অসমে দল বদলের রাজনীতি ভারতে নজিরবিহীন

Spread the news

।। প্রদীপ দত্তরায় ।।
(লেখক প্রাক্তন ছাত্রনেতা ও গৌহাটি হাইকোর্টের আইনজীবী)
৩১ মার্চ : এ যেন জাতীয় স্তরে ফুটবল দলের দলবদল বা জার্সি বদলের খেলা। এবার রাজনীতিতেও এই ধরনের জার্সি বদলের খেলা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। রাজনীতির ময়দানে রাতারাতি দল বদল করে সেই দলের মনোনয়ন পাওয়া ইতিহাসে নজিরবিহীন হয়ে রইল অসমে। কয়েকজন নেতা আগেভাগেই দলবদল করে এসেছেন তাদের যে ধরনের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল সেই অনুযায়ী তাদের দলীয় মনোনয়ন মিলেছে। কিন্তু রাতারাতি দলবদল করে পর দিনই মনোনয়ন পাওয়ার ঘটনা অবাক করে দিয়েছে অনেককেই। সাংসদ প্রদ্যুৎ বরদলৈ আগের দিন কংগ্রেসের ইস্তফা দেন পরদিন বিজেপিতে যোগ দিয়ে দিশপুর আসনে দলীয় মনোনয়ন পেয়ে যান। এর পাল্টা হিসেবেই যেন চিরকালের বিজেপি নেতা অমরচাঁদ জৈনকে কাটিগড়া থেকে কংগ্রেস প্রার্থী ঘোষণা করা হয়। ঘোষণার একদিন আগেই তিনি কংগ্রেস দলে যোগ দেন। যদিও এ নিয়ে আলাপ-আলোচনা কদিন যাবতই চলছিল। দল বদলু রাজনীতির জন্য অনেকে নীতীশ কুমারকে কটাক্ষ করতেন কিন্তু নীতীশ কুমারের জে ডি ইউ দল কেবলমাত্র সুবিধার জন্য কয়েকবার জোট বদল করেছেন মাত্র। নীতীশ নিজে দল ছাড়েননি। অন্য দলেও ভিড়েননি। কিন্তু প্রদ্যুৎ বা অমরচাঁদ যা করলেন তা অবাক করার মতই ঘটনা। পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে শাসক দল বিজেপি এবং প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস দলছুটদের দলে এনে দলীয় মনোনয়ন পাইয়ে দেওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছে। গণতন্ত্র বা সমাজসেবা এখানে কিছুই নয় এখানে দলীয় রাজনীতিটাই প্রধান। বিজেপি বা কংগ্রেস উভয় দলেরই লক্ষ্য এমন কিছু দেখানো যে দেখো আমরাও পারি দলছুকদের দলীয় টিকিট পাইয়ে দিতে। এ ধরনের প্রতিযোগিতায় দল দু’টি যেন পিছিয়ে পড়তে চায় না। এমনটাই প্রতিভাত হচ্ছে।


যেসব নেতারা নিজেদের নীতি বিসর্জন দিয়ে যে দলকে ঘৃণার চোখে  দেখে এসেছেন সেই দলের নীতিতে মশগুল হয়ে যান তখন সন্দেহ জাগে আসলে তারা রাজনীতিতে এসেছেন জনসেবা করতে না নিজের আখের গুছাতে। এক সময় যারা যে দলের নীতি আদর্শ সমালোচনা করতেন রাতারাতি দল পাল্টে সে দলে যোগ দিয়ে সে দলের নীতি আদর্শের গুণ কীর্তন করতেও লজ্জা বোধ করেন না। কংগ্রেসের নেতারা বিজেপিকে যে ধরনের গালমন্দ করেন সেই নেতাই বিজেপিতে আসার পর কংগ্রেসকে গালমন্দ করা শুরু করেন। কি বিচিত্র এই রাজনীতি। রাজনৈতিক নেতাদের একমাত্র লক্ষ্য কি জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়া, এ প্রশ্ন অনেকের মনেই জাগতে পারে। কারণ একশ্রেণীর নেতার লক্ষ্য হলো যেনতেন প্রকারে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়া। এখানে দলীয় আদর্শের কোনও স্থান নেই। জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার তাগিদে তারা যে কোনো দল বদলে ফেলতে পারেন। আর জনসেবা করা তাদের যে মূল উদ্দেশ্য নয় তা বুঝতে কারো বাকি থাকে না। জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত না হয়েও জনসেবা করা যায়। কিন্তু দলবদলু জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার লোভে মশগুল রাজনীতিকরা এটা বুঝতে অপারগ। তাই তারা নিজ দলের নীতির বিরুদ্ধাচরণকারী কোন দলে যোগ দিয়ে জনপ্রতিনিধি হওয়ার জন্য নিজের জীবন লড়িয়ে দিতে পিছপা হবেন না। এমন লক্ষণ বেশ কয়েকটি ঘটনায় দেখা যাচ্ছে।

