ক্ষুব্ধ ভোটারের কড়া জবাব: যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প যুগের অবসানের সূচনা

Spread the news

৪ নভেম্বর : “প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে যেভাবে ভোট দিতেন, ঠিক সেভাবেই ভোট দিন—ধরে নিন আমি নিজেই ব্যালটে আছি।” চলতি বছরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারণাজুড়ে এক বা দু’বার নয়, টানা ৪৭ বার ভোটারদের প্রতি ঠিক এই আকুল আবেদনই জানিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আমেরিকান ভোটাররা ট্রাম্পের এই আহ্বানে সাড়া দিয়েছেন ঠিকই, তবে ফলাফল এসেছে তার আশা ও প্রত্যাশার সম্পূর্ণ বিপরীতে

মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচনে এক বিশাল ‘ডেমোক্রেটিক ঢেউ’ বা গণজোয়ার দেখা গেছে। আমেরিকান রাজনীতির মঞ্চে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আধিপত্য বিস্তার করে রাখা এই অত্যন্ত বিতর্কিত রাষ্ট্রপ্রধানের প্রতি জনগণের তীব্র অসন্তোষ ও প্রত্যাখ্যানের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এই রায়ে। সাবেক যেকোনো প্রেসিডেন্টের তুলনায় ট্রাম্প নিজেকে এই নির্বাচনের কেন্দ্রবিন্দু বা রেফারেন্ডামে পরিণত করেছিলেন এবং চূড়ান্ত বিচারে তাকে এর চড়া মূল্য দিতে হলো।

নির্বাচনী ধাক্কাটি রিপাবলিকানদের জন্য কতটা নির্মম ছিল তা স্পষ্ট হয় তথাকথিত ‘রেড স্টেটস’ বা কট্টর রিপাবলিকান ঘাঁটিগুলোতেও ভোটের বড় ধ্বস দেখে। এই রায় প্রমাণ করে যে, ট্রাম্পকে দ্বিতীয়বার হোয়াইট হাউসে পৌঁছে দেওয়া সেই শক্তিশালী রাজনৈতিক জোটের ওপর তার প্রভাব এখন অনেকটাই শিথিল। জ্বালানি তেলের অনিয়ন্ত্রিত মূল্যবৃদ্ধি, ইরানের সাথে একটি দীর্ঘায়িত ও জটিল যুদ্ধ এবং ট্রাম্প ও তার ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে ওঠা জঘন্য আর্থিক অনিয়ম ও লাভজনক বাণিজ্যের অভিযোগে ক্ষুব্ধ ভোটাররা—যারা ইতিপূর্বে পরিবর্তনের আশায় এই বহিরাগত নেতাকে বেছে নিয়েছিলেন—তারা এবার হয় রিপাবলিকান দলকে বর্জন করেছেন, নয়তো ভোট দেওয়া থেকেই বিরত থেকেছেন।

তবে নির্বাচনী সীমানা পুনর্নির্ধারণ বা ‘জেরিম্যান্ডারিং’-এর জটিলতার কারণে ডেমোক্রেটদের এই বিপুল সংখ্যক ভোটের ব্যবধান হয়তো আগের সেই ঐতিহাসিক বছরগুলোর মতো বেশি সংখ্যক আসনে রূপান্তরিত নাও হতে পারে। তবুও, সামগ্রিক এই ফলাফল বার্তা দিচ্ছে যে, প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের মেয়াদের আরও দুই বছর বাকি থাকলেও এবং তার ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ থাকলেও, আমেরিকান জনগণ কার্যত ‘ট্রাম্প যুগের সমাপ্তির সূচনা’ নিশ্চিত করে দিয়েছে।

প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের হোয়াইট হাউস পলিটিক্যাল ডিরেক্টর ডগলাস বি. সসনিক এই ফল বিশ্লেষণ করে বলেন, “এটি মূলত ট্রাম্প, রিপাবলিকান পার্টি এবং গত দুই বছরে তাদের নেওয়া নানা পদক্ষেপের প্রতি জনগণের এক সুস্পষ্ট প্রত্যাখ্যান। আমরা এখন একটি রূপান্তরকালীন বা ট্রানজিশন পর্বে প্রবেশ করছি, যা আগামী দুই বছর স্থায়ী হবে এবং এই সময়টি আগের দুই বছরের চেয়ে অনেক বেশি অস্থির হতে চলেছে।”

অন্যদিকে, বিপর্যয় এড়াতে ট্রাম্পের দাবি, তিনি নিজে ব্যালট পেপারে সরাসরি ছিলেন না বলেই রিপাবলিকানদের এই পরাজয় ঘটেছে। মঙ্গলবার রাতে ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “আমি তো টিকিটে ছিলাম না, আর আমি ছিলাম না বলেই আমরা যথেষ্ট ভোটারকে কেন্দ্রে আনতে পারিনি।”

যদিও তার দলের অভ্যন্তরেই অনেকেই ট্রাম্পের এই অজুহাত মানতে নারাজ। কেননা, পুরো প্রচারণাটি গড়ে উঠেছিল তাকে কেন্দ্র করেই। ট্রাম্প নিজেই একক সিদ্ধান্তে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সূচনা করেন, যা জ্বালানি বাজারকে অস্থির করে তেল ও গ্যাসের দাম বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। তিনিই প্রার্থী বাছাই, নির্বাচনী ইস্যু নির্ধারণ, কৌশল ও বার্তা স্থির করেছিলেন। এমনকি টেক্সাস এবং সাউথ ক্যারোলাইনার মতো কট্টর রিপাবলিকান অঙ্গরাজ্যে ট্রাম্পের পছন্দ করা দুই সিনেট প্রার্থীর পরাজয় প্রমাণ করে যে, তার ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপ দলকে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমানো ও নতুন যুদ্ধ না জড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ট্রাম্প যেভাবে আমেরিকানদের বিশ্বাস জিতেছিলেন, পরবর্তীতে শুল্কনীতি বা ট্যাক্স বাড়িয়ে সাধারণ পণ্যের দাম বৃদ্ধি করায় ভোটাররা নিজেদের প্রতারিত মনে করছেন। এমনকি নির্বাচনের আগের দিন তার দেওয়া বক্তব্যও জনগণের বাস্তব সমস্যার চেয়ে দেশের নিজস্ব মেগা প্রজেক্টের প্রশংসাতেই সীমাবদ্ধ ছিল, যা সাধারণ ভোটারের মনস্তত্ত্ব থেকে তার বিচ্ছিন্নতাকেই স্পষ্ট করে।

ডেমোক্রেটদের এই বিশাল বিজয়ের পর এখন মার্কিন রাজনীতিতে আলোচনা শুরু হয়েছে—এই রায় কি আমেরিকার রাজনৈতিক ভাবধারায় এক স্থায়ী পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে, নাকি এটি সাময়িক অসন্তোষের ফল? বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, অর্থনৈতিক চাপ ও ট্রাম্পের ওপর সাময়িক বিরক্তি থাকলেও ডোনাল্ড ট্রাম্পের গড়ে তোলা ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ (MAGA) সমর্থক জোট একবারে মুছে যায়নি। তবে প্রেসিডেন্টের শেষ দুই বছরের মেয়াদ যে তীব্র রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে কাটবে, তা অনেকটাই নিশ্চিত।
সূত্র: দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস, খবর : দৈনিক ইনকিলাব পত্রিকা ডিজিটাল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *