দলীয় আনুগত্য নয়, বরাকের আর্থ- সামাজিক উন্নয়নই হোক ভোটের মূল ইস্যু : বিডিএফ

Spread the news

বরাক তরঙ্গ, ২২ মার্চ : অসম বিধানসভা নির্বাচনের দিনক্ষণ ইতিমধ্যে ঘোষিত হয়েছে। বিভিন্ন দলের প্রার্থী তালিকাও চূড়ান্তের পথে। তবে শুধু দলীয় আনুগত্য নয়,বরাকের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি জ্বলন্ত সমস্যাগুলো সমাধানে যেসব প্রার্থী বিধানসভায় সরব হবেন এবং কার্যকরী পদক্ষেপ নেবেন, একমাত্র তাদেরই ভোট দেবার জন্য বরাক বাসীকে আহ্বান জানাল বরাক ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট।

বিডিএফ কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সভাশেষে সাংবাদিকদের সামনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ফ্রন্টের মুখ্য আহ্বায়ক প্রদীপ দত্তরায় বলেন, প্রার্থী নির্বাচনে অসন্তোষ, দল পরিবর্তন, পুরাতন কর্মী বনাম বহিরাগত সংঘাত ইত্যাদি নিয়ে রাজনৈতিক তৎপরতা তথা বিতর্ক আপাতত তুঙ্গে রয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় যে অবহেলিত, অনুন্নত এই উপত্যকার স্বার্থে কোন দল বা প্রার্থী কোন ইস্যুকে প্রাধান্য দেবেন,কি কি কাজ করবেন এসব নিয়ে প্রার্থী এবং ভোটার উভয়পক্ষই নীরব ও নির্বিকার। প্রদীপ দত্তরায় বলেন যে এই ব্যাপারে নিজেদের স্বার্থে ভোটারদের চাপ সৃষ্টি করতে হবে, প্রার্থীদের থেকে প্রতিশ্রুতি আদায় করতে হবে। অন্যথা যাঁরা নির্বাচিত হবেন তাঁরা আগামী পাঁচ বছরে,  শুধু ব্যাক্তিস্বার্থ এবং নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত থাকবেন,বরাক উপত্যকা যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই রয়ে যাবে। প্রদীপ দত্তরায় বলেন যে সব সমস্যা এই উপত্যকার সমস্ত নাগরিকদের জীবন জীবিকা, নাগরিক স্বার্থ এবং উন্নয়নের প্রতিবন্ধক সেইসব সমস্যা আগামী নির্বাচনের আগে ধারাবাহিক ভাবে তুলে ধরবে বিডিএফ। তিনি বলেন যাঁরাই আগামী নির্বাচনে ভোট চাইতে আসবেন তাঁদের সবার কাছেই এইসব বিষয়ে অবস্থান জানার এবং সেই ভিত্তিতেই বরাক বাসীকে ভোট দেবার আহবান জানাচ্ছেন তাঁরা।

প্রদীপ দত্তরায় এও বলেন, বরাক উপত্যকার অন্যতম জ্বলন্ত সমস্যা হচ্ছে বেকারত্ব। এই উপত্যকার রেজিস্টার্ড বেকার চারলক্ষের উপর। প্রকৃত সংখ্যা এর অনেক বেশি হবে। তিনি বলেন, স্বল্প শিক্ষিত, উচ্চ শিক্ষিত, অদক্ষ, দক্ষ – সব চাকুরী প্রার্থীদের জন্যই এখানে নিয়োগের সম্ভাবনা সীমিত বা নেই বললেই চলে। এতে গ্রামাঞ্চলের স্বল্পশিক্ষিত বা অদক্ষ কর্মপ্রার্থীরা যেমন বহির্রাজ্যে স্বল্প বেতনের চাকরির খোঁজে পাড়ি জমাচ্ছেন, তেমনি উচ্চ শিক্ষিতরাও জীবিকার প্রয়োজনে বহিরাজ্যে স্থানান্তরিত হতে বাধ্য হচ্ছেন। তিনি বলেন, এভাবে শুধু মেধা ও শ্রম পাচার হচ্ছে পরিবর্তে কিছুই ফিরে আসছে না। ফলে এই উপত্যকা ক্রমাগত রিক্ত হচ্ছে। তিনি বলেন যদি এই উপত্যকাকে বাঁচাতে হয়,তাহলে এই সমস্যার সমাধান করতে হবে,এখানে নিয়োগের ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে।

তাই যারা এই উপত্যকা থেকে নির্বাচিত হবেন এটা তাঁদের প্রাথমিক দায়িত্ব হতে হবে এবং এই ব্যাপারে তাদের কি পরিকল্পনা রয়েছে, সেই ভিত্তিতেই ভোট দিতে হবে বলে তারা মনে করেন।

বিডিএফ মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক জয়দীপ ভট্টাচার্য বলেন, নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারি এবং বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রকেই প্রাধান্য দিতে হবে। তিনি বলেন শাসক দল গত পাঁচ বছরে একলক্ষ কুড়ি হাজার চাকরি দিয়েছেন বলে ফলাও করে প্রচার করলেও বরাক উপত্যকার কজনের চাকরি জুটেছে এটা সবাই জানেন। তিনি বলেন, যা দরকার সেটা হল এই উপত্যকার স্থানীয়দের জন্য এখানকার তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর পদ সংরক্ষণ। একটি অনুন্নত, অবহেলিত এবং প্রান্তিক  জনপদের উন্নয়নের স্বার্থে এই পদক্ষেপ জরুরী। কিন্তু গত নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতি তথা আসাম বিধানসভায় এই সংক্রান্ত প্রস্তাব গৃহীত হলেও এই নিয়ে কোন পদক্ষেপ এযাবৎ নেওয়া হয়নি। তাই যারা এই প্রস্তাব সমর্থন করেন এবং এই ব্যাপারে পদক্ষেপ নেবার প্রতিশ্রুতি দেবেন আগামী নির্বাচনে সেই দল বা প্রার্থীদের সমর্থন জানানো কর্তব্য।

বিডিএফ আহ্বায়ক হৃষীকেশ দে বলেন যে বেসরকারি নিয়োগের জন্য সুস্পষ্ট পরিকল্পনা জরুরী। বরাক উপত্যকার প্রাকৃতিক সম্পদ ও মানব সম্পদকে ব্যবহার করার করে এখানে শিল্পোদ্যোগ গড়ে তুললে নিয়োগের সম্ভাবনা যেমন বাড়বে তেমনি অর্থনৈতিক উন্নতিও সম্ভব। তিনি বলেন প্রাকৃতিক সম্পদের মধ্যে এই অঞ্চলে চা, বাঁশ, প্রাকৃতিক গ্যাস, কাঠ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এসবের যথাযথ উপযোগ করে শিল্পোদ্যোগ গড়ে তোলা সম্ভব। তিনি বলেন, এখানকার চা শিল্প ও কৃষি সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও পরিকাঠামোর অভাবে ধুঁকছে। দরকার বিকল্প ও লাভজনক কৃষিপণ্য উৎপাদনে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও উদ্যোগ। এছাড়া কার্যকরী সেচ ব্যবস্থা ও বর্ষার মরশুমের জল সম্পদকে ব্যবহার করার পরিকাঠামো। দরকার চা শিল্পের সমস্যা অনুধাবন করে সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ।

হৃষীকেশ বলেন শিল্পোদ্যোগের মধ্যে ইথানল প্ল্যান্ট ও একাধিক ছোট কাগজকল তৈরি করার সুযোগ রয়েছে। গ্যাসভিত্তিক শক্তি উৎপাদন সহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। স্থানীয় বাঁশ এবং বেত ব্যাবহার করে কুটির শিল্পের উদ্যোগ তৈরি হতে পারে।

এছাড়া ভৌগলিক অবস্থানের সুবিধা নিয়ে এই উপত্যকা পার্শ্ববর্তী রাজ্য সমূহ তথা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তার সাম্প্রতিক বক্তব্যে এই বিষয় উল্লেখ করেছেন। সেজন্যই এখানে মাল্টি মডেল লজিস্টিক পার্কের প্রস্তাব ছিল, যা নিয়ে আপাতত কেন্দ্র বা রাজ্য সরকার নীরব। এছাড়া এখানকার মানবসম্পদ ব্যবহার করে আইটি হাব তথা বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ স্থাপন সম্ভব।

হৃষীকেশ বলেন কৃষি, শিল্পদ্যোগ তথা বানিজ্যের উন্নয়ন হলে এখানে নিয়োগের সম্ভাবনা অবশ্যই বাড়বে মেধা পাচার ও বন্ধ হবে। তাই সরকারি নিয়োগ ও কৃষি এবং শিল্প উন্নয়নই হোক এই উপত্যকার ভোটের মূল ইস্যু।

বিডিএফ সদস্যরা বলেন, আগামীতে একই ভাবে তাঁরা বরাকের অন্যান্য সমস্যার কথাও তুলে ধরবেন। এদিনের সভায় অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন দেবায়ন দেব, হারাধন দত্ত, নবারুণ দে চৌধুরী, সজল দেবরায় প্রমুখ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *