শমীন্দ্র পাল, কাটিগড়া।
বরাক তরঙ্গ, ৮ আগস্ট : এক বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। বন্যার জল নেমেছে, কিন্তু সেই দুর্যোগের ক্ষত আজও শুকায়নি। ২০২৫ সালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী কাছাড় জেলার কাটিগড়া রাজস্ব সার্কলের নিশ্চিন্তপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত রংপুর এলাকার ৭১টি পরিবার আজও সরকারি ক্ষতিপূরণ থেকে বঞ্চিত বলে অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতেই এলাকাজুড়ে তীব্র ক্ষোভ, হতাশা ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বন্যার সময় প্রশাসনের নির্দেশ মেনে তারা প্রত্যেকেই নির্ধারিত লাল কার্ডে প্রয়োজনীয় সব তথ্য জমা দিয়েছিলেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল যে, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর হাতে সরকারি আর্থিক অনুদান পৌঁছে দেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুতি আজও অধরাই থেকে গেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের বন্যার সময় ২৭০ নম্বর রংপুর এল.পি. স্কুলের ২ নম্বর ত্রাণ শিবিরে মোট ৭১টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছিল। সরকারি উদ্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘরের জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে প্রত্যেক পরিবারের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা হয়। তখন সকলেরই বিশ্বাস ছিল – দুর্যোগ কেটে গেলে সরকার তাদের পাশে দাঁড়াবে।
কিন্তু সম্প্রতি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সরকারি আর্থিক সহায়তা বিতরণ শুরু হলেও বিস্ময়করভাবে ওই ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নেওয়া ৭১টি পরিবারের একজনেরও নাম সরকারি তালিকায় নেই বলে অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী। এই ঘটনায় ক্ষোভ ও হতাশা আরও তীব্র হয়েছে।
আজ এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে নিপেন্দ্র দাস, আব্দুল আহাদ বড়ভূইয়া, বিজেপির ৩ নম্বর বুথ সভাপতি গোবিন্দ কুমার চক্রবর্তী, রসময় দাস, সুখেন্দ্র চন্দ্র দাস, আহাদ উদ্দিন, অঞ্জলিরানি দাস, কমলা বিবি-সহ উভয় সম্প্রদায়ের বহু ভুক্তভোগী নারী-পুরুষ জানান, বিষয়টি নিয়ে রংপুর এলপি স্কুলের শিক্ষক মস্তাফ উদ্দিন বড়ভূইয়া তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, তিনি সমস্ত আবেদনপত্র যথাযথভাবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জমা দিয়েছেন বলেও ভুক্তভোগীদের অবগত করেছেন।
তবে এলাকাবাসীর প্রশ্ন, যদি সত্যিই সব আবেদনপত্র জমা হয়ে থাকে, তাহলে ৭১টি পরিবারের একজনেরও নাম সরকারি তালিকায় না আসার কারণ কী? এই প্রশ্নের সন্তোষজনক কোনো উত্তর মেলেনি।
গ্রামবাসীর অভিযোগ, যদি আবেদনপত্র যথাযথভাবে দপ্তরে পাঠানো হয়ে থাকে, তাহলে পুরো তালিকাই কীভাবে বাদ পড়ল? আর যদি আবেদনপত্র পাঠানোই না হয়ে থাকে, তাহলে এতদিন ধরে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে আশ্বাস দেওয়া হলো কেন? এই রহস্যের নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা জনসমক্ষে তুলে ধরার দাবি জানিয়েছেন তারা।
ভুক্তভোগীদের বক্তব্য, বন্যার তাণ্ডবে অনেকের বসতঘর মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বহু পরিবার আজও অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে উঠতে পারেনি। সরকারি ক্ষতিপূরণের আশায় দীর্ঘদিন অপেক্ষা করার পর তালিকায় নিজেদের নাম না দেখে তারা গভীরভাবে মর্মাহত ও ক্ষুব্ধ।
এলাকাবাসীর দাবি, বন্যার জল সর্বপ্রথমে তাদের এলাকা অতিক্রম করে ঘর দোয়ার ডুবিয়ে দেয়, তাই প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে অবিলম্বে এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক। পাশাপাশি রাজ্য সরকার, স্থানীয় বিধায়ক কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থ, কাছাড় জেলা প্রশাসন এবং কাটিগড়ার সার্কল অফিসারের কাছে দ্রুত হস্তক্ষেপ করে প্রকৃত বন্যাদুর্গত পরিবারগুলোর হাতে সরকারি অনুদান পৌঁছে দেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
রংপুরের এই ৭১টি পরিবারের একটাই প্রশ্ন – প্রাকৃতিক দুর্যোগে সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার পরও যদি সরকারি সহায়তার তালিকা থেকে তাদের নাম বাদ পড়ে, তবে তারা ন্যায়বিচার পাবে কোথায়?