প্রতিবারই নির্বাচন ঘনিয়ে আসার আগে কিছু কিছু মানুষকে দল বদল করতে দেখা যায়, তবে তারা সাধারণ কর্মী বা সমর্থক । কোন ধরনের অসন্তোষ বা স্থানীয় নেতাদের উপর আস্থা হারানোর তারা এ ধরনের দল বদল করে থাকেন। স্থানীয় সমস্যা স্থানীয় নেতার ওপর আস্থা হারানো এবং অন্য নেতার প্রতি আকর্ষণ বোধের জন্যই এরা দলবদল করে থাকেন। দলবদলের পর তাদের নেতা যদি নির্বাচনে বিজয়ী হয় তাহলে তারা উল্লশিত হন এবং পরাজিত হলে তারা হতাশ হন। জয় পরাজয়ের সঙ্গে তাদের ভাগ্যের কোন সম্পর্ক নেই। নেতা বিজয়ী হলেও তাদের সাংবাদিক কিছু মিলবে তেমন নয় আবার পরাজিত হলে কিছু হারিয়ে যাবে সেটাও নয়। লাভ ক্ষতির অংকটা তাদের কখনোই এই দল বদলের সঙ্গে যুক্ত হয় না। এর মধ্যে থাকে কেবলমাত্র ভাবাবেগ। যে নেতাকে আদর্শ মনে করে তারা দলবদল করেন পরবর্তীকালে অনেক সময় সে নেতা সম্পর্কে মোহভঙ্গ ঘটে গেলে আবার তারা অন্য দলে ফিরে যান। কারো কারো কাছে ভোটের মরশুমে এই দলবদল করে প্রচারের আলোয় আসার একটা চেষ্টা পরিলক্ষিত হয়। লাভের মধ্যে লাভ তাদের এটাই মানুষ তাদের নাম-ধাম জানতে পারে। এভাবে যে কর্মী সমর্থকরা দল বদল করেন তাদের মধ্যে অনেকেই কিন্তু সক্রিয় কর্মী থাকেন। তাদের এই দল বদলে ব্যক্তিগত লাভ না হলেও সংশ্লিষ্ট দল কিন্তু লাভবান হয়ে থাকে। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।

কর্মীরা দলবদল করে থাকতেই পারেন। কিন্তু নেতা হয়ে হঠাৎ করে দলবদল করা, এজন্য আশ্চর্যজনক ঘটনা। সাংসদ প্রদ্যোৎ বরদলৈ, কংগ্রেসের একজন শক্তিশালী নেতা ছিলেন। হঠাৎ করে তিনি দলবদল করে বিজেপিতে যোগ দেন। আগের দিন কংগ্রেসের ইস্তফা দিয়ে পরদিন তিনি বিজেপিতে যোগ দেন এবং এরপর দিনই তিনি বিজেপি দলের মনোনয়ন পেয়ে যান। বিজেপি তাকে দিসপুর আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য মনোনয়ন দিয়ে দিয়েছে। অপরদিকে কাটিগড়ার বিজেপি নেতা অমর চাঁদ জৈন গুয়াহাটিতে গিয়ে বিজেপিতে ইস্তফা দিয়ে কংগ্রেস এ যোগ দেন। এবং কংগ্রেস তাকে কাটিগড়ায় দলীয় মনোনয়ন দিয়ে দেয়। অমরচাঁদ আজীবন গেরুয়া রাজনীতি করে এসেছেন। হঠাৎ করে তার এই দলবদল অনেকেই অবাক করে দিয়েছে। আসলে তার সুপ্ত বাসনা তিনি আজীবন কাটিগড়া থেকে বিধায়ক  হিসেবে নির্বাচিত হন। দল তাকে এবার প্রার্থী হিসেবে চয়ন না করায় তিনি রাতারাতি শিবির পাল্টে কংগ্রেসে চলে যান। অথচ আজীবন তিনি কংগ্রেসকে গালাগাল করে এসেছেন। গোমাংস কান্ড নিয়ে তিনি কাটিগরায় একবার হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা বাঁধানোর উপক্রমও করেছিলেন। কাটিগড়া বিধানসভা এলাকার মানুষ এসব ঘটনা ভুলে যায়নি। এবার কংগ্রেস দলের মনোনয়ন পেয়ে তিনি জোর গলায় বলেছেন গৌতম রায় কে আমি পঞ্চাশ হাজার ভোটের ব্যবধানে হারিয়েছি। এবারের বিজেপি প্রার্থী কমলক্ষকেও আমি পরাজিত করব। বিজেপি দলের ভেতর থেকেও তিনি গত নির্বাচনে বিজেপি প্রার্থী গৌতম রায়ের বিরুদ্ধাচরণ কিভাবে করলেন এতেই তার দলের প্রতি নিষ্ঠা এবং নীতি-নিষ্ঠতা প্রমাণ হয়ে যায়। আসলে দলকে হাতিয়ার করে তারা নিজেদের বৈভব সম্পদ বৃদ্ধির কাজ করে এসেছেন এতদিন যাবত। দলের উঁচুস্তরের নেতারা এসব জিনিস লক্ষ্য করেননি। তার মতিগতির উপর যদি দলের নজরদারি থাকতো তাহলে অনেক আগেই তার কর্মকাণ্ড ধরা পড়ে যেত। কাটিগড়া আসনের বিজেপি দলের প্রার্থী কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থ এক সময় কংগ্রেসেই ছিলেন। মাত্র কিছুদিন আগে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিজেপিতে যোগ দেন। তবে বিজেপির প্রতি তার যে মোহ সেটা গত তিন বছর যাবত এই লক্ষ্য করা যাচ্ছে এবং মুখ্যমন্ত্রী নির্দেশেই তিনি এতদিন রাজকর্ম চালিয়ে এসেছেন। এটাও প্রমাণিত। ফলে তার সঙ্গে অমর্যাদের লড়াই একপেশে হবে না প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হবে সেটা এখন বলা মুশকিল।

কংগ্রেস সাংসদ প্রদ্যুৎ বরদলৈ খুবই বিচক্ষণ রাজনীতিবিদ। জে এম ইউ স্কলার প্রদ্যুৎ বর্তমান প্রদেশ কংগ্রেসের নেতৃত্বের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে পারছিলেন না। তার সঙ্গে বর্তমান নেতৃত্বের নীতিগত বিরোধ সৃষ্টি হয়।  প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি গৌরব গগৈর সঙ্গে মতবিরোধ এতটাই প্রকট হয় যে নিজেকে নিঃশেষ করার পথ থেকে সরে এসে প্রদ্যুৎ বিজেপিতে যোগ দিয়ে নিঃশ্বাস নিতে পারছেন এখন। এই দলবদল তার জন্য লাভজনক হয়েছে কী না সেটা পরে জানা যাবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজ্যে কংগ্রেস দলের মধ্যে এক ধরনের অরাজকতা চলছে। এটা প্রদ্যুৎ বা এর আগে প্রাক্তন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি ভূপেন বরা, কমলাক্ষ, শশীকান্ত দাস এঁদের পদত্যাগ প্রমাণ করে দেয়।  এর আগে একই কারণে আরো অনেকে কংগ্রেস ত্যাগ করে বিজেপিতে যোগদান করেন। আরো বেশ কয়েকজন বিধায়ক নেতা বেশ কিছুদিন আগেই কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন। এদের মধ্যে কেউ কেউ বিজেপির মনোনয়নও পেয়ে গেছেন।

ভারতবর্ষে দল বদল একটা খেলায় পরিণত হয়েছে। তাছাড়া একদল ভেঙ্গে অনেক দল সৃষ্টি করার রাজনীতি ও আমরা দেখে এসেছি। সিপিআই দল ভেঙে যেমন সিপিএম, সিপিআইএমএলের ইত্যাদি দল গঠিত হয়েছে। ঠিক তেমনি জনতা দল ভেঙে জনতা দল ইউনাইটেড, জনতা দল সেকুলার, রাষ্ট্রীয় জনতা দল, এমনকি লোকজনক পার্টি জন্ম লাভ করেছে। কংগ্রেস ভেঙে একসময় রেড্ডি কংগ্রেস হয়েছিল পরবর্তীকালে কংগ্রেস ছেড়ে শরৎ পাওয়ার পিএ সাংমা এবং তারিক আনোয়ার মিলে এনসিপি দল গঠন করেছিলেন। এনসিপি দলের অস্তিত্ব এখনো বিদ্যমান তবে মেঘালয়ে এনসিপি দল বদলে এনপিপি হয়ে গেছে। প্রণব মুখার্জি ও একবার কংগ্রেস থেকে বের হয়ে কংগ্রেস ভোট ডেমোক্রেসি নামে দল গঠন করেছিলেন। পরে অবশ্য সেই দল ভঙ্গ করে দিয়ে তিনি কংগ্রেসেই ফিরে যান। দলে থাকা বা দল ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার যে রাজনীতি সেটা দীর্ঘকাল যাবতি চলে আসছে কিন্তু দলবদল করার সঙ্গে সঙ্গেই দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার রাজনীতি নতুন করে যেন শুরু হয়েছে। এমন দৃশ্য আগে কখনো দেখা যায়নি যা বর্তমানে দেখা যাচ্ছে। অন্যান্য রাজ্য এই ধরনের কিছু কিছু বিক্ষিপ্ত ঘটনা থাকতে পারে।

রাজনীতির ময়দান গরম করে রাখতে যদি দল বদলের মতো ঘটনা ব্যাপকভাবে প্রচারের আলোয় আনা হয় তাহলে এটা পরোক্ষে গণতন্ত্রের পক্ষে স্বাস্থ্যহানিকর। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং জনসেবা করার নীতির মধ্যে একটা সামঞ্জস্য রূপ থাকা সম্ভব। যারা রাতারাতি নীতিবদল করে ফেলতে পারে তাদের জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়। একমাত্র জনসেবা করার লক্ষ্য নিয়েই তাদের চিরকাল জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হতে হবে এমন ধারণা নিয়ে যারা রাজনীতি করেন প্রকারান্তরে তারা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির চিন্তাই মগ্ন থাকেন তা বলতে কোন দ্বিধা নেই। নিজস্ব রাজনৈতিক মতাদর্শে অবিচল থেকে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত না হয়েও সমাজের জন্য অনেক কাজ করা যায়। এর অজস্র উদাহরণ ভারতের রাজনীতিতে রয়েছে। শেষ ও প্রসঙ্গ এখানে আনছিনা তবে আমাদের দেশের বরেণ্য নেতারা দলবদল না করে নিজেদের দলীয় নীতিতে অবিচল থেকে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত না হয়েও দেশের জন্য সেবা করে এসেছেন এমন ঘটনা বিরল নয়।
(মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *