যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে একাধিক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত
৪ নভেম্বর : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টিকে বড় ব্যবধানে পরাজিত করে ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জন করেছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। সিনেট, প্রতিনিধি পরিষদ এবং বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের গভর্নর নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের সাফল্যকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ‘ব্লু সুনামি’ বা ‘নীল ঝড়’ হিসেবে অভিহিত করছেন। নির্বাচনের ফলাফল ডেমোক্র্যাটদের প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ-কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পথে দলটি।
এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকগুলির মধ্যে রয়েছে মুসলিম প্রার্থীদের অভূতপূর্ব সাফল্য। মার্কিন কংগ্রেসের দুই কক্ষে অন্তত আটজন মুসলিম আইনপ্রণেতা নির্বাচিত হয়ে নতুন ইতিহাস গড়েছেন। নাগরিক অধিকার রক্ষা, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা এবং গাজায় ইজরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নিঃশর্ত সামরিক সহায়তার বিরোধিতার মতো বিষয়কে সামনে রেখেই তাঁরা নির্বাচনী প্রচার চালিয়েছিলেন।
মুসলিম প্রতিনিধিত্বে নতুন মাইলফলক :
মিশিগান থেকে ৪২ বছর বয়সী ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদ সাবেক রিপাবলিকান প্রতিনিধি মাইক রজার্সকে পরাজিত করে সিনেটে জয়ী হয়েছেন। চিকিৎসক ও প্রাক্তন জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা এল-সায়েদ অবসরপ্রাপ্ত সিনেটর গ্যারি পিটার্সের আসনটি দখল করেন। নির্বাচনী প্রচারে ধর্মীয় আক্রমণের মুখেও তিনি নিজের অবস্থানে অনড় ছিলেন। ইসরায়েলে যুক্তরাষ্ট্রের শর্তহীন অস্ত্র সরবরাহের সমালোচনা করার পাশাপাশি গাজায় ইজরায়েলি সামরিক অভিযানকে গণহত্যা বলে অভিহিত করেন তিনি।

নিউ জার্সির ১২তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে জয়ী হয়েছেন ৫৬ বছর বয়সী ডেমোক্র্যাট প্রার্থী। রিপাবলিকান প্রার্থী গ্রেগ মেলেকে পরাজিত করে রাজ্যটির প্রথম মুসলিম প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। পেশায় প্লাস্টিক সার্জন হামাভি অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন সামরিক চিকিৎসক এবং ইরাক যুদ্ধের প্রাক্তন সৈনিক। ২০২৪ সালে গাজার ইউরোপীয় হাসপাতালে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবেও কাজ করেছিলেন তিনি।
নিউ ইয়র্ক থেকে জয়ী হয়েছেন নাগরিক অধিকার বিষয়ক গবেষক ও ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত ডেমোক্র্যাট প্রার্থী দারিওলাইজা অ্যাভিলা শ্যাভালিয়ার। প্রাথমিক নির্বাচনে দীর্ঘদিনের প্রতিনিধি আদ্রিয়ানো এস্পাইলাতকে পরাজিত করার পর মূল নির্বাচনে ৮৫ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে জয়ী হন তিনি।

অন্যদিকে, নিউ ইয়র্ক স্টেট সেনেটের ১২ নম্বর আসনে জয়ী হয়ে ইতিহাস গড়েছেন ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত আমেরিকান মুসলিম নারী আবের কাওয়াস। তিনি রাজ্য আইনসভায় প্রথম হিজাব পরিহিত ফিলিস্তিনি-আমেরিকান প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করতে চলেছেন। ভোট গণনার ৯০ শতাংশ সম্পন্ন হওয়ার পর তিনি প্রায় ৭৫ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন।
এদিকে, নতুন চারজনের পাশাপাশি পূর্বে নির্বাচিত চার মুসলিম আইনপ্রণেতাও পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁরা হলেন মিশিগানের রশিদা তালিব, মিনেসোটার ইলহান ওমর, ইন্ডিয়ানার আন্দ্রে কার্সন এবং ক্যালিফোর্নিয়ার লতিফা সাইমন। ক্যালিফোর্নিয়ার আরেক মুসলিম প্রার্থী আয়েশা ওয়াহাবও ভোট গণনার প্রাথমিক পর্যায়ে এগিয়ে রয়েছেন।
বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে একাধিক ঐতিহাসিক জয় :
এবারের নির্বাচনে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রেও একাধিক নজির তৈরি হয়েছে। সিএনএনের ‘ডিসিশন ডেস্ক’-এর প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন প্রজন্মের বহু প্রতিনিধির উত্থান ঘটতে চলেছে।
মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ স্পিকার হওয়ার পথে রয়েছেন ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফ্রিস। জর্জিয়ার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ ও নারী গভর্নর হতে চলেছেন কিশা ল্যান্স বটমস। একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর হওয়ার নজির গড়তে চলেছেন।

