বিদ্রোহ, মানবতা ও সর্বহারা চেতনার কবি নজরুল

Spread the news

।। আশু চৌধুরী ।।
২৬ মে : বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম এক অনন্য ও অবিস্মরণীয় নাম। তিনি শুধু বিদ্রোহের কবি নন, তিনি মানবমুক্তির কবি, সাম্যের কবি এবং সর্বহারাদের কণ্ঠস্বর। ভারতীয় নবজাগরণের যে আপসহীন ও মানবতাবাদী ধারা উনিশ ও বিশ শতকে সমাজজীবনে নতুন চেতনার সঞ্চার করেছিল, নজরুল তাঁর সাহিত্যকর্মে সেই চেতনাকে গভীরভাবে ধারণ ও প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর কবিতা, গান, প্রবন্ধ ও সাহিত্যকর্মে শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ যেমন উচ্চারিত হয়েছে, তেমনি মানুষে মানুষে ভেদাভেদ দূর করে সাম্য ও মানবতার প্রতিষ্ঠার আহ্বানও ধ্বনিত হয়েছে।
নজরুলের সাহিত্যজীবনের মূল শক্তি ছিল তাঁর আপসহীনতা। তিনি অন্যায়ের সঙ্গে কখনো আপস করেননি। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে যেমন তিনি কলম ধরেছিলেন, তেমনি সমাজের কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও শ্রেণিবৈষম্যের বিরুদ্ধেও সোচ্চার হয়েছিলেন। তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘বিদ্রোহী’ যেন সংগ্রামী চেতনার প্রতীক। তিনি নিপীড়িত ও বঞ্চিত মানুষের বেদনা নিজের হৃদয়ে ধারণ করেছিলেন এবং তাঁদের অধিকারের দাবিকে ভাষা দিয়েছিলেন। তাই তাঁকে “সর্বহারার কবি” বলা হয়।

নজরুল উপলব্ধি করেছিলেন যে, স্বাধীনতা শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা নয়; প্রকৃত স্বাধীনতা তখনই আসবে, যখন সমাজে মানুষে মানুষে বিভেদ দূর হবে। তিনি হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের এক উজ্জ্বল প্রতীক ছিলেন। তাঁর সাহিত্য ও সঙ্গীতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির যে আহ্বান উচ্চারিত হয়েছে, তা আজও সমান প্রাসঙ্গিক। তিনি ধর্মকে মানুষের কল্যাণের পথে দেখতে চেয়েছিলেন, বিভেদের অস্ত্র হিসেবে নয়।
তাঁর সাহিত্যজীবন ছিল অত্যন্ত বহুমুখী।

মাত্র ৪৩ বছরের সাহিত্যজীবনে তিনি কবিতা, গান, নাটক, উপন্যাস ও প্রবন্ধ মিলিয়ে বিপুল সাহিত্যভাণ্ডার সৃষ্টি করেন। ‘অগ্নিবীণা’, ‘সাম্যবাদী’, ‘দোলনচাঁপা’ প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থ বাংলা সাহিত্যে আজও অমূল্য সম্পদ। পাশাপাশি তিনি প্রায় চার হাজার গান রচনা ও সুরারোপ করে বাংলা সংগীতকে সমৃদ্ধ করেছেন। নজরুলগীতি আজও মানুষের হৃদয়ে আবেগ ও চেতনার সঞ্চার করে। শিশুদের জন্যও তিনি লিখেছেন অসাধারণ সব কবিতা ও ছড়া, যেমন— “খুকী ও কাঠবিড়ালি”, “লিচু-চোর” ইত্যাদি।

জীবনের শেষ পর্যায়ে অসুস্থতা ও নীরবতা তাঁকে গ্রাস করলেও তাঁর সৃষ্টির দীপ্তি কখনো ম্লান হয়নি। তাঁর লেখায় যে মানবতাবাদী ও বিপ্লবী চেতনা প্রকাশ পেয়েছে, তা আজও সমাজকে নতুন পথ দেখায়। বর্তমান সমাজে বৈষম্য, শোষণ ও মানবিক সংকটের সময়ে নজরুলের আদর্শ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। তাঁর সাহিত্য আমাদের শিখিয়ে দেয়— মানবমুক্তি, সাম্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম কখনো থেমে থাকতে পারে না। আজকের প্রজন্মের দায়িত্ব হলো নজরুলকে শুধু স্মরণ করা নয়, তাঁর আদর্শকে জীবনে ধারণ করা। মানবতা, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই তাঁর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানো সম্ভব।

সংক্ষিপ্ত জীবনপঞ্জি-
১৮৯৯ : মে মাসের ২৪ তারিখে বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার অন্তর্গত চুরুলিয়া গ্রামে জন্ম। পিতা- ফকির আহম্মদ। মাতা- জাহেদা খাতুন।

১৯০৮ : পিতার মৃত্যু। পরিবারের মধ্যে পিতাই ছিলেন একমাত্র রোজগারী ব্যক্তি। ফলে চরম দারিদ্র্যের সম্মুখীন হতে হয়।

১৯০৯ : গ্রামের মক্তব থেকে নজরুল নিম্ন প্রাথমিক পরীক্ষায় পাস করেন। সংসারের অভাব মেটাতে ঐ মক্তবেই শিক্ষকতা শুরু করেন।

১৯১১ : বর্ধমানের মাথরুণ হাইস্কুলে পড়াশোনা। এখানে পড়াতেন কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিক।

১৯১৪ : ময়মনসিংহে কাজির শিমলার দরিরামপুর হাইস্কুলে পড়াশোনা।

১৯১৫ : রানিগঞ্জের শিয়ারশোল রাজস্কুলে পড়াশোনা। শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব।

১৯১৭ : ৪৯ নং বাঙালি পল্টনের সৈনিক হিসাবে যান নৌশেরাতে। প্রশিক্ষণের পর করাচী। সাহিত্য রচনার সূত্রপাত। প্রথমে লিখতেন গল্প। পরে কবিতা।

১৯২০ : পল্টন ভেঙে যায়। নজরুলের সৈনিক জীবনের অবসান।

১৯২২ : ‘বিজলী’তে ‘বিদ্রোহী’ কবিতার প্রকাশ। পরে পুনর্মুদ্রিত হয় ‘মোসলেম ভারতে’। প্রকাশিত হয় প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অগ্নিবীণা’। রবীন্দ্রনাথের আশীর্বাদ পাথেয় করে প্রকাশিত হয় সম্পাদিত পত্রিকা ‘ধূমকেতু’।

১৯২৩ : রাজদ্রোহের অভিযোগে কারারুদ্ধ। প্রথমে প্রেসিডেন্সি ও আলিপুর সেন্ট্রাল, তারপর হুগলি জেল, সব শেষে বহরমপুর জেলে রাখা হয় কবিকে।

১৯২৪ : ২৪শে এপ্রিল প্রমীলা সেনগুপ্তের সঙ্গে বিবাহ।

১৯২৫ : ফরিদপুরে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের প্রাদেশিক সম্মেলনে গান্ধীজীর সঙ্গে পরিচয়।

১৯২৮ : নজরুলের মাতা পরলোক গমন করেন। সঞ্চিতা-র প্রকাশ। গ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথকে উৎসর্গ করেন।

১৯২৯ : ১৫ ডিসেম্বর অ্যালবার্ট হলে নজরুলকে সংবর্ধনা জানানো হয়। ‘গুণমুগ্ধ বাঙালীর পক্ষে’ জানানো এই সংবর্ধনায় সভাপতিত্ব করেন এস. ওয়াজেদ আলি। সভায় উপস্থিত ছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু।

১৯৩১: সিনেমা ও মঞ্চের সঙ্গে যোগাযোগ। ‘ভক্ত ধ্রুব’ সিনেমায় নারদের ভূমিকায় অভিনয়। এই ছবির সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্ব পালন।

১৯৩৫ : এইচএমভি-র এক্সক্লুসিভ কম্পোজার হিসাবে যোগদান। সঙ্গীত-চর্চায় গভীরভাবে মনোনিবেশ।

১৯৪০ : স্ত্রী প্রমীলা নিদারুণ পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হন। স্ত্রীর নিরাময়ের জন্য বিস্তর চেষ্টা করেন। নানা চিকিৎসা করেও কোনো লাভ হয়নি। কবি ক্রমেই দিশেহারা, বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন।

১৯৪২ : ৯ জুলাই কলকাতা বেতারকেন্দ্রে প্রোগ্রাম করতে করতে কবি অসুস্থ হয়ে পড়েন। অচিরেই বোঝা যায় এ ব্যাধি মারাত্মক। দুরারোগ্য। সাহিত্য সৃষ্টি বন্ধ হয়ে যায়।

১৯৪৫ : কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কবিকে জগত্তারিণী স্বর্ণপদক প্রদান করে।

১৯৬০ : ভারত সরকার কর্তৃক ‘পদ্মভূষণ’ উপাধি প্রদান।

১৯৬২: স্ত্রী প্রমীলার মৃত্যু।

১৯৬৯: রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক সম্মানসূচক ডি. লিট উপাধি প্রদান।

১৯৭২ : স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের আন্তরিক আমন্ত্রণে ঢাকায় যাত্রা। কবির প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শন-স্বরূপ বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান।

১৯৭৩ : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক সম্মানসূচক ডি. লিট উপাধি প্রদান।

১৯৭৫ : বাংলাদেশ সরকার সাহিত্যে সে দেশের সর্বোচ্চ সম্মান ‘একুশে পদক’ দিয়ে কবিকে সম্মানিত করেন।

১৯৭৬ : ২৯শে আগস্ট বাংলাদেশে নজরুল প্রয়াত হন। কবির বয়স তখন সাতাত্তর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *