বরাক তরঙ্গ, ১৬ আগস্ট : নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ৮০তম স্বাধীনতা দিবসপালন করল বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সংগঠন।
গুরুচরণ বিশ্ববিদ্যালয় : সারা দেশের সঙ্গে ১৫ আগস্ট গুরুচরণ বিশ্ববিদ্যালয়েও উৎসাহ উদ্দীপনার সাথে ৮০তম স্বাধীনতা দিবস শনিবার বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে পালন করা হয়। প্রথমে রাষ্ট্রগীত পরিবেশিত হয় ও সকাল ৭.৩০ মিনিটে উপাচার্য অধ্যাপক নিরঞ্জন রায় ভাব-গম্ভীর পরিবেশে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন এবং জাতীয় সংগীত গীত হয়। এরপর শুরু হয় মূল অনুষ্ঠান। প্রথমেই স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন এদিনের অনুষ্ঠানের আহ্বায়ক ড. সৌরভ দাস। উপাচার্য অধ্যাপক নিরঞ্জন রায় তাঁর ভাষনে বলেন ভারতবর্ষ পৃথিবীর একটি অন্যতম প্রাচীন সভ্যতার উন্নত একটি দেশ ছিল। সেই সময়কার এই উন্নতির প্রধান কারণ ছিল ধর্মের ভিত্তিতে দেশের নাগরিকদের উন্নয়ন। আর এই ধর্মের মূল উপাদান ছিল ঠিক আর ভূলের মধ্যে পার্থক্য তৈরি করে সঠিকটাকে গ্রহণ করা, সৎকর্ম, সৎ বিচার ও নৈতিকতার মাধ্যমে দেশকে উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছে দেওয়া। তিনি বলেন পরাধীন ভারতে আমরা বিদেশী শক্তির নির্যাতনের স্বীকার হয়েছি কিন্তু বিভেদের মাঝে ঐক্য ছিল ভারতের মূল শক্তি তাই অসংখ্য দেশপ্রেমিকের আত্মবলিদানের বিনিময়ে আজ দেশ স্বাধীন হতে পেরেছে। তিনি প্রত্যেক স্বাধীনতা সংগ্রামীকে সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করেন। এই স্বাধীন দেশকে ২০৪৭ সালের মধ্যে পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত দেশে পরিণত করার যে আশা ভারতবাসী ব্যক্ত করছেন তা সম্ভব হবে ভারতের যুবশক্তির সাহায্যে। ভারতীয় জ্ঞান পরম্পরায় যুব শক্তিকে চালনা করতে পারলে ও ‘দেশ সর্বাগ্রে’ এই মানসিকতা তৈরির মাধ্যমে ভারত পৃথিবীর উন্নততম দেশ হয়ে উঠবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিবন্ধক ড. বিদ্যুৎ কান্তি পাল উপস্থিত সবাইকে ৮০তম স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করেন সেই সঙ্গে তিনি প্রত্যেক স্বাধীনতা সংগ্রামীর আত্ম বলিদান কে স্মরণ করে তাদের উদ্দেশ্যে প্রণাম নিবেদন করেন। শৈক্ষিক নিবন্ধক ড. অভিজিৎ নাথ ব্যাখ্যা করেন যে কিভাবে কোনও ভারতবাসীর মতামতের পরোয়া না করে রেডক্লিফ একটি মানচিত্রের উপর নির্ভর করে অখণ্ড ভারতবর্ষকে দ্বিখণ্ডিত করেন। এর বিনিময়ে ভারতবর্ষ পেয়েছে স্বাধীনতা। ভারত-ভাগ পরবর্তী প্রতিটি ভারতবাসীর অসহনীয় যন্ত্রণার কথা বিশেষ করে উল্লেখ করেন ও সেইসঙ্গে ভারতবাসীর উদ্দেশ্যে সাংস্কৃতিক ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানান। ১৫ আগস্ট যে এক মনীষী ঋষি অরবিন্দ ঘোষের জন্মদিনের কথা উপস্থিত সবাই কে স্মরণ করিয়ে দেন। এরপর শুরু হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। একক দেশাত্মবোধক সংগীত পরিবেশন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী সুনন্দা শুক্লবৈদ্য ও দীনেশ ত্রিপুরা, একক নৃত্য পরিবেশন করে দেবপ্রিয় বৈশ্য ও শিশুশিল্পী সানভী দাস, সমবেত দেশাত্মবোধক সংগীত পরিবেশন করে এন এস এস গ্রুপের সদস্যরা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের একটি দল। সমবেত নৃত্য পরিবেশন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক ছাত্রীদের দল ও এনসিসি সদস্যদের দল। এরপর পুরস্কার বিতরণ করা হয় ও সবশেষে রাষ্ট্র গীত ও জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান সমাপ্ত হয়। সমগ্র অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন এন সি সির দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র রাজনীতি গোয়ালা।

