বরাক তরঙ্গ, ২৭ জুলাই : বরাক উপত্যকা ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি রেল যোগাযোগের নিরাপত্তা ও উন্নয়নের স্বার্থে ১৪৭ কিলোমিটার দীর্ঘ লংকা-ময়নারবন্দ (শিলচর) বিকল্প রেলপথ প্রকল্পকে জাতীয় প্রকল্প হিসেবে ঘোষণা করার দাবি জানিয়ে দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উদ্দেশ্যে একটি বিস্তারিত স্মারকপত্র ডাকযোগে প্রেরণ করেছেন শিলচরের বিশিষ্ট আইনজীবী ও জেলা বার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য ধর্মানন্দ দেব।
একই সঙ্গে স্মারকপত্রের অনুলিপি রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব, রেল বোর্ডের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলের (এনএফআর) মহাব্যবস্থাপক এবং এনএফআর-এর চিফ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসার (কনস্ট্রাকশন)-এর কাছেও প্রেরণ করা হয়েছে।
স্মারকপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রস্তাবিত ১৪৭ কিলোমিটার দীর্ঘ লংকা–ময়নারবন্দ বিকল্প রেলপথটি হোজাই জেলার লংকা থেকে পশ্চিম কার্বি আংলং, ডিমা হাসাও ও কাছাড় জেলার মধ্য দিয়ে শিলচরের নিকটবর্তী ময়নারবন্দ পর্যন্ত নির্মিত হওয়ার কথা। এই রেলপথ বাস্তবায়িত হলে বর্তমান লামডিং–বদরপুর পাহাড়ি রেলপথের উপর নির্ভরশীলতা অনেকাংশে কমবে এবং বরাক উপত্যকার পাশাপাশি ত্রিপুরা, মিজোরাম ও মণিপুরের সঙ্গে দেশের বাকি অংশের যোগাযোগ আরও নিরাপদ, নিরবচ্ছিন্ন ও নির্ভরযোগ্য হবে।
স্মারকপত্রে বলা হয়েছে, প্রতি বছর বর্ষাকালে জাটিঙ্গা–লামপুর ও ডিমা হাসাওয়ের বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ ভূমিধস, মাটি ধস, জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ি ক্ষয়ের কারণে রেল চলাচল বারবার ব্যাহত হয়। এর ফলে লক্ষ লক্ষ যাত্রী চরম দুর্ভোগের শিকার হন। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হয়, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পায়, ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং চিকিৎসা-সহ জরুরি পরিষেবাও মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে নিউ হারাঙ্গাজাও রেল স্টেশনের নিকট প্রায় ২০০ মিটার এলাকায় রেললাইনের নিচের মাটি ধসে গিয়ে উভয় লাইনে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনাও স্মারকপত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেল যুদ্ধকালীন তৎপরতায় মেরামতের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে, তবুও এ ধরনের অস্থায়ী ব্যবস্থা স্থায়ী সমাধান হতে পারে না বলে স্মারকপত্রে অভিমত ব্যক্ত করা হয়েছে।
ধর্মানন্দ দেব স্মারকপত্রে উল্লেখ করেন যে, এই প্রকল্পের ফাইনাল লোকেশন সার্ভে (FLS) ইতিমধ্যেই অনুমোদিত হয়েছে এবং বিস্তারিত প্রকল্প প্রতিবেদন (ডিপিআর) প্রস্তুতির জন্য সম্পূর্ণ ১৪৭ কিলোমিটার রুটের ভৌত সমীক্ষাও শেষ হয়েছে। বর্তমানে ডিপিআর চূড়ান্তকরণ, রাজ্য সরকারের সঙ্গে পরামর্শ, নীতি আয়োগের মূল্যায়ন, অর্থ মন্ত্রকের অনুমোদনসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। কিন্তু প্রকল্পটির অসামান্য কৌশলগত ও জাতীয় গুরুত্ব বিবেচনায় এই সমস্ত প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করে অবিলম্বে নির্মাণকাজ শুরু করা প্রয়োজন বলে তিনি দাবি জানিয়েছেন।
স্মারকপত্রে আরও বলা হয়েছে, লঙ্কা-ময়নারবন্দ বিকল্প রেলপথ কেবল একটি নতুন রেললাইন নয়; এটি উত্তর-পূর্ব ভারতের জন্য একটি কৌশলগত অবকাঠামো প্রকল্প। এই রেলপথ নির্মিত হলে সর্বকালীন বিকল্প রেল করিডর গড়ে উঠবে, জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সরবরাহ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে, দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে, শিল্প, বাণিজ্য, পর্যটন ও বিনিয়োগের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং বরাক উপত্যকা-সহ সমগ্র উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।
স্মারকপত্রে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কাছে প্রকল্পটিকে জাতীয় প্রকল্প হিসেবে ঘোষণা করার, সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদানের, দ্রুত ডিপিআর চূড়ান্ত করার, নীতি আয়োগ ও অর্থ মন্ত্রকের প্রয়োজনীয় অনুমোদন দ্রুত সম্পন্ন করার, পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দসহ প্রশাসনিক ও আর্থিক অনুমোদন প্রদান এবং বিলম্ব না করে অবিলম্বে নির্মাণকাজ শুরু করার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশ জারির আবেদন জানানো হয়েছে।
ধর্মানন্দ দেব বলেন, বরাক উপত্যকার মানুষের দীর্ঘদিনের ন্যায্য দাবি এই বিকল্প রেলপথ। সাম্প্রতিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ আবারও প্রমাণ করেছে যে, একটি মাত্র পাহাড়ি রেলপথের উপর সমগ্র বরাক উপত্যকা ও পার্শ্ববর্তী তিনটি রাজ্যের নির্ভরশীলতা জাতীয় স্বার্থে মোটেও কাম্য নয়। তাই দেশের বৃহত্তর স্বার্থে এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের স্থায়ী ও নিরাপদ রেল যোগাযোগ নিশ্চিত করতে লঙ্কা-ময়নারবন্দ বিকল্প রেলপথ প্রকল্পের দ্রুত বাস্তবায়ন এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি।



