১৮ মে : ‘আমি ফেঁসে গিয়েছি, বন্ধু। তুই এমনভাবে বিপদে পরিস না। বেশি কথা বলতে পারছি না। ঠিক সময়ে ফোন করব।’ ইনস্টাগ্রামে মীনাক্ষীকে শেষ মেসেজে লিখেছিলেন টুইশা। তাঁর সেই ফোন আর বন্ধুর কাছে আসেনি। পরদিন, ১২ মে, দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা ৩১ বছর বয়সি টুইশার দেহ ভোপালের বাড়িতে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায় । বন্ধুকে বিয়ে না করার অনুরোধ জানিয়ে পাঠানো ওটাই ছিল তাঁর শেষ বার্তা। শুধু বন্ধু নয়, মৃত্যুর পাঁচদিন আগে নিজের মাকেও মেসেজে টুইশা লিখেছিলেন,‘ওরা সবাই খুব নিষ্ঠুর, মা। এই লোকগুলো আমাকে বাঁচতে দেবে না। আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাও।’
মধ্যপ্রদেশের ভোপালে নয়ডার বাসিন্দা টুইশা শর্মার রহস্যমৃত্যু ঘিরে একের পর এক বিস্ফোরক তথ্য সামনে আসছে। প্রাক্তন ‘মিস পুনে’ প্রতিযোগী এবং সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার টুইশার মৃত্যুর তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে মানসিক নির্যাতন, জোর করে গর্ভপাত, পণের দাবির অভিযোগ। মৃত্যুর আগে টুইশার আতঙ্কে ভরা শেষ বার্তাগুলি তারই সাক্ষ্য দিচ্ছে। এখন প্রকাশ্যে এসেছে টুইশার ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট, যা নিয়ে নতুন করে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ভোপালের আইনজীবী সমর্থ সিংয়ের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল নয়ডার টুইশা শর্মার। একটি ডেটিং অ্যাপের মাধ্যমে তাঁদের পরিচয় হয়েছিল। সমর্থের মা গিরিবালা সিং অবসরপ্রাপ্ত বিচারক। বিয়ের মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যেই, ১২ মে ভোপালের কাটারা হিলস এলাকার শ্বশুরবাড়িতে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার হয় টুইশার দেহ। পরিবারের দাবি, তিনি অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন এবং বিয়ের পর থেকেই শ্বশুরবাড়িতে চরম মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছিলেন।
টুইশার পরিবার অভিযোগ করেছে, বিয়ের পর থেকেই তাঁকে মানসিক ও শারীরিক অত্যাচার করা হতো। ভাই মেজর হর্ষিত শর্মার দাবি, টুইশাকে জোর করে গর্ভপাত করতে বাধ্য করা হচ্ছিল। পরিবারের অভিযোগ, টুইশা সন্তান রাখতে চাইলেও তাঁর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় এবং বলা হয় সন্তানটি বৈধ নয়। প্রবল মানসিক চাপের মুখে তাঁকে গর্ভপাত করানো হয়। এ ছাড়াও ২০ লক্ষ টাকার শেয়ার ও বিনিয়োগ স্বামীর পরিবারের নামে হস্তান্তরের জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছিল বলেও অভিযোগ।