লেঙ্কা মারুপ : চেংকুড়ি রোডের ভকতপুর এলাকায় বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক–সামাজিক ও ক্রীড়া সংঘ লেঙ্কা মারুপের উদ্যোগে দেশের ৮০তম স্বাধীনতা দিবস সারাদিনব্যাপী নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে উদযাপন করা হয়েছে। ছোটোদের জন্য বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, সন্ধ্যায় বিজয়ীদের পুরস্কার প্রদান ও উৎসাহস্বরূপ পুরস্কার বিতরণ করা হয়।
সংগঠন মহিলাদের স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে সেলাই মেশিন ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করে এবং প্রগতিশীল কৃষক ও গুণী স্থানীয়দের সম্মান জানানো হয়। অনুষ্ঠানে ঐতিহ্যবাহী বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি নৃত্য ও সঙ্গীত পরিবেশন করে দর্শকমহল মুগ্ধ করে। অনুষ্ঠানের প্রধান ও বিশেষ অতিথিদের মধ্যে ছিলেন লেঙ্কা মারুপের উপদেষ্টা শিলচরের বিধায়ক ডাঃ রাজদীপ রায়ের প্রতিনিধি পুলক দাস, জেলা বিজেপির সহ-সভাপতি অভ্রজিৎ চক্রবর্তী (ঝলক), বি সি মোর্চার সভাপতি কিশোর পাল, মনোজ তালুকদার, বাবলু কেওট ও সাংবাদিক বাপ্পী আচার্য প্রমুখ।

সহমর্মী : দেশের ৮০তম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে মানবিক উদ্যোগে সামিল হলো কাছাড়ের স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘সহমর্মী’। স্বাধীনতা দিবসের আনন্দকে সমাজের প্রান্তিক ও দরিদ্র মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নিতে সংস্থার পক্ষ থেকে শিলচর শহরের বিভিন্ন এলাকায় শতাধিক মানুষের হাতে দুপুরের খাবারের প্যাকেট ও পানীয় জল তুলে দেওয়া হয়। সংস্থার সদস্যরা শহরের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বিশেষ করে আর্থিকভাবে অসচ্ছল ও প্রয়োজনমতো খাবার সংগ্রহে সমস্যায় থাকা মানুষদের চিহ্নিত করেন। এরপর তাঁদের হাতে প্যাকেটজাত দুপুরের খাবার ও পানীয় জল তুলে দেওয়া হয়। স্বাধীনতা দিবসের তাৎপর্যকে মানবিকতার সঙ্গে যুক্ত করে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এই উদ্যোগ স্থানীয়দের কাছেও প্রশংসিত হয়েছে। এর আগে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে লিংক রোডে ‘সহমর্মী’র কার্যালয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে দিনের কর্মসূচির সূচনা হয়। পতাকা উত্তোলন করেন অবসরপ্রাপ্ত আধিকারিক দিলীপ কুমার চক্রবর্তী।
দিনভর মানবিক কর্মসূচিতে সংস্থার সভানেত্রী সম্পা দাসের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন অপর্ণা পাল, পুনম রবিদাস, হিমাদ্রি অধিকারী, পারমিতা চক্রবর্তী, অমিত দাস, প্রদীপ বাগদী ও দীপক বাউরী-সহ অন্যান্য সদস্যরা।
‘সহমর্মী’র পক্ষ থেকে জানানো হয়, জাতীয় দিবসের উদযাপন শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়ানোই তাঁদের মূল উদ্দেশ্য। মানুষের মুখে একবেলার খাবার তুলে দেওয়ার এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার আনন্দ সকলের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ারই প্রয়াস নেওয়া হয়েছে।

রংপুর হিন্দুরক্ষী দল : যথাযোগ্য মর্যাদা ও উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে ৮০তম স্বাধীনতা দিবস পালন করল রংপুরের হিন্দুরক্ষী দল। শনিবার সকালে দলের উদ্যোগে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। পতাকা উত্তোলন করেন সংগঠনের সভাপতি সুভাষ দেব। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দলের সহ-সভাপতি মনিষ দেব, ধ্রুব দেবনাথসহ অন্যান্য সদস্যরা। পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন হিন্দুরক্ষী দলের কাছাড় জেলা কমিটির সভাপতি সঞ্জীব নাথ। স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে দেশপ্রেম ও জাতীয় ঐক্যের বার্তা তুলে ধরা হয়। সংগঠনের সদস্যরা জাতীয় পতাকার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং স্বাধীনতা সংগ্রামীদের অবদানের কথা স্মরণ করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত সকলে দেশের অখণ্ডতা, শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

সাবাজপুর সমাজ বন্ধু এনজিও : উত্তর কৃষ্ণপুর চতুর্থ খণ্ডের সাবাজপুর এলাকায় যথাযোগ্য মর্যাদা ও দেশাত্মবোধের আবহে দেশের ৮০তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করল সমাজ বন্ধু এনজিও। একই অনুষ্ঠানে পালিত হয় সংস্থার প্রথম বর্ষপূর্তিও। সকালে সাবাজপুরে সংস্থার কার্যালয়ের সামনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন সমাজ বন্ধু এনজিওর সভাপতি তথা অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মী নাজিম উদ্দিন লস্কর। পতাকা উত্তোলনের পর জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। এরপর স্বাধীনতা আন্দোলনের শহিদ সেনানিদের স্মরণ করে তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন সংস্থার সদস্যরা।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সংস্থার উপদেষ্টা করুনময় নাথ, আতাউর রহমান লস্কর, বুতন দাস, সাধারণ সম্পাদক অভিষেক নাথ, কোষাধ্যক্ষ নাজির হোসেন লস্কর, সদস্য মেহের উদ্দিন লস্কর, কালাম উদ্দিন লস্কর, রাজ দাস, সুরজিৎ দাস, রিপন উদ্দিন লস্কর, মাসুক উদ্দিন লস্কর, টুকু দাসসহ অন্যান্যরা।

নাথ যোগী যুব উন্নয়ন পরিষদ : স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে দেশাত্মবোধের আবহে মানবিক ও সমাজসেবামূলক কর্মসূচির আয়োজন করল কাটিগড়া মহকুমা নাথ যোগী যুব উন্নয়ন পরিষদ। শনিবার পরিষদের উদ্যোগে প্রথমে যথাযোগ্য মর্যাদায় জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে স্বাধীনতা দিবসের কর্মসূচির সূচনা হয়। পতাকা উত্তোলনের পর দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের স্মরণ করে তাঁদের আত্মত্যাগ ও দেশের প্রতি কর্তব্যবোধের কথা তুলে ধরা হয়। এরপর স্বাধীনতা দিবসকে শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সমাজের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর বার্তা নিয়ে পরিষদের সদস্যরা এগিয়ে যান। এদিন কালাইন কমিউনিটি হেলথ সেন্টার (সিএইচসি) এবং কাটিগড়া এম জি মডেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন দুস্থ ও অসহায় রোগীদের মধ্যে পরিষদের পক্ষ থেকে ফলমূল বিতরণ করা হয়। রোগীদের হাতে ফলমূল তুলে দিয়ে তাঁদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন পরিষদের সদস্যরা। পরিষদের এই উদ্যোগে স্বাধীনতা দিবসের তাৎপর্য আরও গভীর হয়ে ওঠে বলে মনে করেন উপস্থিত সদস্যরা। তাঁদের মতে, দেশের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রকাশের পাশাপাশি সমাজের পিছিয়ে পড়া ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোও একজন নাগরিকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। সেই ভাবনা থেকেই স্বাধীনতা দিবসে এই মানবিক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। এদিনের কর্মসূচিতে কাটিগড়া মহকুমা নাথ যোগী যুব উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি নিরুপম নাথ, সহ-সভাপতি পরিমল নাথ, সম্পাদক মৃণাল নাথ, কোষাধ্যক্ষ অপূর্ব নাথ, সোশ্যাল মিডিয়া কনভেনর কামেশ্বর নাথ, নিপেন নাথ, পঙ্কজ নাথ, মৃদুল নাথ-সহ পরিষদের অন্যান্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। জাতীয় পতাকা উত্তোলন থেকে শুরু করে অসহায় রোগীদের মধ্যে ফলমূল বিতরণ – স্বাধীনতা দিবসের দিনে পরিষদের এই কর্মসূচি সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মানবিকতার এক সুন্দর দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। আগামী দিনেও সমাজের মানুষের পাশে থেকে বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন পরিষদের সদস্যরা।



