ইজরায়েলের রাজনীতিতে পালাবদলের ইঙ্গিত: ক্ষমতাচ্যুত হবেন নেতানিয়াহু, নতুন জোটের দৌড়ে এগিয়ে আইজেনকোট

Spread the news

৫ নভেম্বর : ইজরায়েলের ২৭ অক্টোবরের সাধারণ নির্বাচন দেশটিকে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড় করিয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে স্থিতিশীলতার প্রত্যাশা থাকলেও, নির্বাচনের ফলাফলে কোনও ব্লকই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্থাৎ ৬১টি আসন জোগাড় করতে পারেনি। একদিকে গাদি আইজেনকোটের (Gadi Eisenkot) নেতৃত্বে বিরোধীরা ‘জাতীয় জরুরি সরকার’ গঠনের ডাক দিয়েছেন, অন্যদিকে দীর্ঘ তিন দশকের বিশ্বস্ত বন্ধুর সমর্থন হারিয়ে বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু (Benjamin Netanyahu) ক্ষমতা ধরে রাখার লড়াইয়ে চরম চাপে পড়েছেন।

১২০ আসনের নেসেট বা ইজরায়েলের সংসদে বর্তমান সমীকরণ অত্যন্ত জটিল।নেতানিয়াহুর ডানপন্থী ব্লকের হাতে রয়েছে ৫৩টি আসন। ইহুদি বিরোদী দলগুলোর হাতে ৪৮টি আসন। আর আরব দলগুলোর কাছে আছে (Joint List ও Ra’am) ১৯টি আসন, যা গতবারের চেয়ে অনেক বেশি।

এই পরিসংখ্যানে স্পষ্ট, বিরোধী ৪৮ এবং আরব দলগুলোর ১৯টি আসন মেলালে মোট আসন সংখ্যা দাঁড়ায় ৬৭, যা সংখ্যাগরিষ্ঠতার চেয়ে অনেকটাই বেশি। তবে আরব দলগুলোর সঙ্গে মিলে সরকার গঠনের কোনও আনুষ্ঠানিক চুক্তি এখনও কোনও পক্ষেরই হয়নি।

ধারণা, এই পিঠটানের নেপথ্যে রয়েছে ‘মিলিটারি সার্ভিস’ নিয়ে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব। ইউটিজে চায় তাদের ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের (Torah students) মিলিটারি সার্ভিস থেকে স্থায়ীভাবে অব্যাহতি দেওয়া হোক এবং তা আইনে পরিণত করা হোক। গাজা, লেবানন ও ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে সাধারণ ইজরায়েলিরা যখন বারবার ফ্রন্টলাইনে যাচ্ছেন, তখন এই অব্যাহতি নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক জনরোষ তৈরি হয়েছে। নেতানিয়াহু এতদিন এই ছাড় বজায় রাখলেও, প্রবল চাপের মুখে আইনি স্বীকৃতি দিতে পারেননি। ইউটিজে তাই নেতানিয়াহুর ওপর চাপ বাড়াতেই এই কৌশল নিয়েছে। তারা অবশ্য বিরোধী নেতা আইজেনকোটকেও সমর্থন করেনি।

নেতানিয়াহুর জোট যখন ভাঙনের মুখে, বিরোধীরা তখন ঐক্যবদ্ধ। সম্প্রতি হার্জলিয়ায় এক বৈঠকে গাদি আইজেনকোট, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট (Naftali Bennett), ইয়ার ল্যাপিড, এবং ইয়ার গোলানের মতো শীর্ষ বিরোধী নেতারা একজোট হয়ে আইজেনকোটকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সমর্থন জানিয়েছেন।

আইজেনকোট একটি ‘জাতীয় জরুরি সরকার’ গঠনের ডাক দিয়েছেন। তার নীতি স্পষ্ট, ইজরায়েলকে একটি গণতান্ত্রিক, উদার ও সমতাভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে শক্তিশালী করা, সবার জন্য (ধর্মীয় শিক্ষার্থী-সহ) মিলিটারিতে যোগদান বাধ্যতামূলক করা এবং হামাসকে নির্মূল করা।

নেতানিয়াহুর দক্ষিণপন্থী সরকারের ওপর ক্ষোভের কারণে এবার ইজরায়েলি আরব দলগুলো অভূতপূর্ব সাফল্য পেয়েছে। জয়েন্ট লিস্ট (Joint List) এবং রাম (Ra’am) সম্মিলিতভাবে ১৯টি আসন নিয়ে এখন সরকার গঠনের মূল কারিগর। জয়েন্ট লিস্ট ইতিমধ্যে ডেমোক্র্যাট নেতা ইয়ার গোলানের সঙ্গে আলাদা বৈঠক করে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করার বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হয়েছে।

অভ্যন্তরীণ সংকটের মাঝেই আন্তর্জাতিক চাপও বেড়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইজরায়েলকে দেওয়া বার্ষিক প্রায় ৩.৮ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা বন্ধের ঘোষণা করেছেন। এই খবর ইজরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রক ও অর্থমন্ত্রক জানতই না। আইজেনকোট এই ঘটনার জন্য নেতানিয়াহুর কড়া সমালোচনা করে বলেছেন, দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর এই তথ্য মিডিয়ার কাছ থেকে প্রথম জানতে পারা এটাই  প্রমাণ করে যে, নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব দেশের জন্য ঠিক কতটা বিপজ্জনক।

প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজোগ বিভিন্ন দলের সঙ্গে আলোচনা শেষ করেছেন। নিয়ম অনুযায়ী, যার পক্ষে সবচেয়ে বেশি সুপারিশ থাকবে, তাকেই সরকার গঠনের সুযোগ দেওয়া হবে। ম্যান্ডেট পাওয়ার পর সেই প্রার্থী ২৮ দিনের মধ্যে এবং প্রয়োজনে আরও ১৪ দিন সময় নিয়ে জোট সরকার গঠন করবেন।

নেতানিয়াহুর জোট থেকে ইউটিজে সরে দাঁড়ানোয় এবং বিরোধীরা এককাট্টা হওয়ায়, গাদি আইজেনকোটের হাতেই প্রথম সরকার গঠনের সুযোগ আসার সম্ভাবনা প্রবল। তবে আরব দল বা আল্ট্রা-অর্থোডক্সদের পরস্পরবিরোধী শর্ত সামলে তিনি শেষ পর্যন্ত একটি স্থিতিশীল সরকার গঠন করতে পারবেন কি না, ইসরায়েলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন সেটাই নির্ধারণ করবে। যদিও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা, ঘটনা যাই হোক, ইজরায়েলে বিবি-বিসর্জন হয়ে গিয়েছে। তখতে আর থাকছেন না বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু।

নেতানিয়াহুর সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছে নিজের শিবির থেকে। গত পাঁচটি নির্বাচনে তাঁকে একতরফা সমর্থন করে আসা কট্টরপন্থী ইহুদি আল্ট্রা-অর্থোডক্স দল ‘ইউনাইটেড তোরাহ জুদাইজম’ (UTJ) প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজোগের (Isaac Herzog) সঙ্গে বৈঠকে নেতানিয়াহুকে সমর্থন দিতে অস্বীকার করেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *