বরাক তরঙ্গ, ৫ নভেম্বর : শ্রীভূমি ক্লাব হিন্দুস্তানের বিজয়া দশমীর প্রতিমা বিসর্জনকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া অনভিপ্রেত ঘটনা এবং বঙাইগাঁও জেলার ঢালিগাঁওয়ে শিলচরের এক শিক্ষিকা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের উপর কথিত হেনস্তা, শারীরিক হামলা ও জনসমক্ষে অপমানের ঘটনার প্রতিবাদে এবার সরব হল গ্রেটার বদরপুর সিটিজেনস ফোরাম। উভয় ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দোষীদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ এবং নির্দোষ ব্যক্তিদের হয়রানি বন্ধের দাবিতে মঙ্গলবার শ্রীভূমির জেলাশাসকের কাছে একটি স্মারকলিপি প্রদান করেন ফোরামের সদস্যরা।বদরপুর রাজস্ব চক্র আধিকারিকের মাধ্যমে জেলা কমিশনারের উদ্দেশে পাঠানো এই স্মারকলিপিতে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে সমাজে তৈরি হওয়া উদ্বেগের কথা তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বজায় থাকা সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের পরিবেশ অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকা কামনা করা হয়েছে।
স্মারকলিপিতে ফোরামের পক্ষ থেকে উল্লেখ করেন বদরপুর তথা বরাক উপত্যকার বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও সৌভ্রাতৃত্বের পরিবেশে বসবাস করে আসছেন। সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনের নানা ক্ষেত্রে একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর ঐতিহ্য রয়েছে এই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা এবং সময়োপযোগী পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছে সংগঠনটি।স্মারকলিপিতে প্রথমেই বদরপুর নবীনচন্দ্র কলেজের অধ্যাপিকা নয়নজ্যোতি গগৈয়ের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাঙালি সম্প্রদায়কে উদ্দেশ্য করে অবমাননাকর ও আপত্তিকর মন্তব্য করার অভিযোগ তুলে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনার দাবি জানানো হয়েছে।

ফোরামের বক্তব্য, একজন শিক্ষক বা শিক্ষিকা কেবলমাত্র একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি নন, তাঁরা সমাজের বৃহত্তর অংশের কাছেও আদর্শ ও অনুপ্রেরণার প্রতীক। বিশেষ করে ছাত্রছাত্রীদের মানসিকতা, চিন্তাভাবনা ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে শিক্ষকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে কোনও সম্প্রদায়কে উদ্দেশ্য করে অবমাননাকর মন্তব্য করা হলে তা সমাজে ভুল বার্তা পৌঁছে দিতে পারে বলে মনে করছে ফোরাম।
স্মারকলিপিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বদরপুরে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করে আসছেন। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতির এই পরিবেশ যাতে কোনওভাবেই বিঘ্নিত না হয়, সে বিষয়ে সকলের সচেতন থাকা প্রয়োজন। তাই অধ্যাপিকা নয়নজ্যোতি গগৈয়ের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের যথাযথ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে। এদিকে, বিজয়া দশমীর দিন প্রতিমা বিসর্জনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট পরিস্থিতি পরবর্তীতে নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ঘটনাটিকে ঘিরে বিভিন্ন মহলে নানা বক্তব্য ও প্রতিক্রিয়া সামনে এসেছে। এই অবস্থায় প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের জন্য নিরপেক্ষ, অবাধ ও সুষ্ঠু তদন্তের উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে গ্রেটার বদরপুর সিটিজেনস ফোরাম।

স্মারকলিপিতে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে, ঘটনার প্রকৃত সত্য সামনে আসুক এবং তদন্তের মাধ্যমে যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হবে, তাঁদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। তবে কোনও নির্দোষ ব্যক্তি যেন এই ঘটনার জেরে অযথা হয়রানির শিকার না হন কিংবা মিথ্যা অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে কারাবন্দি না হন, সে বিষয়েও প্রশাসনের কাছে বিশেষ আবেদন জানানো হয়েছে।ফোরামের মতে, কোনও ঘটনায় আইন নিজের পথে চলা উচিত। আবেগ, জনমত কিংবা কোনও পক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতে নয়, বরং নির্ভরযোগ্য তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতেই তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। এতে প্রকৃত দোষীরা যেমন আইনের আওতায় আসবেন, তেমনই নির্দোষ ব্যক্তিদের অধিকারও সুরক্ষিত থাকবে।

এদিকে বঙাইগাঁও জেলার ঢালিগাঁওয়ে শিলচরের এক শিক্ষিকা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া কথিত অনভিপ্রেত ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে। গত ২৩ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে শিলচরের ওই শিক্ষিকা তাঁর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঢালিগাঁওয়ে বেড়াতে গিয়েছিলেন। অভিযোগ, সেখানে তাঁরা হেনস্তা, শারীরিক হামলা এবং জনসমক্ষে অপমানের শিকার হন। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, ওই সময় তাঁদের সঙ্গে থাকা নাবালক সন্তানও ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল।একটি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে এমন ঘটনার অভিযোগ সামনে আসায় সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও মৌলিক অধিকার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ফোরাম। স্মারকলিপিতে বলা হয়েছে, কোনও নাগরিক নিজের পরিবার নিয়ে কোথাও বেড়াতে গেলে তাঁর নিরাপত্তা ও সম্মান রক্ষা করা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের অন্যতম দায়িত্ব।এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে শ্রীভূমির জেলা কমিশনার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অবিলম্বে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করার আবেদন জানানো হয়েছে। পাশাপাশি, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের শনাক্ত করে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।ফোরামের সদস্য ময়নুল হক জানান, বদরপুর ও বৃহত্তর বরাক উপত্যকার মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে যে পারস্পরিক সম্পর্ক ও সৌহার্দ্য বজায় রয়েছে, তা কোনওভাবেই ক্ষুণ্ণ হওয়া উচিত নয়। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভেদ বা অবিশ্বাস তৈরি হলে তার প্রভাব সমাজের বৃহত্তর অংশের উপর পড়তে পারে।
তাই প্রশাসনের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে, প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা হোক এবং আইন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। একই সঙ্গে কোনও নির্দোষ ব্যক্তি যেন অযথা হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়েও সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।গ্রেটার বদরপুর সিটিজেনস ফোরামের পক্ষ থেকে স্মারকলিপিতে স্বাক্ষর করেন পীযূষ কান্তি মজুমদার, পঙ্কজকান্তি দেব রায়, অরূপকাঞ্চন ধর, দেবব্রত রায়, নবনীতা চক্রবর্তী, গুরু নন্দন ঘোষ, পৈশন রায় কর্মকার এবং সুশান্ত কুমার ঘোষ।



