আশু চৌধুরী, শিলচর।
বরাক তরঙ্গ, ১৩ সেপ্টেম্বর : রুদ্ধশ্বাস লড়াই ! অবশেষে সনাতনের পর পর দু’টি বল সেভে দ্বিতীয়বারের মতো মাতৃভূমি কাপ অর্জন করল জামালপুর এফসি। রবিবার ধলাই বিএনএমপি স্কুলের খেলার মাঠে প্রায় ২০ হাজার দর্শক দারুন ফাইনাল ম্যাচ উপভোগ করলেন। এ দিন বিকেল ৩টায় সুশান্তরঞ্জন দত্ত ও স্বপনকুমার বর্মণ স্মৃতি মাতৃভূমি কাপ প্রাইজমানি নকআউট ফুটবলের শিরোপা অর্জনের লড়াই শুরু হয় জামালপুর এফসি ও ইসলামাবদা এফসির। ৩-১৭ মিনিটে শামিম আহমদ বাঁশি বাজালে শুরু হয় দুই দলের বলযুদ্ধ। কিন্তু ম্যাচের তিন মিনিটেই জয়ের স্বপ্ন দেখান জামালপুরের হয়ে ডেভিড। তবে সেই লিড ক্ষণিকের হয়ে দাঁড়ায়। পাঁচ মিনিটের মধ্যে সাজিদ গোল করে ইসলামাবাদকে সমতায় নিয়ে আসেন। এরপর শুরু হয় উভয় দলের রুদ্ধশ্বাস লড়াই। প্রথমার্ধ্বের খেলা ১-১ গোলে শেষ হয়।

গোলের সংখ্যা বাড়ানোর লক্ষ্যে দ্বিতীয়ার্ধ্বের যুদ্ধ শুরু হয়। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধ্বে জামালপুর অ্যাটাকে এগিয়ে থাকলেও ইসলামাবাদের জাল কাঁপাতে ব্যর্থ হয়। আর ইসলামাবাদ জামালপুরের ওয়াল টপকানো কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। অবশেষে ১-১ গোলে ড্র হওয়া ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। টাইব্রেকার প্রথম ও দ্বিতীয় শট সেভ করে জামালপুরের গোলকিপার সনাতন। তাঁর দু’টি সেভ নির্ণায়ক হয়ে দাঁড়ায়। ম্যাচ ২-৪ গোলে জয়ী হয় জামালপুর এফসি। ম্যাচে দু’টি দল ১৪টি ফাউল করে। এ ছাড়া ইসলামাবাদ অফসাইড করে একটি, জামালপুর করেছে চারটি। কর্ণার পেয়েছে জামালপুরে তিনটি এবং ইসলামাবাদ একটি। জামালপুর দু’টি হ্যান্ডবল করে।

ফাইনালে ম্যান অব দ্য ম্যাচ নির্বাচিত হন জামালপুরের গোলরক্ষক সনাতন সিং। টুর্নামেন্টজুড়ে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের পুরস্কারও পেয়েছে জামালপুর। দলের ডেভিড সিং নির্বাচিত হন ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট এবং সর্বোচ্চ গোলদাতা। হাওয়াইথাং এফসির সুশান্ত বর্মণ (চুনু) পান সেরা গোলরক্ষকের পুরস্কার। কর্কট এফসির বিশ্বনাথ নির্বাচিত হন সেরা ডিফেন্ডার।

মথুরাপুর এফসি পায় সেরা শৃঙ্খলাবদ্ধ দলের সম্মান। নহরুল ইউনাইটেড এফসির সমীর সিংহকে দেওয়া হয় প্রতিশ্রুতিশীল খেলোয়াড়ের পুরস্কার।
এই জয় জামালপুরের কাছে আরও তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২৪ সালের মাতৃভূমি কাপের ফাইনালে ইসলামাবাদের কাছে ১–০ গোলে পরাজিত হয়ে শিরোপা হাতছাড়া করেছিল জামালপুর। দুই বছর পর সেই একই প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ফাইনালে জয় নিয়ে পুরনো পরাজয়ের জবাব দিল তারা।

ফাইনালকে ঘিরে শুধু ফুটবল নয়, মাঠে ছিল সাংস্কৃতিক আবহও। খেলা শুরুর আগে দুপুর ২টা থেকে শুরু হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ধলাই বিধানসভা এলাকার বিভিন্ন প্রান্তের শিল্পীরা এতে অংশ নেন। মণিপুরী, বর্মন, খাসি ও বাঙালি সম্প্রদায়ের নৃত্যশিল্পীদের পরিবেশনায় প্রায় এক ঘণ্টা ধরে চলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন শিলচরের সাংসদ পরিমল শুক্লবৈদ্য, রাজ্যসভার সদস্য কণাদ পুরকায়স্থ, ধলাইয় বিধায়ক অমিয়কান্তি দাশ, প্রাক্তন বিধায়ক নীহাররঞ্জন দাস, কাছাড় জেলা বিজেপির সভাপতি রূপম সাহা, জেলা পরিষদ সদস্যা পম্পি নাথ চৌধুরী, শিক্ষাবিদ পিনাক চক্রবর্তী, শশাঙ্কচন্দ্র পাল, ভূষণ পাল, পৃথীশ চন্দ্র দাসসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে সাংসদ পরিমল শুক্লবৈদ্য বিজয়ী ও রানার্স-আপ দুই দলকেই অভিনন্দন জানান। খেলাধুলার তাৎপর্য তুলে ধরে তিনি বলেন, “ইয়ে খেল খেল কেয়া জিস মে হার নেহি, ইয়ে জিন্দেগি জিন্দেগি কিয়া জিসমে গাম নেহি।” এদিন সাংসদ কণাদ পুরকায়স্থ বিএনএমপি স্কুলের খেলার মাঠের উন্নয়নে তাঁর সাংসদ এলাকা উন্নয়ন তহবিল থেকে ২০ লক্ষ টাকা দেওয়ার ঘোষণা করেন।

পুরস্কার বিতরণীর প্রধান আকর্ষণ ছিল চ্যাম্পিয়ন জামালপুর এফসির হাতে সুশান্তরঞ্জন দত্ত স্মৃতি ট্রফি এবং ৬০ হাজার টাকার পুরস্কারের চেক তুলে দেওয়া। রানার্স-আপ ইসলামাবাদ এফসি পায় স্বপন কুমার বর্মণ স্মৃতি ট্রফি ও ৪০ হাজার টাকার পুরস্কারের চেক। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন মাতৃভূমির সভাপতি সিতাংশু দাস। জমজমাট ফাইনালের মধ্য দিয়ে পর্দা নামে ২০২৬ সালের মাতৃভূমি কাপের। তবে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করা দুই দলের পারফরম্যান্স এবং হাজার হাজার দর্শকের উচ্ছ্বাসে এবারের আসর ধলাইয়ের ক্রীড়াঙ্গনে রেখে গেল স্মরণীয় এক অধ্যায়। ম্যাচ পরিচালনা করেন শামিম আহমদ বড়ভূইয়া, কমরুজ্জামান লস্কর, ইজাজ হোসেন লস্কর, প্রবীণ বর্মণ ও সিদ্দিক আলম। গোটা অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন কমলেশ দাশ।



