শ্রীভূমির অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি বরাকবঙ্গের

Spread the news


বরাক তরঙ্গ, ২৬ অক্টোবর : দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে বরাক উপত্যকাসহ গোটা অসম যখন উৎসাহ, উদ্দীপনা ও সম্প্রীতির আবহে শারদোৎসব উদযাপন করেছে, তখন শ্রীভূমিতে সংঘটিত অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাকে ঘিরে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বরাক উপত্যকা বঙ্গ সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলন (বরাকবঙ্গ)। ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। পাশাপাশি, কোনও ধরনের প্ররোচনায় পা না দিয়ে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতার ভিত্তিতে বরাক ও ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার বাঙালি, অসমীয়া-সহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে দীর্ঘদিনের সম্প্রীতির বন্ধন অটুট রাখার জন্য সরকার এবং দুই উপত্যকার শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে তারা।
বরাকবঙ্গের কেন্দ্রীয় মুখপাত্র গৌতমপ্রসাদ দত্ত সোমবার এক বিবৃতিতে গত ২৩ অক্টোবর শ্রীভূমিতে সংঘটিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সংগঠনের অবস্থান স্পষ্ট করেন।

বিবৃতিতে তিনি বলেন, বরাক উপত্যকায় বাঙালি, অসমীয়া-সহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মানুষ পরস্পরের ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে দীর্ঘদিন ধরে প্রীতি ও সৌহার্দ্যের পরিবেশে বসবাস করে আসছেন। বিহু ও ভাটিয়ালি, হারাধন ও রংমন এবং ভূপেন হাজারিকা ও হেমাঙ্গ বিশ্বাসের সাংস্কৃতিক চেতনায় সমৃদ্ধ এই উপত্যকা স্বতন্ত্র শান্তি ও সম্প্রীতির পরিচয় বহন করে চলেছে।

উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন সময়ে জাতিগত ও ধর্মীয় সংঘাতের ঘটনা ঘটলেও বরাক উপত্যকায় কোনও ভাষা, ধর্ম কিংবা সংস্কৃতির অনুসারীরা কখনও নিজেদের বিপন্ন বলে মনে করেননি বলে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, এই শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নষ্ট করার চেষ্টা বিভিন্ন সময়ে হয়েছে। শ্রীভূমির সাম্প্রতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করেও সেই ধরনের তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

গৌতমপ্রসাদ দত্তের অভিযোগ, গত শুক্রবার মধ্যরাতে শ্রীভূমিতে সংঘটিত ঘটনা সম্পর্কে প্রকৃত তথ্য যাচাই না করেই কিছু মহল ঘটনাটিকে অতিরঞ্জিত করে জাতিবিদ্বেষ ছড়ানোর চেষ্টা করছে। এই প্রবণতা শান্তিপ্রিয় মানুষের কাছে গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিবৃতিতে তিনি দাবি করেন, শ্রীভূমির ঘটনায় বিহু গান ও নৃত্য পরিবেশনে কোনও বাধা দেওয়া হয়নি। বরং প্রতিমা নিরঞ্জনের শোভাযাত্রায় বাঙালি ও অসমীয়া জনগোষ্ঠীর তরুণ-তরুণীদের দুই ভাষায় গান গাইতে ও নাচতে দেখা গিয়েছিল।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দশমীর দু’দিন পর গভীর রাতে শোভাযাত্রার আয়োজন করেছিল স্থানীয় ক্লাব হিন্দুস্তান। ওই শোভাযাত্রায় বিহু নৃত্য পরিবেশনের জন্য বদরপুর এলাকার বরগুল ও আদরকোনার অসমীয়া শিল্পীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। শোভাযাত্রায় লাচিত বরফুকনের পাশাপাশি ভূপেন হাজারিকা ও জুবিন গর্গের প্রতিও শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়েছিল বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

বরাকবঙ্গের মুখপাত্র আরও জানান, জেলার পুলিশ সুপার প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে শুক্রবার মধ্যরাতের ঘটনাকে অসমীয়া-বাঙালি সংঘাত হিসেবে বিবেচনা করা যায় না বলে স্পষ্ট করেছেন।

শ্রীভূমিতে প্রতিমা নিরঞ্জনের শোভাযাত্রা কীভাবে শুরু হয়েছিল, শান্তিপূর্ণভাবে শোভাযাত্রা অতিবাহিত হওয়ার পর মধ্যরাতে কার প্ররোচনায় রাজপথে সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল এবং এই ক্ষেত্রে প্রশাসনের নজরদারি কতটা কার্যকর ছিল—তা নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন গৌতমপ্রসাদ দত্ত।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, যেখানে বরাক উপত্যকায় কোনও জাতিগত সংঘাতের পরিবেশ নেই, সেখানে কার স্বার্থে জাতিগত বিপন্নতার প্রচার চালিয়ে উত্তেজনা ছড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে? শান্তি ও সম্প্রীতির স্বার্থেই ঘটনার প্রতিটি দিক পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করা জরুরি বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ঘটনার পর মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার নির্দেশে মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু পাল আদরকোনায় গিয়ে আহতদের সঙ্গে কথা বলেন। হিংসাত্মক ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনও রাজনৈতিক চাপ থাকবে না বলেও তিনি আশ্বাস দিয়েছেন। একই ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন জেলার অভিভাবক মন্ত্রী কৌশিক রায়ও।

বরাকবঙ্গের বক্তব্য, এই প্রতিশ্রুতির নিরপেক্ষ ও কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা জরুরি। ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকের ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
বিবৃতির শেষাংশে বরাকবঙ্গ জানিয়েছে, বরাক উপত্যকার শান্তি ও সম্প্রীতি অক্ষুণ্ণ রাখার পাশাপাশি সামাজিক মাধ্যম-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্ররোচনামূলক বক্তব্যের মাধ্যমে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার নিরাপত্তা ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ যাতে বিঘ্নিত না হয়, তা নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই পরিস্থিতিতে জাতি, ভাষা ও সংস্কৃতির বিভেদ ভুলে রাজ্যের সুশীল সমাজের সব অংশকে এগিয়ে এসে শান্তি, সম্প্রীতি ও পারস্পরিক বিশ্বাসের পরিবেশ বজায় রাখতে কার্যকর ভূমিকা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে বরাক উপত্যকা বঙ্গ সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *