।। ড. গণেশ নন্দী।।
(অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর, আসাম বিশ্ববিদ্যালয়)
২২ অক্টোবর : নিঃসন্দেহে এ অঞ্চলের এক গৌরবময় অতীত রয়েছে। শিক্ষা-সংস্কৃতি, সাহিত্যে- সব ক্ষেত্রেই এগিয়েছিল পুরনো দিনের শিলচর। তবুও সামাজিক আরোপিত বিধি- নিষেধের জগদ্দল পাথর সরাতে এখানেও মেয়েদের লড়তে হয়েছে। মেয়েরা এটা করতে পারবে, ওটা পারবে না। সব জায়গায় যেতে পারবে না। সবকিছুতে অংশগ্রহণ করতে পারবে না । এমন শতেক শাসন, অনুশাসনের বেড়াজাল। জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে সে জাল ছিন্ন করার উদগ্রীব প্রয়াস বহু প্রগতিশীল পরিবারেও দেখা যায়নি। ভাগ্যিস জ্যোৎস্না চন্দদের মত কিছু মহীয়সী নারীর লড়াইয়ের জোরে পরম্পরার জড়তা থেকে মুক্তি ঘটেছে। আলো দেখেছে এ অঞ্চলের নারী সমাজ। কিন্তু শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতিতে নারীর পদচারণা অনেকটা সাবলীল হলেও শিল্পক্ষেত্রে কাজটা তখনও সহজ হয়নি। শিল্প নিয়ে সামাজিক ঔদাসীন্য একটা বড় ভূমিকা নিয়েছিল। তাই পুরনো দিনে বিক্ষিপ্তভাবে বহু নামি শিল্পী শিলচর সহ বরাক উপত্যকায় কাজ করলেও কোনও প্রতিষ্ঠিত মহিলা শিল্পীর নাম খুঁজে পাওয়া যায় না। প্রাক-স্বাধীনতা যুগে শিলচর শহরে আশালতা সান্যাল এবং বাণী রায়চৌধুরীর মত সম্ভাবনাময় দুই মহিলা শিল্পীকে নিয়ে জোর চর্চা চললেও ডিগ্রি নিয়ে শিল্পকে ক্যারিয়ার বানানোর পথে হাঁটা টা তাদের পক্ষেও সম্ভব হয়নি। এরপর কেটে গেছে কয়েক যুগ। অবশেষে সত্তরের দশকে এসে ভাঙলো সে দেউল। স্রোতের উল্টো দিকে চলা শুরু করে কবিগুরুর কলা ভবনে এসে পা রাখল এক মেয়ে। দাপটের সঙ্গে নিল ডিগ্রিও। হয়তো শিল্পী দাদার হাত ধরেই তার যাত্রা, তবু ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে কথাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তিনিই হচ্ছেন বরাকের প্রথম মহিলা ভাস্কর জয়ন্তী ঘোষ। হয়তো আজকের শিল্প প্রজন্মের কাছে এটা বিস্মৃত প্রায় নাম। তবু এক সময়ে দেশের নামিদামি বহু শিল্পীর সঙ্গে তার কাজের প্রদর্শনী হয়েছে। কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়ে শিল্প-শিক্ষকের চাকরিতে পেয়েছেন সম্মান ও সর্বভারতীয় স্বীকৃতি। তবে সবশেষে পরিচিত মাত্রেই জানেন, শুধু শিল্পী নন, একজন মহিলার জীবনের সব দায়- দায়িত্ব সামাল দেওয়া, প্রথা ও প্রতিবন্ধকতা ভাঙ্গা সামগ্রীক এক সংগ্রামের নামই হচ্ছে জয়ন্তী ঘোষ।

জন্ম ১৯৪৯ সালে পূর্ববঙ্গের কুলাউড়ায়। বাবা গিরিন্দ্র কুমার ঘোষ এবং মা কুমুদিনী দেবী। সাত ভাই, তিন বোনের মধ্যে দ্বিতীয় সন্তান ছিলেন জয়ন্তী। সব বড় ভাই হচ্ছেন কিংবদন্তি ভাস্কর সুষেণ ঘোষ। অবশ্য দেশভাগ তখনও হয়নি। কাঁটাতারের ক্ষতও কারও মনে তৈরি হয়নি। একই দেশের একই অঙ্গনস্বরূপ ছিল সিলেট- শিলচর। অনেকেরই বাড়ি- ঘর, ব্যবসা দুই জায়গায় ছড়িয়েছিল। সিলেটের কুলাউড়ার যথেষ্ট সচ্ছল পরিবার ছিল গিরিন্দ্র ঘোষদের। প্রচুর জমিজমা গবাদি পশু সহ সুদৃশ্য কাঠের বাড়ি ছিল। গিরিন্দ্র ঘোষদের শিলচর তুলাপট্টিতে ছিল মিষ্টির ব্যবসা। দেশভাগের বহু আগে থেকেই তুলাপট্টিতে তাদের বসতবাটি ছিল। গিরিন্দ্র ঘোষ সিলেট থেকে আসা যাওয়া করতেন। আর এখানে তুলাপট্টির মিষ্টির ব্যবসা সামলাতেন ছোট ভাই হরেন্দ্র কুমার ঘোষ। তবে পড়াশুনার সুবিধার্থে সুষেণ, জয়ন্তী সহ সব ভাইবোনই শিলচর চলে আসেন। বেশভাগের বেশ কিছু পর চলে আসেন গিরিন্দ্র ঘোষও। জয়ন্তীদের সবারই পড়াশোনা শিলচর অভয়াচরণ পাঠশালায়। জয়ন্তীর মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশুনা মালুগ্রাম হাইস্কুলে। কলা বিভাগে উচ্চমাধ্যমিক কাছাড় কলেজে। এরপর ডিগ্রি পাস করেন গুয়াহাটির পান্ডু কলেজ থেকে।
আসলে দেশভাগ শুধু ভৌগোলিক মানচিত্রে বিভাজনের রেখা আঁকেনি, অর্থনৈতিক চিত্রেও মারাত্মক ছায়া বিস্তার করেছিল। দেশভাগ দুপারের মানুষের কাউকে করেছে ধনী, আবার কাউকে করেছে গরিবও। জয়ন্তীরা সব ভাইবোন শিলচরে থাকলেও বাবা-মা সিলেটেই ছিলে। ওপারে সচ্ছলতায় ভাঁটা পড়ল, টান পড়লো শিলচরের ব্যবসায়ও। কাকা হরেন্দ্র কুমার ঘোষও আর পেরে উঠছিলেন না। তবে বাড়িতে পড়াশোনার পরিবেশ ছিল। সবাই পড়াশোনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ব্যবসায়িক পরিবারে স্বাভাবিকভাবেই সে সময় শিল্পের জন্য কোনও অনুকূল পরিবেশ ছিল না। কিন্তু পড়াশোনা, জ্ঞানার্জনের সুবাদে সৃজন ভাবনা অনেকের মধ্যেই ছিল। এখানে নরসিং স্কুলের শিল্প সহায়ক পরিবেশ, দুই গুণী শিক্ষক গিরিন্দ্রমোহন নাথ এবং লালমোহন নাথের সান্নিধ্য, পাশাপাশি পুরনো শিলচরে নাটককে ঘিরে সৃজনশীল উন্মাদনায় অনুপ্রাণিত হয়ে শিল্পপথের পথিক হলেন পরিবারের সব বড় ছেলে সুষেণ ঘোষ। পাড়ি দিলেন শান্তিনিকেতনে। পরে দেশজোড়া খ্যাতি কুড়িয়েছেন ভাস্কর হিসেবে। শান্তিনিকেতনে ডিগ্রি নিয়ে মাত্র ২৩ বছর বয়সে কলাভবনে ভাস্কর্যের অধ্যাপক হন সুষেণ। মন্দার দিনে একান্নবর্তি বিশাল পরিবারের দায় সামলে নিলেন জয়ন্তীদের মেজদা রসেন্দ্র কুমার ঘোষ। যথেষ্ট মেধাবী হওয়া সত্বেও পড়াশোনা ছেড়ে তিনি সংসারের হাল ধরেন। আর চাকরি পাওয়ার পর সুষেণ নিজেও নিয়মিত সাহায্য করে গেছেন। কিন্তু রসেন্দ্র কুমার ঘোষ অল্প বয়সে মারা যাওয়ায় জয়ন্তীই হয়ে ওঠেন পরিবারের রক্ষাকর্ত্রী। নিজে মাধ্যমিক পাস করার পর কাছাড় কলেজে ভর্তি হন। পড়াশুনার পাশাপাশি টিউশন করেছেন। এরপর উচ্চশিক্ষার বিশেষ সুবিধার কথা ভেবে চলে যান গুয়াহাটিতে পিসির বাড়িতে। সেখানে পান্ডু কলেজে স্নাতক ডিগ্রি নেন। ছোট ভাই সমরেন্দ্র কুমার ঘোষও পান্ডু কলেজে পড়াশোনা করে পরে আয়কর বিভাগের উচ্চ পদে চাকরি করেন।

স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে ফের শিলচর চলে আসেন জয়ন্তী। এসে এ আর এক নতুন লড়াই। চাকরির সন্ধান চলল, কিন্তু চাকরি নেই। টিউশন করেছেন। যেখানে চাকরির বিজ্ঞাপন দেখেছেন আবেদন করেছেন। বহু ভেঞ্চার স্কুলেও কাজ করেছেন যেখানে মালুগ্রাম সর্বোদয় স্কুলও ছিল। পরিবার সামলে, সব ঝক্কি নিয়ে আবার ভবিষ্যতের খোঁজ- এক বিরাট সংগ্রামের মধ্য দিয়ে চলছিলেন জয়ন্তী। বয়স তরতরিয়ে যাচ্ছিল, চেপে ধরেছিল একরাশ হতাশাও। ওই সময়েই এলো জীবনে নাটকীয় মোড় । বড় ভাই সুষেণ ঘোষ বাড়িতে এসে সব প্রত্যক্ষ করে ভাবলেন, এখানে কিছু এমন যখন হচ্ছে না তাহলে জয়ন্তীকে নিয়ে শান্তিনিকেতন যাই। যদি সেখানে শিল্পশিক্ষার জন্য ভর্তি করানো যায় তাহলে কিছু একটা হলে হতেও পারে । নতুন পরিবেশে কাটবে হতাশাও। ১৯৭২ সালে দাদার সঙ্গী হয়ে শান্তিনিকেতন পাড়ি দিলেন জয়ন্তী।
তবে ভর্তি হতে তেমন বেগ পেতে হলো না। কিভাবে কাজটা সহজ হলো সেটা একটু বিশ্লেষণের বিষয়। পুরোনো দিনে সামাজিক কাঠামো এমন ছিল যে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায়ই মেয়েরা সেলাই, ঘর গেরস্থালির কাজে সড়গড় হয়ে পড়তেন। সেলাইয়ের প্রয়োজনে ড্রয়িংয়ের অনুশীলন হয়ে যেত। একই কারণে অজ্ঞাতসারেই জয়ন্তী ঘোষ সেলাই, বাঁধাই সহ মেয়েদের সৃজনশীল প্রতিটি কাজেই প্রচণ্ড দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। সেলাইয়ে নতুন নতুন ডিজাইন তৈরি বা পাটের রকমারি হস্তশিল্পে ছিল আলাদা ঝোঁক। সে সবই তার প্রথাগত শিল্পশিক্ষার ভিতটা গড়ে দিল। ভর্তির জন্য প্রাথমিক অনুশীলনের পথটা দেখিয়ে দিলেন দাদা সুষেণ ঘোষই।
১৯৭৩ সালে কলা ভবনে ভর্তি হলেন জয়ন্তী। পড়ে রইলো সব পিছুটান। এক অনাবিষ্কৃত জগতের সন্ধান পেলেন। যাত্রা শুরু করলেন পরম নিবিষ্ঠতায়। শান্তিনিকেতনের শিল্প সহায়ক পরিবেশ ঠিক করে দিল তার পথ দিশা । তাছাড়া জয়ন্তী সেখানে সোমনাথ হোড়, শর্বরী রায় চৌধুরী, সনৎ কর, সুখময় মিত্র, সুখেন গাঙ্গুলী, সুহাস রায় সহ বহু গুণী শিক্ষকের সান্নিধ্য পেয়েছেন। পেয়েছেন শিক্ষক হিসেবে দীনকর কৌশিককেও। সামনে থেকে দেখেছেন আধুনিক ভাস্কর্যের জনক রামকিঙ্কর বেইজকে। এর বাইরে কবিগুরুর স্নেহধন্য শান্তিনিকেতনে নিয়মিত আসা দেশ-বিদেশের বহু খ্যাতনামা শিল্পীকে দেখা ও তাদের কাজের সঙ্গে পরিচিত হবার বিরল সুযোগ পেয়েছিলেন জয়ন্তী। তার সৃজন প্রতিভার পূর্ণবিকাশ ঘটলো । সাফল্যের সঙ্গে ভাস্কর্যের ডিগ্রি নিলেন ১৯৭৮ সালে। বরাকের প্রথম মহিলা ভাস্কর হিসেবে ইতিহাসে নাম লেখালেন । সঙ্গে শিল্পের টানে এ অঞ্চল থেকে মেয়েদের বাইরে যাওয়ার জন্য বুকে বলটা জোগাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিল তার এই ডিগ্রি অর্জন।

ডিগ্রিনেবার পর এবার ঘরে ফেরার পালা। কিন্তু সেদিনের হতাশার শিলচর কিছু তাকে দিতে পারেনি। শিল্পের পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য লড়ছিলেন মুকুন্দ দেবনাথ, আলি বখস্ মজুমদার, স্বপ্নেশ চৌধুরী, ধীরেশ পালের মত শিল্পীরা। ৬৭ সালে কলাভবন থেকে ভাস্কর্যের ডিগ্রি নিয়ে ফেরা মুকুন্দ দেবনাথের সঙ্গে সুষেণ ঘোষের সুবাদে জয়ন্তীর আগে থেকেই পরিচয় ছিল। এমনকি জয়ন্তীর কলাভবনে যাবার পিছনেও মুকুন্দ দেবনাথের একটা বড় ভূমিকা ছিল বলে জানা যায়। কারণ মুকুন্দ বারবার চাইছিলেন এ অঞ্চল থেকে শিল্প শিক্ষার জন্য ছেলেমেয়েরা যেন বাইরে যায়। যদিও তার এই প্রয়াস বৃথা যায়নি। তাঁর যোগানো ভরসায় এবং দেখানো পথে রামলাল ধর, বিমলেন্দু সিনহা, আকমল হোসেন সহ কত শিল্পী বাইরে গিয়ে শিল্পশিক্ষা নিয়ে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন তা গুনে শেষ করা মুশকিল। জয়ন্তী যখন শিলচর ফিরেছেন মুকুন্দ দেবনাথ তখন গড়ে তুলেছেন ফাইন আর্টস অ্যাকাডেমি যেটা এ অঞ্চলের প্রথম সফল শিল্প শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণ্য হয়। মুকুন্দের প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে ফাইন আর্টস অ্যাকাডেমিতে ছাত্রদের শিল্পতত্ত্ব পড়ানোর কাজটা শুরু করেন জয়ন্তী। পাশাপাশি ড্রয়িংটাও দেখাতেন। সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় সরকারি চাকরির জন্য আবেদন চালিয়ে যাচ্ছিলেন। প্রায় চার বছর অ্যাকাডেমিতে শিক্ষকতা সহ সব কাজে সক্রিয় ছিলেন জয়ন্তী। ফাইন আর্টস অ্যাকাডেমি আয়োজিত বিখ্যাত ‘ভূষণ্ডির মাঠে’ নাটকের সাজসজ্জার কাজও করেছেন তিনি।

এরই মধ্যে ভাগ্য সদয় হল। ১৯৮১ সালে কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়ে শিল্প শিক্ষকের চাকরি পেয়ে গেলেন জয়ন্তী। প্রথম নিযুক্তি মাছিমপুর কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়ে । এরপর চাবুয়া কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়, ডিনজান কেন্দ্রীয় বিদ্যালয় হয়ে ২০০৯ সালে শিলচর তারাপুর কেন্দ্রীয় বিদ্যালয় থেকে সসম্মানে অবসর গ্রহণ করেন। দীর্ঘ ২৮ বছরের ছিল চাকরিজীবন। অবশ্য চাকরি পাওয়ায় আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্ পেলেও জীবনের লড়াইটা কিন্তু অব্যাহত ছিল জয়ন্তীর।। পরিবারের বড় মেয়ে হিসেবে অভিভাবক সুলভ দায়িত্ব তার উপরই বর্তে ছিল। এই দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে কোনও কিছুই জীবনের স্বাভাবিক নিয়মে হয়নি তার। পড়াশোনায় বয়স অনেকটা চলে গিয়েছিল, চাকরি খুঁজতেও চলে গেল অনেকটা সময়। আবার জয়ন্তীদের সময় মেয়েদের বিয়েটা একটু আগেভাগেই দেবার সামাজিক প্রথা ছিল। সে তুলনায় বিয়ের ক্ষেত্রেও বিলম্ব হয়েছে। যদিও এ ব্যাপারে অনেকটাই উদাসী ছিলেন তিনি। পরিবার, পড়াশোনা, চাকরি সামলে নিজেকে ভাবার খুব একটা অবকাশ জোটেনি। হয়তো মনে মনে একাকী জীবনকে নিয়েই চলার কথা ভেবে নিয়েছিলেন। পরে অনেকের চাপাচাপিতে শিলচরের সুপরিচিত পরিবারের ছেলে নিরঞ্জন পাল চৌধুরীর সঙ্গে বিয়ে হয়। যদিও বিয়ে নিয়ে কোনও আড়ম্বরতার দিকে যাননি জয়ন্তী বা নিরঞ্জন। শিলচর দূরদর্শনের কোয়ার্টারে থাকতেন তখন নিরঞ্জনরা। দুর্ভাগ্যবশত বিবাহিত জীবন ও খুব একটা দীর্ঘ হয়নি জয়ন্তীর। ১৯৯৭ সালে আকস্মিকভাবে প্রয়াত হন নিরঞ্জন। ক্ষণিকের যৌথ পদচারণা শেষে আবার সেই একলা জীবন। আবার পারিবারিক দায়িত্বে জড়িয়ে পড়া। পিতৃহারা ভাইপোদের মানুষ করাই জীবনের লক্ষ্য করে নিলেন জয়ন্তী। সুষেণ ঘোষ শান্তিনিকেতনে নিজের সৃজনজগৎ নিয়ে ব্যস্ত। তাই বাবার বাড়ির সব দায়িত্বই জয়ন্তীর উপরে পড়ে। শুধু আর্থিক নয়, শাসনে- অনুশাসনে, মমতায় নিজের আঁচল দিয়ে সবাইকে ঘিরে রাখেন জয়ন্তী। সঙ্গে যোগ হয় শ্বশুরবাড়ির বিভিন্ন দায়িত্বও। শিলচর রংপুরে বাড়ি তৈরি করে সবাইকে নিয়ে থাকতেন জয়ন্তী। ছায়াসঙ্গী ছিলেন অবিবাহিত ছোট বোন সাবিত্রী ঘোষ। আবার ছোট ভাই গোবিন্দ ঘোষের পরিবারের জন্য আলাদাভাবে ওই বাড়িতেই সব বন্দোবস্তও করে দিয়েছিলেন তিনি।
তবে বলতে দ্বিধা নেই শিক্ষকতার চাপ এবং সাংসারিক দায়- দায়িত্ব সামলাতে সামলাতে নিজের সৃষ্টি জগৎ থেকে ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছিলেন জয়ন্তী তা নিজেও টের পাননি। তাই যতটা সম্ভাবনা ছিল বিকাশের পথে ততটা হাঁটতে তাকে দেখা যায়নি। একসময় নিজেই যেন আড়ষ্টতার সঙ্গে নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করেছিলেন। না হলে ছাত্রাবস্থায় তিনি বহু প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেছেন। এমনকি কলকাতায় নন্দলাল বসু, রামকিঙ্কর বেইজ, গোপাল ঘোষ, কেজি সুব্রম্মনিয়ান, সুষেণ ঘোষ, শর্বরী রায় চৌধুরী, সোমনাথ হোড়ের মত কিংবদন্তী শিল্পীদের কাজের সঙ্গেও তার ভাস্কর্যের প্রদর্শনী হয়েছে।
রিয়ালিস্টিক এবং বিমুর্ত দু ধরনের কাজেই তিনি সড়গড় ছিলেন। রিয়ালিস্টিক ভাস্কর্যে রামকিঙ্কর বেইজের কাজের বলিষ্ঠতা ও ছন্দময়তার ছাপ ছিল। তাছাড়া টেরাকোটায় গুরুত্ব পেয়েছে লোক আঙ্গিক। দাদা সুষেণ ঘোষের মতোই বিশ্বাস করতেন লোক শিল্পই সব শিল্পের ভিত্তি। অসাধারণ প্রতিকৃতিও করতে পারতেন জয়ন্তী। টেরাকোটা, সিমেন্ট, প্লাস্টার, উড, মেটাল সব মাধ্যমেই স্বচ্ছন্দ্ ছিলেন। তবে বিশেষ পছন্দের ছিল ম্যুরাল। টেরাকোটা ম্যুরাল নিয়ে বেশ কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষাও করেছেন। তার ম্যুরাল মূলত ফিগারেটিভই ছিল। তবে ম্যুরাল গুলোতে লোক আঙ্গিকের সরলীকৃত রূপকেই তিনি সবসময় গুরুত্ব দিয়েছেন। সঙ্গে সাঁওতাল জীবনের আদিমতা, বলিষ্ঠতাও তার কাজে বিশেষ ভাবে যেন স্থান করে নিয়েছিল। সেই প্রভাবটা শান্তিনিকেতন ছাড়ার পরও তিনি পরিহার করতে পারেননি। বিভিন্ন মাধ্যমে অসংখ্য ভাস্কর্য তিনি করেছেন। তবে সংরক্ষণ নিয়ে খুব একটা সচেতন ছিলেন না। যার জন্য সেগুলোর বেশিরভাগেরই আজ আর খোঁজ মিলে না। সামান্য কিছু আছে ছবিতে, আর কিছু রয়েছে তার রংপুরের বাড়িতে। কিন্তু যেটুকু বেঁচে বর্তে আছে সেগুলো জয়ন্তীর উন্নত সৃজন ভাবনা ও দক্ষতার পরিচয় বয়ান করে চলছে অবিরত। শিক্ষক জীবনেও প্রচন্ড সক্রিয় ভূমিকায় ছিলেন জয়ন্তী ঘোষ। তার শিক্ষায় শিক্ষিত কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়ের ছাত্ররা সর্বভারতীয় স্তরের চিত্র- ভাস্কর্য প্রতিযোগিতায় কোনদিনও খালি হাতে ফিরেনি। যার জন্য একাধিকবার তিনি সর্বভারতীয় স্তরে সেরা শিক্ষকের সম্মান পেয়েছেন। এছাড়াও সরকারি, বেসরকারি বহু সম্মান ছিল তার ঝুলিতে। পাশাপাশি শিল্প সংক্রান্ত গভীর জ্ঞানের অধিকারী জয়ন্তী ঘোষ এ অঞ্চলে শিল্পের প্রচার- প্রসারের জন্য নিয়মিত কলম ধরতেন। বহু মর্যাদাসম্পন্ন পত্রিকা, ম্যাগাজিনে তাঁর লেখা বেরিয়েছে। পরবর্তীতে শিলচর ফাইন আর্টস অ্যাকাডেমির প্রদর্শনী সহ এ অঞ্চলে বহু প্রদর্শনীতেই তার ছবি, ভাস্কর্য থাকতো। অবসর গ্রহণের পরও বিভিন্ন প্রদর্শনী বা বিভিন্ন অঙ্কন প্রতিযোগিতা, পূজার প্রতিমা নির্বাচনের জন্য ডাক পড়তো। কিন্তু পরের দিকে কোন সে অভিমানে যেন সবকিছু থেকে দূরে সরে যেতে থাকলেন। যেতেন না এসবে। একসময় আমন্ত্রণও কমতে লাগলো। খুব বেশিদিন লাগেনি শিল্পের নবীন প্রজন্মের কাছে অনেকটা অপরিচিত হয়ে গেলেন জয়ন্তী।

এর মধ্যে বয়স এসে কাবু করছিল। শেষ দিকে হৃদজনিত অসুখ বাসা বাঁধলো। করোনার দুঃসহ পরিস্থিতি কাটিয়ে নিলেও ২০২২-এ হঠাৎ করে তার শ্বাসকষ্ট শুরু হল। সঙ্গে সঙ্গে শিলচর মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হয়ে সেবার প্রায় মরার মুখ থেকে বেঁচে ফিরলেন। ওই বছর একাধিক বন্যা শিলচরকে তছনছ করে দিয়েছিল। বন্যার মরশুমে আবার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে শুরু করল জয়ন্তীর। এ যাত্রায় আর রক্ষা করা যায়নি। আত্মীয়, পরিজনদের সব চেষ্টাকে ব্যর্থ করে ২০২২ সালের ২৫ মে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান জয়ন্তী ঘোষ। মৃত্যু কালে বয়স হয়েছিল ৭৩।

হয়তো এই মৃত্যু এ অঞ্চলের স্বাভাবিক জনজীবনে খুব একটা চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেনি। পূর্বসূরীদের প্রতি বরাবর উদাসী বরাকের শিল্প প্রজন্মের এই মৃত্যু নিয়ে ভাবনার তেমন অবকাশ ঘটেনি। হয়নি বড় শোক সভাও। হয়তো পারিবারিক উদ্যোগে দু একটি সংবাদ মাধ্যমে তার মৃত্যু কথা ছেপে বেরিয়েছে। এইটুকুই যা। কিন্তু সম্ভাবনা ছিল অনেক কিছুরই। দক্ষতা বা সৃজন ভাবনার যে স্তরে ছিলেন জয়ন্তী ঘোষ শিলচর ফিরে না আসলে শিল্পের মূল স্রোতে অনায়াসেই তরী বাইতে পারতেন। পেতে পারতেন আরও প্রতিষ্ঠা, প্রতিপত্তি। কিন্তু সেটা আর হলো না। সারা জীবন শুধু দিয়েই গেলেন। ছাত্রদের, পরিবার-পরিজনদের। গোটা জীবনটা একটা অলক্ষ্য লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে চলে গেল। নিজের সৃজন প্রতিভার প্রতিও সুবিচারটা করে যেতে পারেননি। তবে অলক্ষ্য সংগ্রামের মধ্যে লক্ষ্যনীয় যে কাজটা করে গেছেন জয়ন্তী, জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারেই হোক বরাকের শিল্পক্ষেত্রে নারীর আনুষ্ঠানিক পথ চলার সূচনা তাকে দিয়েই হয়েছে। বরাকের শিল্প ইতিহাসে সে কথাটা স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে চিরকাল।