নিউ হ্যাম্পশায়ার থেকে সিনেট নির্বাচনে জয়ী হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম প্রকাশ্যে সমকামী পুরুষ সিনেটর হওয়ার পথে ক্রিস পাপাস। অন্যদিকে, ফ্লোরিডার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ গভর্নর হতে চলেছেন রিপাবলিকান প্রার্থী বায়রন ডোনাল্ডস। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থন নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন তিনি।
সাউথ ক্যারোলাইনার ইতিহাসে প্রথম নির্বাচিত নারী সিনেটর হতে চলেছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যানি অ্যান্ড্রুজ। দীর্ঘ প্রায় তিন দশক ধরে রিপাবলিকানদের দখলে থাকা আসনে ট্রাম্প-সমর্থিত প্রার্থী ডারলিন গ্রাহামকে পরাজিত করে চমক সৃষ্টি করেছেন তিনি।
টেক্সাসে প্রথম হিস্পানিক গভর্নর হওয়ার পথে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জিনা হিনোহোসা। দীর্ঘ ১২ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা রিপাবলিকান গ্রেগ অ্যাবটকে পরাজিত করেছেন ৫২ বছর বয়সী এই আইনজীবী। ১৯৯০ সালে অ্যান রিচার্ডসের পর তিনিই রাজ্যটির প্রথম ডেমোক্র্যাট গভর্নর হতে চলেছেন। পাশাপাশি টেক্সাসের ইতিহাসে তৃতীয় নারী গভর্নর হিসেবেও দায়িত্ব গ্রহণ করবেন তিনি।
কলোরাডোর প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী কংগ্রেস সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন ২৯ বছর বয়সী মেল্যাত কিরোস। ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্ট ও আইনজীবী কিরোস প্রতিনিধি পরিষদের নবীনতম প্রজন্মের সদস্যদের অন্যতম হতে চলেছেন।
নিউ ইয়র্কের সপ্তম ডিস্ট্রিক্ট থেকে জয়ী হয়ে রাজ্যটির প্রথম নারী আদিবাসী আমেরিকান কংগ্রেস সদস্য হওয়ার পথে ক্লেয়ার ভালদেস। নিউ ইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি শুরু থেকেই তাঁর নির্বাচনী প্রচারে সমর্থন জানিয়েছিলেন।
মিশিগানের ১১তম ডিস্ট্রিক্ট থেকে জয়ী হয়ে রাজ্যটির প্রথম প্রকাশ্যে সমকামী কংগ্রেস সদস্য হতে চলেছেন প্রাক্তন রাজ্য সিনেটর জেরেমি মস। অন্যদিকে, ওহাইওতে প্রথম নির্বাচিত নারী গভর্নর হওয়ার পথে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যামি অ্যাক্টন। তিনি রিপাবলিকান দলের তরুণ নেতা বিবেক রামাস্বামীকে পরাজিত করেছেন। ২০০৬ সালের পর এই প্রথম ওহাইওতে কোনও ডেমোক্র্যাট গভর্নর নির্বাচিত হতে চলেছেন।
ক্যালিফোর্নিয়ার ইতিহাসে প্রথম নির্বাচিত ল্যাটিনো গভর্নর হওয়ার পথে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেভিয়ার বেসেরা। বাইডেন প্রশাসনের প্রাক্তন স্বাস্থ্যমন্ত্রী বেসেরা গভর্নর গ্যাভিন নিউসমের উত্তরসূরি হতে চলেছেন।
সিনেটে একসঙ্গে তিন কৃষ্ণাঙ্গ নারী :
মার্কিন সিনেটের ইতিহাসেও নতুন অধ্যায় রচিত হতে চলেছে। ইলিনয়ের লেফটেন্যান্ট গভর্নর জুলিয়ানা স্ট্র্যাটন সিনেটর নির্বাচিত হওয়ায় আগামী জানুয়ারি থেকে প্রথমবারের মতো একই সময়ে তিনজন কৃষ্ণাঙ্গ নারী সিনেটে দায়িত্ব পালন করবেন। তাঁর সঙ্গে থাকবেন ডেলাওয়্যারের লিসা ব্লান্ট রচেস্টার এবং মেরিল্যান্ডের অ্যাঞ্জেলা অলসুব্রুকস। ২০২৪ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে তাঁরা দুজন ইতিমধ্যেই সিনেটর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
সব মিলিয়ে এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল মার্কিন রাজনীতিতে জাতিগত, ধর্মীয় ও সামাজিক বৈচিত্র্যের প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির পাশাপাশি ক্ষমতার সমীকরণেও বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে নির্বাচনী ফলাফলের চূড়ান্ত সরকারি ঘোষণা ও সংশ্লিষ্ট পদগুলিতে আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব গ্রহণের পরই এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনগুলির পূর্ণ প্রতিফলন স্পষ্ট হবে।



