২৭ মে : প্রতি বছর ঈদ-উল আজহা বা কোরবানির ঈদে বিভিন্ন মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ গরু, ছাগল, মহিষ, উটসহ বিভিন্ন ধরনের পশু কোরবানি দিয়ে থাকেন। ঈদের দিন সকালে কোরবানির পশু জবাইয়ের পর মাংস কাটাসহ সেগুলো ভাগ এবং বণ্টন করে থাকেন কোরবানি দাতারা।
এই কোরবানির মাংস বণ্টন করা নিয়েও নানা ধরনের মতবাদ প্রচলিত রয়েছে বিভিন্ন দেশে। কেউ কেউ বলে থাকেন কোরবানির পশুর মাংস তিনটি ভাগে ভাগ করা উচিত।
তাদের ব্যাখ্য এই মাংসের একভাগ কোরবানি-দাতা নিজে রাখবেন, একভাগ আত্নীয় স্বজনকে দিবেন এবং বাকি একভাগ গরীব বা মিসকিনদের মাঝে বণ্টন করবেন।
কোরবানির মাংসের তিন ভাগ নিয়ে এই আলোচনা বহু পুরনো। আলেম সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, কোরবানির মাংসের তিনভাগ বণ্টন কোরআন হাদিস দ্বারা সমর্থিত। তবে, এটি কোনভাবেই বাধ্যতামূলক নয়।
বাংলাদেশের ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পরিচালক মুফতি আনিসুর রহমান সিকদার বলছেন, কোরবানির মাংস কেউ যদি চায় সে পুরোটাই নিজে খেতে পারে আবার চাইলে সবটুকু দান করে দিতে পারে
সাধারণত গরু-মহিষের মতো বড় পশুর ক্ষেত্রে অনেকেই সর্বোচ্চ সাত ভাগে কোরবানি দিয়ে থাকেন।
তবে, বিভিন্ন জায়গায় কোরবানির মাংস বণ্টনের ক্ষেত্রে একটি নিয়ম প্রচলিত রয়েছে। গ্রামে গঞ্জে পশু কোরবানির পর ‘সামাজিক ভাগ’ নামে একটি ভাগ করে রাখেন অনেকে।
এই রীতি অনুযায়ী, সামর্থ্যবানরা তাদের কোরবানির মাংসের একটা নির্দিষ্ট অংশ সমাজের কল্যাণ তহবিল বা অভাবী মানুষের জন্য দান করেন।
তবে মুফতি ও আলেম সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন- কোরবানির মাংসের এই ধরনের ভাগ কোনভাবেই বাধ্যতামূলক করা যাবে না।
ধর্মগ্রন্থ কোরানে বলা আছে, কোরবানির পশুর রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না, এর মাংসও না, বরং তাঁর কাছে যা পৌঁছায়, তা হলো তোমাদের তাকওয়া বা ধর্মনিষ্ঠা।
যে কারণে কোরান ও হাদিসের ব্যাখ্যা দিয়ে ধর্মীয় পণ্ডিতগন বলছেন, মূলত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যই পশু কোরবানি দেওয়া সামর্থবান মানুষের জন্য ওয়াজিব বা বাধ্যতামূলক।
কোরবানি দেওয়া অবশ্য পালনীয় ইবাদত এটি কোরান ও হাদিস দ্বারা স্বীকৃত। তবে কোরবানির মাংস বণ্টন নিয়ে আমাদের সমাজে নানা ধরনের মতবাদ বহু পুরনো।
কোরবানির মাংস প্রসঙ্গে ধর্মগ্রন্থ কোরআনের সুরা হজে বলা হয়েছে, তোমরা তা থেকে (কোরবানির মাংস) থেকে খাও এবং মানুষদের খাওয়াও, মানুষের কাছে হাত পাতে না এমন অভাবীদের এবং চেয়ে বেড়ায় এমন অভাবীদের।
ধর্মীয় গবেষক ও আলেমরা বলছেন, নবী মুহাম্মদ কোরবানির মাংস এক ভাগ নিজের পরিবারকে খাওয়াতেন। এক ভাগ গরিব প্রতিবেশীদের দিতেন আর এক ভাগ গরিব-মিসকিনদের দিতেন।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পরিচালক মুফতি আনিসুর রহমান সিকদার বিবিসি বাংলা-কে বলেন, “কোরান ও হাদিসের বিভিন্ন জায়গা ভাগ বা বণ্টনের ক্ষেত্রে তিনভাগের বিষয়টি এসেছে। এবং ভাগের ক্ষেত্রে তিনভাগ করার বিষয়ে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে”।
তার মতে, এক্ষেত্রে শুধু কোরবানির পশুর মাংস নয় ইসলামের বিধান অনুযায়ী, অন্য অনেক কিছুতেই তিনভাগের বিষয়টি এসেছে।
ইসলামি লেখক ও গবেষক শরিফ মুহাম্মদ বিবিসি বাংলা-কে বলছিলেন, “ইসলাম ধর্মের যে বড় দুইটি উৎসব রয়েছে এই দুইটি উৎসবেই গরীবদের খুশি করার উপলক্ষ রয়েছে। সেটি যেমন ঈদ-উল ফিতরে রয়েছে, তেমনি ঈদ-উল আজহাও রয়েছে”।
“রোজার ঈদে গরীবদের ফিতরা দেয়। আর কোরবানির ঈদে মাংসও বিতরণ করা হয়। তবে ফিতরা যেমন সচ্ছল মানুষের ক্ষেত্রে না দিলে গুনাহ হবে তবে কোরবানির মাংসের ক্ষেত্রে বিষয়টি এমন না”, যোগ করেন তিনি।
অর্থাৎ ধর্মীয় স্কলারদের মতে, কোরবানির ঈদে গরীবদের উৎসবে সামিল করার একটি উপলক্ষ কোরবানির মাংস বিতরণ।
কোরবানির দিন মাংস কাটার সময়ও অনেক সময় গরীব কিংবা ভিক্ষুকদের পক্ষ থেকে মাংস সংগ্রহ করতে আসতে দেখা যায়। মাংস ভাগ বা বণ্টনের আগে অনেকেই গরীবদের মাংস দিয়েও থাকেন।
ধর্মীয় গবেষক ও মুফতিরা কোরআন-হাদিসের ব্যাখ্যা দিয়ে বলছেন, কোরবানির মাংস তিন ভাগ করে এক অংশ সদকা করা, এক অংশ আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও দরিদ্র প্রতিবেশীদের দেওয়া আর এক অংশ নিজের জন্য রাখা মুস্তাহাব বা উত্তম।
তবে, এটা কোনও জরুরি বা আবশ্যক আমল নয়। যে কারণে মাংসের তিনভাগ করাকে তারা বাধ্যতামূলক মনে করেন না।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পরিচালক আনিসুজ্জামান সিকদার বলছিলেন, “তিনভাগ করা কোরান হাদিস সমর্থিত। তবে কোরবানির মাংস তিনভাগের একভাগ বণ্টনের ক্ষেত্রে এমন কোন রেওয়াত নাই যে এটা করতেই হবে”।
“তিনভাগ হাদিস কোরবান দ্বারা সমর্থিত, তবে এটাকে ইসলামের কোথাও বাধ্যতামূলক করা হয়নি, এটা জরুরি না”, যোগ করেন তিনি।
ইসলামিক গবেষকরা বলেছেন, নবী মুহাম্মদ এবং তার অনুসারী বা সাহাবারা কোরবানির মাংস বণ্টনের ক্ষেত্রে তিনটি ভাগ করেছেন।
লেখক শরিফ মুহাম্মদ বলছিলেন, “কোরবানির মাংসের তিনভাগের ক্ষেত্রে সামাজিক গুরুত্ব অনেক, তবে এবাদতগত স্তর বিন্যাসে ফরজ, ওয়াজিব বা সুন্নতে মোয়াক্কাদা ধরনের আমল না”।
যে কারণে কোরবানির মাংস বণ্টনের ক্ষেত্রে তিনভাগের বিষয়টিকে অবশ্যই পালনীয় বা বাধ্যতামূলক হিসেবে দেখছেন না তারা।
মুফতি সিকদার বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, “মাংসের তিনভাগ হাদিস কোরবান দ্বারা সমর্থিত হলেও বাধ্যতামূলক না। কেউ যদি চায় সবটুকু মাংস নিজেই খেতে পারবে। আর কেউ যদি চায় পুরোটা দানও করে দিতে পারবে”।
খবর : বিবিসি বাংলা।



