।। প্রদীপ দত্ত রায় ।।
(প্রাক্তন ছাত্রনেতা ও গৌহাটি হাইকোর্টের আইনজীবী)
১২ মে : এবছর মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল বরাক উপত্যকায় হতাশাজনক হয়েছে বলা চলে। পরীক্ষার ফলাফলের তালিকায় প্রথম ১০ জনে কেউ স্থান পায়নি বরাক থেকে। অথচ আগে প্রতিবছরই দু তিনজন করে পড়ুয়া প্রথম ১০ জনের মধ্যে স্থান করে নিতে সক্ষম ছিল। হঠাৎ করে এই অবস্থা পরিবর্তন কেন এ নিয়ে অভিভাবক মহলে দুশ্চিন্তা দেখা দিয়েছে। এটা পদ্ধতিগত ত্রুটি না শিক্ষাদানের অভাব অথবা পড়ুয়াদের মনসংযোগ কমে যাওয়া কোনটা সঠিক সে নিয়ে পর্যালোচনা করে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। বর্তমানে শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের ভূমিকা কতটা ইতিবাচক অথবা অভিভাবকরা নিজেদের সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে কতটা নজরদারি রাখছেন এসব বিষয়ে খতিয়ে দেখার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে এখন। কেউ কেউ বলে থাকেন পড়ুয়াদের মধ্যে আজকাল মোবাইল আসক্তি দেখা দেওয়াতে পড়াশুনার পাঠ অনেকটা লাটে উঠেছে এটা কেউ একেবারে ও সত্য বলে উড়িয়ে দেওয়া কি সম্ভব? ফলাফলের যে চিত্র তা দেখে সবগুলি দিকেই খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে বলে আমি মনে করি। স্কুলগুলোতে পঠন পাঠন আগের মতই রয়েছে তথাপি কেন ফলাফল এত হতাশাজনক হয়ে উঠেছে এটা সব মহলের কাছেই দুশ্চিন্তার বিষয়। ফলাফল খারাপ হওয়ার পিছনে শিক্ষকদের পাঠদানে কোন গাফিলতি রয়েছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা দরকার। কারণ হঠাৎ করে ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়ে এ অঞ্চলের পরীক্ষার ফল এতো নিম্নগামী হয়ে যাওয়ার পিছনে কোন না কোন কারণ তো অবশ্যই রয়েছে। কোন একজন নেতা এককালে বলেছিলেন বরাকের ফরিয়াদে মেধার অভাব রয়েছে। এ কথাটা যে আংশিক সত্য পরীক্ষার ফলাফল সেটাই প্রতিয়মান করায়।
মাধ্যমিকে বরাক উপত্যকার তিন জেলার মধ্যে কাছাড়ের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। এই জেলায় অনেকগুলো স্কুল কোন ছাত্রছাত্রী পাস করাতে পারেনি। যে সকল স্কুলে পাসের হার শূন্য সেই স্কুলগুলোকে পড়াশোনার পরিবেশ বজায় রয়েছে কিনা এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। ওই সব স্কুলের শিক্ষকরা ছাত্রদের পরীক্ষার জন্য কিভাবে প্রস্তুত করে তুলছেন সেটা জনসমক্ষে আসা প্রয়োজন। আদৌ কি ছাত্রদের পরীক্ষার উপযোগী করে পড়ানো হচ্ছে না দায়সারা গোছের ক্লাস নিয়েই শিক্ষকরা নিজেদের কর্তব্য পালন করছেন এটা ভেবে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। শিক্ষাবিভাগের প্রধান অধিকারীরা যেসব স্কুলের ফলাফল খুব খারাপ হয়েছে সেই স্কুলের প্রধানকে ডেকে এনে বিষয়টা পর্যালোচনা করে দেখতে পারেন। এক সময় কোন ইন্সপেক্টররা স্কুল পরিদর্শন করতেন পড়াশোনা কেমন হচ্ছে তার পরীক্ষা করতেন ছাত্রদের জিজ্ঞাসাবাদ করে। আজকাল এই চল প্রায় উঠে গেছে ইন্সপেক্টররা নিয়মিত পরিদর্শন করেন না। সমগ্র শিক্ষা অভিযানের মাধ্যমে পড়ুয়াদের বিনামূল্যে মিড ডে মিল স্কুল পোশাক সহ অন্যান্য সামগ্রী দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলেও শিক্ষার মানদন্ড উন্নত করার মতো ব্যবস্থা গ্রহণের অভাব রয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। শিক্ষার মান যদি উন্নত না হয় তাহলে শুধুমাত্র অনুসানকে বিষয়ে উন্নয়ন ঘটালে কাঙ্খিত ফলো লাভ করা সম্ভব নয়। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে এখন টেট বাধ্যতামূলক করা হয়েছে কিন্তু যারা টেট পাস করে আসছে তারা যে সঠিকভাবে শিক্ষাদান করছে। এতে নজরদারি রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগ কোন পদক্ষেপ নিয়েছে কি এ প্রশ্নটা এখন বড় হয়েই দেখা দিচ্ছে। যেহেতু সরকারি ফুলগুলি পাসের হার নিম্নগামী এবং কোন কোন ক্ষেত্রে স্কুলে একজনও পাশ করতে পারেনি সেসব স্কুলগুলিতে শিক্ষাবিভাগের নজরদারি বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। মাধ্যমিকের ফল খারাপ হওয়ার পর স্কুল কর্তৃপক্ষকে শিক্ষা বিভাগ থেকে চিঠি দিয়ে কারণ জানতে চাওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। কেবল চিঠি দিয়ে জানলেই হবে না সেই স্কুল পরিদর্শন করে কি কি ত্রুটি বিচ্যুতি রয়েছে তা খুঁজে বের করতে হবে। না হলে পরিস্থিতির পরিবর্তন সহজসাধ্য হবে না।
বরাক উপত্যকায় উচ্চমাধ্যমিকের ফলাফল মাধ্যমিকের তুলনায় ভালো হয়েছে। এর কারণ হলো একাদশ দ্বাদশ শ্রেণীতে পড়াশোনার ক্ষেত্রটি অনেকটাই মজবুত। এই সময় পড়ুয়া রাও কিছুটা সচেতন হয়ে ওঠে। বয়স বাড়ার সঙ্গে তাদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পথ খুঁজে নেওয়ার জন্য উচ্চমাধ্যমিক থেকে প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। তাছাড়া উচ্চমাধ্যমিকে যারা ভর্তি হয় তারা মাধ্যমিক পাস করেই আসে। কিন্তু মাধ্যমিকে যারা পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়। তারা নিচু ক্লাসগুলোতে নিয়মিতভাবে পাশ করে আসে না তাদের পাশ করিয়ে দেওয়া হয়। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার এই নীতির কিছুটা পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। না হলে বিনা বাধায় মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়ুয়ারা যদি পৌঁছে যায় তাহলে মাধ্যমিকে পরীক্ষা কেন্দ্রে হোঁচট খাওয়া খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। ফলে সপ্তম শ্রেণী থেকে পড়ুয়াদের শিক্ষার প্রতি অনুরাগ বাড়িয়ে তোলার জন্য বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করার কথা ভাবতে হবে। পড়ুয়াদের মধ্যে যদি সঠিক চেতনা গড়ে তোলা সম্ভব হয় তাহলে তারা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করার মানসিকতা খুঁজে পাবে। পরিকাঠামোগত দিক থেকে বরাকের হাইলাকান্দি এবং শ্রীভূমি জেলা কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও সেখানে পরীক্ষার ফলাফল তুলনামূলকভাবে ভালো হয়েছে। এর কারণ বিশ্লেষণ করলেই কাছাড় জেলায়ও পরীক্ষার ফলাফল কিভাবে উন্নত করা যায় এর উপায় মিলতে পারে। হাইলাকান্দি ছোট্ট জেলা হলেও ওই জেলায় শিক্ষার্থীরা যেভাবে তাদের পারদর্শিতা প্রদর্শন করেছে তা খুবই উৎসাহ ব্যঞ্জক। আপাত দৃষ্টিতে দেখলে হাইলাকান্দি এবং শ্রীভূমি জেলার শিক্ষার মান অনেকটাই উন্নত বলতে হবে। ওই জেলা দুটির শিক্ষকরা হয়তো পাঠদানের ক্ষেত্রে অনেক বেশি পরিশ্রম করেছেন যা কাছার জেলার শিক্ষকরা করেননি। না হলে কাছাড়ের ফলাফল এত খারাপ হওয়ার কোন কারণ ছিল না।
ইদানিং দেখা যাচ্ছে পড়ুয়াদের মধ্যে মোবাইল আসক্তি বৃদ্ধি পেয়েছে। পড়াশোনার জন্য সময় ব্যয় না করে পড়ুয়াটা অধিকাংশ সময় মোবাইলে বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান দেখা বা খেলার মধ্যে মগ্ন হয়ে থাকে। এমন অভিযোগ প্রায়শই পাওয়া যায়। কাজেই পড়ুয়াদের হাত থেকে মোবাইল সরাতে না পারলে তাদের করার মনোযোগী করা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। মোবাইলের মাধ্যমে শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান থাকে না। অধিকাংশ পড়ুয়া বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান দেখার কাজে মোবাইল ব্যবহার করে থাকে। কারণ, কচি বয়সের পড়ুয়াটা ভালো-মন্দ বুঝে চলার ক্ষেত্রে ততটা পটু নয়। তাছাড়া সঙ্গি সাথীদের মন্ত্রণা অনেক ক্ষেত্রে কাজ করে। সহপাঠীরাই অনেক সময় বলে দেয় এটা নয় ওই অনুষ্ঠান দেখবি। এই মোবাইল আসক্তি রোধ করতে হলে অভিভাবকদের নজরদারি কঠোর হওয়া বাঞ্ছনীয়। দিনের নির্দিষ্ট সময় ছাড়া পড়ুয়ারা যাতে মোবাইল হাতে তুলে না নেই সেদিকে নজর রাখলে তাদের পড়াশোনার সময় নির্দিষ্ট হয়ে থাকবে। আর নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে গেলে পরীক্ষায় পাশ করার মতো শিক্ষা তাদের মধ্যে গড়ে উঠবে। হ্যাঁ মোবাইল যে সব ক্ষেত্রে খারাপ তা নয় কিন্তু কে কি কারনে কিভাবে এর ব্যবহার করছে এর উপরেই নির্ভর করে সবকিছু। এক্ষেত্রে স্কুলের শিক্ষকদের করণীয় কিছুই নাই কারণ কুল পিরিয়ডে মোবাইলের ব্যবহার প্রায় থাকে না। বাড়িতে এসে পড়ুয়ারা মোবাইল নিয়ে অনুষ্ঠান দেখা বা খেলাধুলায় মত্ত হয়ে পড়ে। কাজেই একমাত্র অভিভাবক রাই উপযুক্ত নজরদারি রেখে তাদের সন্তানদের সঠিক পথে এগিয়ে যাওয়ার দিশা দেখাতে পারেন। লোক ডাউনের সময় মোবাইলের মাধ্যমে পড়াশোনার যে পদ্ধতি প্রচলিত হয়েছিল এর থেকেই পড়ুয়াদের মধ্যে মোবাইল আসক্তি দেখা দিয়েছে বলে মনে করার যথেষ্ট সঙ্গত কারণ রয়েছে। পরবর্তীকালে পড়ুয়ারা এই মোবাইলকে শিক্ষার কাজে কম ব্যবহার করে বিনোদনমূলক কাজে বেশি ব্যবহার করা শুরু করেছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে হতাশা জনক ফলাফলের পর এখন শিক্ষা বিভাগের উচিত অভিভাবক, শিক্ষক এবং পড়ুয়াদের নিয়ে বৈঠকের আয়োজন করা। বৈঠকে পর্যালোচনার মাধ্যমেই মিলতে পারে এই সমস্যা থেকে উত্তরণের দিশা। এই বৈঠকে প্রয়োজনে শিক্ষাবিদ এবং সমাজ সচেতকদের পরামর্শ গ্রহণ করা যেতে পারে। এতে এই সমস্যা সমূলে উৎপাটন করা সম্ভব হবে। তাছাড়া আমার মনে হয় বর্তমানে সমগ্র শিক্ষা অভিযানের নির্দেশিকায় যে পাশ ফেল প্রথা তুলে দেওয়া হয়েছে তা পুনরায় প্রবর্তন করার প্রয়োজন রয়েছে। পঞ্চম শ্রেণী থেকে পুনরায় পাশ ফেল প্রথা প্রবর্তন করলে পড়ুয়াদের মধ্যে পাশ করার চেষ্টা করে উঠবে এটা পরবর্তীকালে মাধ্যমিক পাস করার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়ে উঠতে পারে। পঞ্চম শ্রেণী থেকেই পড়ুয়াদের পেছনে শিক্ষকদের বিশেষ নজরদারি রাখা প্রয়োজন। কোন পড়ুয়ার পড়াশোনায় কোন মতিগতি নেই তাদেরকে চিহ্নিত করে তাদেরকে অন্য পদ্ধতিতে শিক্ষার প্রতি মনোযোগী করে তোলার জন্য উপায় উদ্ভাবন পরা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে রাজ্যের শিক্ষা বিভাগকে কৌশল রচনা করতে হবে। কেবলমাত্র পরীক্ষার ফলাফল খারাপ হলে সেই স্কুলের শিক্ষককে জবাবদিহি করে এই সমস্যার সমাধান মিলবে না। রাজ্যের শিক্ষা বিভাগকে এর দায় অনেকটাই বহন করতে হবে। কেবলমাত্র ফুল ছুটের হার কমানোর জন্য পাশ ফেল প্রথা তুলে দিয়ে পড়ুয়াদের স্কুলে আটকে রাখার যে কৌশল সেটা হলো প্রশ্ন নয়, তাই ইতিমধ্যেই প্রমাণ হয়ে গেছে। মিড ডে মিল, স্কুলের পোশাক , বইপত্র ইত্যাদি বিনামূল্যে যোগান ধরা হলেও এটা শিক্ষার মানসিকতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে খুব একটা সহায়ক হয়ে উঠছে না। স্কুলে এসবের পাশাপাশি পড়ুয়াদের খেলাধুলার প্রচলন করে দিতে হবে। খেলাধুলার মধ্যে যেসব পড়ুয়া মনোননিবেশ করবে তারা পরবর্তীকালে পড়াশোনায় ও মনোনিবেশ করতে পারবে। কারণ খেলাধুলার ক্ষেত্রে যে শৃঙ্খলা পরায়ণতা প্রয়োজন। সেটা তাদের মর্যাগত হয়ে গেলে পড়াশোনার ক্ষেত্রেও এর প্রয়োগ করবে। বিষয়টা শুনতে আজগুবি লাগলেও এটাই সরল সত্য। কাজেই রাজ্যের সংশ্লিষ্ট বিভাগকে এ বিষয়টি ভালোভাবে পর্যালোচনা করে নতুন কৌশল নির্ধারণ করতে হবে যাতে শিক্ষার মান যেমন উন্নত থাকে তেমনি পড়ুয়ারা যাতে পরীক্ষায় পাশ করতে পারে। সবশেষে বলবো শিক্ষার সঠিক পরিকাঠামো গড়ে তুলতে হলে সমন্বিত পদক্ষেপ করা খুবই জরুরী। এক্ষেত্রে শিক্ষক অভিভাবক শিক্ষাবিভাগ প্রত্যেকেরই দায়িত্ব সমান। অভিভাবকরা যদি নিশ চেষ্টা থাকেন তাহলে তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার জন্য শিক্ষক এবং শিক্ষাবিভাগ দায়িত্ব পালন করবে এটা ভেবে নেওয়া ঠিক নয়। অভিভাবকদের যথেষ্ট দায়িত্বশীল হওয়া এখন সময়ের প্রয়োজন। পাশাপাশি পড়ুয়াদের নানাভাবে লেখাপড়ার প্রতি মনোযোগী করে তুলতে অভিভাবক রাই পারেন তাদের মনে শিক্ষার অনুরাগের বীজ বপন করে দিতে। এটা করা হলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতির পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
(মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)



