লোকনৃত্যের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক প্রয়োগ নিয়ে দশ দিনের কর্মশালা এসএস কলেজে 

Spread the news

বরাক তরঙ্গ, ৩১ আগস্ট : লোকসংস্কৃতির ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার লক্ষ্যে শ্রীভূমি জেলার সমাজ-সংস্কৃতি ও সাহিত্য বিষয়ক সংস্থা ‘উত্তরসূরি’ এবং শ্রীকিষণ সারদা মহাবিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক কোষের যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হলো ‘লোকনৃত্যের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক প্রয়োগ’ শীর্ষক দশ দিবসীয় কর্মশালা ও ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রাম। ২১ থেকে ৩০ আগস্ট পর্যন্ত শ্রীকিষণ সারদা মহাবিদ্যালয়ে আয়োজিত এই কর্মশালায় কলেজের বাংলা ও ইংরেজি বিভাগের পঞ্চম সেমিস্টারের ছাত্রছাত্রীসহ অন্যান্য ইচ্ছুক শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। মোট প্রায় ৯০ জন শিক্ষার্থী এই প্রশিক্ষণে যোগ দেন।

কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন উত্তরসূরির কর্ণধার ড. বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য, কার্যকরী সভাপতি সুব্রত চৌধুরী, শ্রীকিষণ সারদা কলেজের অধ্যক্ষ ড. রতন কুমার, আইকিউএসি সমন্বয়ক গোলাবচন্দ্র নন্দী, ড. ইন্দিরা ভট্টাচার্য, ড. প্রিয়ব্রত নাথ, ইংরেজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. রম্যব্রত চক্রবর্তী, সমন্বয়ক ড. মমতাজ বেগম বড়ভূইয়া, সহ-সমন্বয়ক লিলি দংগল, ড. সৌমিত্র নাথ, লং কুমার টিসো-সহ বিশিষ্টজনেরা।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, নৃত্য মানুষের জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। মানুষের স্বাভাবিক অঙ্গসঞ্চালনেরই পরিশীলিত রূপ নৃত্য। আর লোকনৃত্য কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল বা জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন, সংস্কৃতি, উৎসব, ধর্মীয় আচার ও সামাজিক রীতিনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। মানুষের আনন্দ-বেদনা, শ্রম, ঋতুচক্র ও লোকজ জীবনের নানা অভিজ্ঞতা লোকনৃত্যের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। ফলে লোকনৃত্য একটি সমাজের ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয় বহন করে।

কর্মশালায় তাত্ত্বিক আলোচনার পাশাপাশি ছিল ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ। নৃত্য শিক্ষিকা ও উপদেষ্টা সৌমদত্তা চৌধুরী গানের তাল, লয় ও ছন্দের সঙ্গে বিভিন্ন লোকনৃত্যের ব্যবহারিক প্রয়োগ শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে শেখান।

কর্মশালার চতুর্থ দিনে আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই বিশিষ্ট অধ্যাপক রমাকান্ত দাস ও বরুণজ্যোতি চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। এদিন শ্রীকিষণ সারদা কলেজের আইকেএস সেলের প্রকাশিত ‘ইন্ডিজেনাস কালচার অব নর্থ ইস্ট ইন্ডিয়া’-র প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড এবং বাংলা বিভাগের গবেষণামূলক গ্রন্থ ‘অন্বেষা’-র ত্রয়োদশ সংখ্যা উন্মোচন করা হয়।

এরপর লোকনৃত্যের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন দুই অধ্যাপক। অধ্যাপক রমাকান্ত দাস ‘বরাক উপত্যকার লোকনৃত্য : ঐতিহ্য ও পরম্পরা’ বিষয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে লোকনৃত্যের উদ্ভব, বিবর্তন এবং বর্তমান সময়ের স্বরূপ তুলে ধরেন। অধ্যাপক বরুণজ্যোতি চৌধুরী আধুনিক সময়ে লোকনৃত্যের পরিবর্তন, মঞ্চায়ন এবং সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করেন।

পঞ্চম দিনে বরাক উপত্যকার ঐতিহ্যবাহী ঝুমুর ও ধামাইল নৃত্য এবং গুরুপরম্পরায় ওঝা নৃত্য নিয়ে আলোচনা হয়। গুরুচরণ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. প্রণয় ব্রহ্মচারী ‘ঝুমুর ও ধামাইল নৃত্য : ঐতিহ্য ও ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে’ এবং রাধামাধব কলেজের সহকারী অধ্যাপক ড. সূর্যসেন দেব ‘গুরু পরম্পরা ধারায় ওঝানৃত্য : ক্রমবিবর্তনের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও নন্দনতাত্ত্বিক রূপরেখা’ বিষয়ে বক্তব্য রাখেন।

দশ দিন ধরে নৃত্য শিক্ষিকা সৌমদত্তা চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কর্মশালার শেষ দিনে উপস্থিত ছিলেন উত্তরসূরির সভাপতি নির্মল সরকার। তিনি শিক্ষার্থীদের লোকনৃত্যের মর্যাদা ও ঐতিহ্য রক্ষা করে তা আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানান।

শেষ দিনে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন লোকনৃত্য পরিবেশনের মধ্য দিয়ে কর্মশালার সমাপ্তি ঘটে। পরে অংশগ্রহণকারীদের হাতে শংসাপত্র তুলে দেওয়া হয়। উত্তরসূরির অন্যতম সদস্য ড. অর্পিতা রানী দাস আনুষ্ঠানিকভাবে সকলকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।

লোকনৃত্যের তাত্ত্বিক জ্ঞান ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের এই সমন্বিত আয়োজন শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিজস্ব লোকঐতিহ্য সম্পর্কে আগ্রহ ও সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি বরাক উপত্যকার সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন আয়োজকরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *