরে ধীরে জানতে পারছেন, বুঝতে পারছেন। পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশ এবং ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে সাহিত্যিক শিল্পী সংস্কৃতি কর্মী এমনকি চিত্র পরিচালক পর্যন্ত ১৯ এর অনুষ্ঠানে যোগ দিতে প্রতিবারই শিলচর আসছেন। তারা নিজ নিজ স্থানে ফিরে গিয়ে উনিশ সম্পর্কে প্রচার করছেন ফলে আরও বেশি মানুষ ভাষা শহিদ দিবস সম্পর্কে জানতে পারছে। বরাক উপত্যকার নানা প্রান্তে বিভিন্ন সংগঠনের ডাকে এই অনুষ্ঠান পালন করা হয়েছে। কেবল উনিশ মে দিনটিতেই নয় এই দিবসকে সামনে রেখে কুড়ি এবং ২১ মে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সচেতনতা সভা পথ পরিক্রমা সব মিলে এই দিবসকে সাধারণ জনতার সামনে তুলে ধরা হয়েছে। অনুষ্ঠান গুলিতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ দিন দিন বাড়ছে। যারা একসময় এই অনুষ্ঠান আয়োজনের দায়িত্ব সাহিত্য ও সংস্কৃতি সংস্থাগুলির বলে মনে করত তারাও আজকাল অগ্রণী ভূমিকা নিয়ে এগিয়ে এসে দিনটি পালন করছেন। ছোট ছোট অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দিনটি পালন করার মধ্য দিয়ে দেশবাসীর কাছে যে বার্তা দেওয়া হচ্ছে এটা খুবই মূল্যবান। কারণ প্রতিটি জাতির কাছে তার মাতৃভাষা সবচেয়ে অমূল্য। যে ব্যক্তি নিজের মাতৃভাষাকে প্রকৃত সম্মান করতে পারেন। তিনি অন্যের মাতৃভাষাকেও মর্যাদা দেবেন এটাই স্বাভাবিক ব্যাপার। কাজেই এই ভাষা শহীদ দিবস পালন অনুষ্ঠানে কেবল বাঙালিরা নয়, অন্যান্য জনগোষ্ঠীর মানুষও অংশ অংশগ্রহণ করে তাদের নৈতিক সমর্থন জ্ঞাপন করছেন। গোটা বরাক জুড়ে এদিন যেন একটা সংহতির বাতাবরণ গড়ে ওঠে। এটাই বর্তমান সময়ে সবচেয়ে মূল্যবান। আগামী দিনে এই দিবসের অনুষ্ঠান আরও বেশি প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে এটা আশা করা যায়। কারণ নতুন প্রজন্মের মধ্যে এই দিবসের তাৎপর্য যত বেশি ছড়িয়ে পড়বে ততই এ দিবস পালনে মানুষের অংশগ্রহণ বাড়তেই থাকবে।
(মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)