ঘটনার দিন রাত ১০টা ৫ মিনিট নাগাদ টুইশা তাঁর মাকে ফোন করেছিলেন বলে দাবি পরিবারের। সেই ফোনে তিনি অত্যাচারের কথা জানান। কিন্তু হঠাৎই ফোন কেটে যায়। পরিবারের অভিযোগ, তখন ঘরে ঢুকেছিলেন তাঁর স্বামী সমর্থ। এর পরেই টুইশা, সমর্থ ও টুইশার শাশুড়িকে বার বার ফোন করলেও কেউ ফোন ধরেননি। রাত ১০টা ১৫ মিনিটে শাশুড়ি ফোন ধরে জানান, টুইশার ঘরের দরজা বন্ধ। পরে রাত ১০টা ২০ মিনিট নাগাদ পরিবারকে বলা হয়, ‘টুইশা শ্বাস নিচ্ছেন না’। পরিবারের আরও অভিযোগ, বাড়ি থেকে হাসপাতালের দূরত্ব মাত্র ১০ মিনিট হলেও তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে অনেক দেরি করা হয়।
এখানেই শেষ নয়, মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগে টুইশা তাঁর বন্ধু মীনাক্ষীকে ইনস্টাগ্রামে যে বার্তা পাঠিয়েছিলেন তাতে ফুটে উঠেছে তাঁর ভয়। ‘আমি তোর জন্য চিন্তিত। আমি তোর পাশে আছি বন্ধু।’ কিন্তু সেই ফোন আর আসেনি। পরদিনই টুইশার মৃত্যুর খবর আসে। এমনকী টুইশা ঘটনার আগে তাঁর মায়ের ফোনও শ্বশুরবাড়ির লোককে নিয়ে অনুযোগ করে মেসেজ করেছিলেন। তিনি লেখেন,‘সমর্থ জিজ্ঞেস করে আমি কার বাচ্চা গর্ভে ধারণ করছি। আমি খুব বিচলিত, এই লোকগুলো খুব খারাপ।’ সেই মেসেজের ছত্রে ছত্রে রয়েছে, হয়রানি, নির্যাতনের বর্ণনা। এই চ্যাটগুলিকেই এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ বলে দাবি করছে পরিবার।
প্রাথমিক পোস্টমর্টেম রিপোর্টে অনুযায়ী, ফাঁস লাগার কারণেই মৃত্যু হয়েছে টুইশা শর্মার। তবে রিপোর্টে শরীরের বিভিন্ন অংশে একাধিক আঘাতের চিহ্নেরও উল্লেখ রয়েছে। ভিসেরা, রক্ত, নখের নমুনা সংরক্ষণ করে ফরেন্সিক পরীক্ষায় পাঠানো হয়েছে। পোশাক ও অন্যান্য নমুনাও পরীক্ষা করা হচ্ছে। টুইশার পরিবার দাবি করেছে, হাত ও কানের কাছে আঘাতের চিহ্ন ছিল, যা খুন ও প্রমাণ লোপাটের আশঙ্কা আরও বাড়াচ্ছে।
ভোপাল পুলিশ অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি গিরিবালা সিং এবং তাঁর আইনজীবী পুত্র সমর্থ সিং-এর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের তদন্তে বিশেষ তদন্তকারী দল বা SIT গঠন করেছে পুলিশ। টুইশার স্বামী সমর্থ সিং ও শাশুড়ি গিরিবালা সিংয়ের বিরুদ্ধে পণপ্রথাজনিত নির্যাতন, মানসিক অত্যাচার, হামলা ও প্রমাণ নষ্টের অভিযোগে মামলা দায়ের হয়েছে। তবে এখনও পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার না করায় ক্ষোভ বাড়ছে পরিবারের মধ্যে। ইতিমধ্যে গিরিবালা সিং আগাম জামিন পেয়েছেন, আর সমর্থ সিং পলাতক বলে জানিয়েছে পুলিশ।
প্রাক্তন মিস পুনে প্রতিযোগী টুইশার নতুন করে দিল্লির AIIMS-এ পোস্টমর্টেমের দাবি তুলে তাঁরা মুখ্যমন্ত্রীর বাড়ির সামনে বিক্ষোভ, আত্মাহুতির হুঁশিয়ারি দিয়েছে তাঁর পরিবার। মৃতার বাবা নবনিধি শর্মার অভিযোগ, তদন্তে গাফিলতি রয়েছে এবং প্রভাবশালী পরিবারের কারণে তদন্ত প্রভাবিত হতে পারে। পরিবারের দাবি, টুইশার দেহ সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও অনিয়ম হচ্ছে। সব মিলিয়ে ঘটনাকে ঘিরে উত্তেজনা তুঙ্গে।



