বরাক তরঙ্গ, ২৯ এপ্রিল : রাজ্যে সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান চরম উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। চলতি ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে সংঘটিত সড়ক দুর্ঘটনায় এক হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে অসমের জাতীয় সড়ক ও অন্যান্য সংযোগকারী রাস্তায় ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাগুলিতে ১,৩২০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং প্রায় ২,৫০০ জনেরও বেশি মানুষ গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন। রাজ্যের পরিবহন ও গৃহ দফতরের সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় এই উদ্বেগজনক তথ্য সামনে এসেছে, যা সাধারণ মানুষের পাশাপাশি সচেতন মহলেও গভীর চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে।
পরিবহন দফতরের এক উচ্চপদস্থ আধিকারিক জানিয়েছেন, এই দুর্ঘটনাগুলির প্রধান কারণগুলির মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানো, হেলমেট ও সিটবেল্ট ব্যবহার না করা এবং মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো। বিশেষ করে যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে বাইক দুর্ঘটনার হার দ্রুত বাড়ছে বলে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি আরও বলেন, বহু ক্ষেত্রে জাতীয় সড়কে চলমান নির্মাণকাজের কারণে চালকদের অসাবধানতার ফলেও দুর্ঘটনা ঘটছে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, কামরূপ মহানগর, কামরূপ গ্রামীণ, যোরহাট ও ডিব্রুগড় জেলায় দুর্ঘটনার হার সবচেয়ে বেশি।
এই পরিসংখ্যান নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে এক সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ বলেন, আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হলেও অনেক চালকের মধ্যে সচেতনতার অভাব স্পষ্ট। ‘আমরা আইন মেনে চলার চেয়ে জরিমানা দেওয়ার ভয়েই বেশি চলি’—এই মন্তব্য করে তিনি জানান, যতদিন না সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রকৃত সচেতনতা তৈরি হবে, ততদিন শুধুমাত্র পুলিশের নজরদারিতে এই মৃত্যুমিছিল থামানো সম্ভব নয়। অন্যদিকে, প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, দুর্ঘটনার পর সময়মতো জরুরি চিকিৎসা পরিষেবা না পাওয়ার কারণেও বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে।
উল্লেখ্য, গত বছরের তুলনায় চলতি বছরে সড়ক দুর্ঘটনার হার প্রায় ১৫ শতাংশ বেড়েছে। যদিও ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে সড়ক নিরাপত্তা মাস পালন করা হয়েছিল, তার প্রভাব বর্তমান পরিস্থিতিতে তেমনভাবে দেখা যায়নি। রাজ্য সরকার ইতিমধ্যেই ইন্টারসেপ্টর গাড়ির সংখ্যা বাড়ানো এবং জাতীয় সড়কে সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি জোরদার করেছে, তবুও দুর্ঘটনার সংখ্যা কমেনি।
বর্তমানে এই ভয়াবহ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পরিবহন দফতর আরও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের পরিকল্পনা করছে। রাজ্যজুড়ে দুই চাকার যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ এবং রাতের সময় পুলিশের টহলদারি বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি, সাধারণ মানুষকে সড়ক নিরাপত্তা বিধি কঠোরভাবে মেনে চলার জন্য সরকারিভাবে আহ্বান জানানো হয়েছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে আগামী দিনে সড়ক নিরাপত্তা সংক্রান্ত আরও নতুন নীতিনির্ধারণের সম্ভাবনাও রয়েছে।
এ দিকে, মঙ্গলবার অসমের মুখ্য সচিব ড. রবি কোটা’র সভাপতিত্বে একটি রাজ্যস্তরের সড়ক নিরাপত্তা পর্যালোচনা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে ২০২৬ সালের প্রথম ত্রৈমাসিকে (জানুয়ারি–মার্চ) রাজ্যের ৩৫টি জেলার সড়ক নিরাপত্তার পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হয়।
পর্যালোচনা বৈঠকে রাজ্য সরকার ও সহযোগী সংস্থার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন পরিবহন বিভাগের আয়ুক্ত ও সচিব; পুলিশ মহাপরিদর্শক (সিআইডি); অসমের পরিবহন আয়ুক্ত; আবগারি আয়ুক্ত; গুয়াহাটি পুলিশ ও সিআইডির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা; NHAI ও NHIDCL-এর কার্যনির্বাহী পরিচালক; পূর্ত (সড়ক) ও স্বাস্থ্য বিভাগের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা; পরিচালক (আইটি), এনআইসি অসম; এবং রাজ্যের সমস্ত জেলা শাসক, পুলিশ সুপার ও জেলা পরিবহন কর্মকর্তারা।



