সেকালের আবেগ, একালের আয়োজন—সময়ের আরশিতে শারদোৎসব

Spread the news

-: আমার চোখে দুর্গাপূজা :-

।। বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য।।
(শিক্ষক, সমাজকর্মী, কলামিস্ট)
১৭ অক্টোবর : শরতের নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, কাশফুলের দোলা, শিউলির স্নিগ্ধ গন্ধ আর দূর থেকে ভেসে আসা ঢাকের আওয়াজ—সব মিলিয়ে বাঙালির হৃদয়ে জেগে ওঠে এক চিরন্তন আবেগ, “মা আসছেন!” এই আগমনী শুধু দেবীর মর্ত্যে আগমন নয়, এ যেনো স্মৃতি, সংস্কৃতি, ভালোবাসা আর নতুন করে বাঁচার এক সম্মিলিত উৎসব। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টেছে দুর্গাপূজার রূপ, পাল্টেছে উৎসব উদযাপনে আনন্দের ধরন। আগের পূজা আর বর্তমাপ পূজার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে এক দীর্ঘ সময়ের ব্যবধান। একদিকে স্মৃতির পাতায় জড়িয়ে থাকা সরলতা, অন্যদিকে আধুনিকতার রাংতায় মোড়ানো বিশাল আয়োজন। প্রশ্ন জাগে, এই পরিবর্তনের পথে আমরা কতটা এগিয়েছি, আর কতটা পিছনে ফেলে এসেছি আমাদের চিরচেনা আবেগকে?

আগের দুর্গাপূজা ছিল অপেক্ষার, অনুভবের এবং আত্মিক আনন্দের উৎসবের মহামিলন। ছোটোবেলায় দেখেছি মহালয়ার ভোরে রেডিওতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে চণ্ডীপাঠ শোনার জন্য পরিবারের সবাই একত্র হতেন। একটি রেডিওকে ঘিরে বসে থাকা মানুষগুলোর চোখেমুখে ফুটে উঠত এক অদ্ভুত আবেগ। প্রযুক্তি ছিল সীমিত, কিন্তু অনুভূতির গভীরতা ছিল অসীম। যা আমার মতো অনেকে সেই আনন্দের ব্যাখ্যা দিতে পারবেন না। প্রতিটি পাড়ার পূজামণ্ডপ গড়ে উঠত মানুষের সম্মিলিত শ্রমে। বাঁশ, কাপড়, শোলা আর কাগজের সামান্য সাজসজ্জাতেই ফুটে উঠত সৃজনশীলতা। কেউ চাঁদা তুলতেন, কেউ মণ্ডপ সাজাতেন, কেউ রাত জেগে পাহারা দিতেন। পূজা ছিল সবার, আয়োজনও ছিল সবার। মণ্ডপ শুধু দেবীর আরাধনার স্থান ছিল না, ছিল পাড়ার মানুষের মিলনকেন্দ্র।

নতুন জামা পাওয়ার আনন্দও ছিল অন্যরকম। সারা বছরের অপেক্ষা শেষে একটি নতুন পোশাক হাতে পাওয়ার যে তৃপ্তি, তা আজকের প্রাচুর্যের মধ্যে অনেক সময় অনুভব করা কঠিন। বন্ধুদের সঙ্গে দল বেঁধে ঠাকুর দেখা, পরিচিত মানুষের সঙ্গে কুশল বিনিময়, অঞ্জলি, বড়দের সঙ্গে দেখা হলে পা ছুঁয়ে প্রণাম করা আর প্রসাদের আনন্দ—এসব ছোট ছোট মুহূর্তেই পূর্ণতা পেতো গোটা উৎসব উদযাপনে।

সেকালে পূজা যে সব দিক থেকে নিখুঁত ছিল, তা নয়। অভাব ছিল, সীমাবদ্ধতা ছিল, সামাজিক বৈষম্যও ছিল। তবু সেই সময়ের পূজা অনেকের স্মৃতিতে অমলিন, কারণ মানুষ অল্প আয়োজনের মধ্যেও আনন্দকে খোঁজে বেড়াতো গভীরভাবে অনুভব করতে জানত।

আজকের দুর্গাপূজা এক বিশাল শিল্পোৎসব। থিমের বৈচিত্র্য, আলোর কারুকার্য, অভিনব প্রতিমা, আধুনিক প্রযুক্তি আর শিল্পীদের সৃজনশীলতা পূজাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। মণ্ডপসজ্জায় ফুটে উঠছে ইতিহাস, ঐতিহ্য, প্রকৃতি এবং সমসাময়িক সমাজের নানা বার্তা। এই আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন অসংখ্য শিল্পী, কারিগর ও কর্মজীবী মানুষ। তাঁদের জীবিকা এবং সৃজনশীলতার বিকাশেও দুর্গাপূজার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। যোগাযোগের মাধ্যমও বদলেছে। স্মার্টফোনে ছবি তোলা, সামাজিক মাধ্যমে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া, অনলাইনে পূজার খবর জানা—সবই এখন উৎসবেরই অংশ। আগে যে আনন্দ সীমাবদ্ধ থাকত পাড়ার গণ্ডিতে, তা আজ ছড়িয়ে পড়ছে পৃথিবীর নানা প্রান্তে। কিন্তু এই চাকচিক্যের মধ্যেই কখনও কখনও প্রশ্ন জাগে—উৎসব কি ক্রমশ অনুভবের চেয়ে প্রদর্শনের বিষয় হয়ে উঠছে? মণ্ডপের উচ্চতা, বাজেট, আলোকসজ্জা কিংবা পুরস্কারের প্রতিযোগিতায় আমরা কি কখনও ভুলে যাচ্ছি পূজার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য?

অবশ্য আধুনিকতা মানেই আবেগের অভাব নয়, যেমন সেকালের সরলতা মানেই সর্বত্র আন্তরিকতা ছিল—এমনও নয়। আজও বহু মানুষ নিষ্ঠার সঙ্গে পূজা করেন, বহু তরুণ-তরুণী স্বেচ্ছাশ্রম দেন, বহু পুজো কমিটি মানুষের পাশে দাঁড়ায়। আসল পার্থক্য সময়ের চেয়ে বেশি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে। সেকালের পূজার সম্পদ ছিল অল্পের মধ্যে অনেক আনন্দ খুঁজে নেওয়া; কিন্তু এখনের পূজার শক্তি হলো সেই আনন্দকে বৃহত্তর পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়ার সামর্থ্য।

দুর্গাপূজার জাঁকজমকের মধ্যেও এমন কিছু দৃশ্য রয়েছে, যা আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। নতুন পোশাকের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কোনও শিশুর চোখে যখন স্বপ্ন দেখি, তখন মনে পড়ে—সব শিশুর স্বপ্ন পূরণ করার সামর্থ্য কি তাদের পরিবারের আছে? কোথাও লক্ষাধিক টাকার আলোকসজ্জা, কোথাও একটি পরিবারের নিত্যদিনের খাবার জোগাড়ের সংগ্রাম। কোথাও আনন্দের অফুরন্ত আয়োজন, কোথাও সামান্য নতুন পোশাক কেনার অক্ষমতা। এই বৈপরীত্য আমাদের ভাবতে শেখায়—আমরা কি সত্যিই অসুরদলনী দেবীর আরাধনা করছি, যদি আমাদের চারপাশে মানুষের অসহায়ত্বের অসুর মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকে? সমাধান অবশ্য জাঁকজমক বর্জন করা নয়; বরং উৎসবের আনন্দকে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। যদি প্রতিটি বিগ বাজেটের পুজো কমিটি সম্মিলিত উদ্যোগে পূজার আগে শহর-গ্রামের অসহায় পরিবারের পাশে দাঁড়ায়, কোনও শিশুর মুখে হাসি ফোটায় কিংবা অসুস্থ মানুষের চিকিৎসায় সাহায্য করে, তবে সেই পূজার মহিমা আরও বেড়ে যায়।

দেবী দুর্গা শক্তির প্রতীক, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক। তাঁর আরাধনা শুধু মন্ত্রোচ্চারণ কিংবা প্রতিমার সামনে প্রণাম করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। নারীর সম্মান রক্ষা, অসহায়ের পাশে দাঁড়ানো এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার মধ্যেও তাঁর আদর্শকে খুঁজে নিতে হবে।

আমার বরাক উপত্যকার দুর্গাপূজাও এই পরিবর্তনের সাক্ষী। শিলচরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে পূজা শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি, সামাজিক বন্ধন এবং সম্মিলিত পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আগমনী গান, আবৃত্তি, নৃত্য, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আর পাড়ার মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগের মধ্যে আজও বেঁচে আছে আমাদের শিকড়ের টান। আমাদের প্রয়োজন সেকালের আন্তরিকতাকে একালের সৃজনশীলতার সঙ্গে যুক্ত করা। আধুনিকতার পথে এগিয়ে গিয়েও নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে হবে পূজার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মানবিক মূল্যবোধ। তাদের বোঝাতে হবে, দুর্গাপূজা শুধু নতুন পোশাক, পছন্দের খাবার আর রাতভর ঠাকুর দেখার নাম নয়; এটি একটি সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা, একটি সমাজের সম্মিলিত স্মৃতি।

আমি বলছিনা সেকালের আয়োজনকে অন্ধভাবে আঁকড়ে ধরে পূজা আয়োজন করতে, তবে এখনকার ট্রেন্ডের মোহে পড়ে অতীতকে উপেক্ষা করাটাও ঠিক নয়। বরং অতীতের ভালোকে ধারণ করে, বর্তমানের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়েই গড়ে উঠুক আগামী দিনের দুর্গোৎসব।

বিসর্জনের দিন ঢাকের বিষাদমাখা সুরে যখন উচ্চারিত হয়— ‘আসছে বছর আবার হবে’, তখন মনে হয়, উৎসব বুঝি শেষ হয়ে গেছে। মণ্ডপ ফাঁকা হয়, আলোর মালা খুলে নেওয়া হয়, মৃন্ময়ী রূপ বিসর্জিত হন নদী বা পুকুরের জলে। কিন্তু সত্যিই কি দুর্গাপূজা শেষ হয়ে যায়?
প্রতিমার বিসর্জন হয়, কিন্তু তাঁর আদর্শের কি বিসর্জন হওয়া উচিত? মা যদি শক্তির প্রতীক হন, তবে তাঁর বিদায়ের পর আমাদের আরও সাহসী হওয়া উচিত। মা যদি মমতার প্রতীক হন, তবে আমাদের আরও মানবিক হওয়া উচিত। মা যদি অশুভের বিনাশের প্রতীক হন, তবে নিজেদের অন্তরের লোভ, অহংকার, হিংসা ও অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করা উচিত।

আমার চোখে দুর্গাপূজা তাই সেকাল কিংবা একালের মধ্যে কোনও একটিকে বেছে নেওয়ার নাম নয়। এটি অতীতের আবেগ আর বর্তমানের সম্ভাবনাকে এক সুতোয় গেঁথে দেওয়ার নাম। আমি চাই, আধুনিক আলোর ঝলকানি থাকুক, শিল্পের বিস্ময় থাকুক, প্রযুক্তির অভিনবত্ব থাকুক—কিন্তু তার মধ্যে যেন হারিয়ে না যায় সেকালের প্রদীপের স্নিগ্ধতা, পাড়ার ছোট্ট উঠোনের আন্তরিকতা আর মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা।

কারণ, মণ্ডপের আলো একদিন নিভে যাবে, ঢাকের বাদ্যি থেমে যাবে, প্রতিমা বিসর্জিত হবেন জলে। কিন্তু মানুষের হৃদয়ে যে ভালোবাসার প্রদীপ জ্বলে ওঠে, তার যেন কখনও বিসর্জন না হয়। সেই প্রদীপের আলোতেই আমি খুঁজে পাই আমার চোখের দুর্গাপূজা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *