বরাক তরঙ্গ, ১৫ জুন : গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ কলেজগুলিতে চার বছরের স্নাতক ডিগ্রি কোর্স চালুর পর শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা নিয়ে যে অনিশ্চয়তা ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে, তার সমাধানের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রবেশদ্বারের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করল এআইডিএসও-র আসাম রাজ্য কাউন্সিল। আন্দোলনের অংশ হিসেবে সংগঠনের পক্ষ থেকে উপাচার্যের উদ্দেশ্যে একটি স্মারকলিপিও জমা দেওয়া হয়।
এআইডিএসও-র রাজ্য সভাপতি হিল্লোল ভট্টাচার্য, রাজ্য সম্পাদক হেমন্ত পেগু, রাজ্য সহ-সভাপতি পল্লব পেগু এবং রাজ্য কার্যালয় সম্পাদক রূপশ্রী গোস্বামীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার উৎপল শর্মার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। দীর্ঘ আলোচনায় চার বছরের স্নাতক পাঠ্যক্রমের বিভিন্ন সমস্যা ও অসঙ্গতি তুলে ধরা হয়।
সংগঠনের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, প্রয়োজনীয় পরিকাঠামোগত উন্নয়ন ছাড়াই চার বছরের ডিগ্রি কোর্স চালু করায় অধিকাংশ কলেজে চরম বিশৃঙ্খলা ও অব্যবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তাদের বক্তব্য, রাজ্যের বেশিরভাগ কলেজেই শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মচারীদের বহু পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য পড়ে রয়েছে। পর্যাপ্ত শিক্ষক, শ্রেণীকক্ষ এবং গবেষণাগারের অভাবে আগের তিন বছরের স্নাতক পাঠ্যক্রমই সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা কঠিন ছিল, সেখানে নতুন পাঠ্যক্রম কার্যকর করা আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
এআইডিএসও জানায়, মাল্টিডিসিপ্লিনারি কোর্সের নামে শিক্ষার্থীদের মূল বিষয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ বিভিন্ন বিষয় পড়তে বাধ্য করা হচ্ছে, অথচ সেই বিষয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক বা পরিকাঠামো অধিকাংশ কলেজে নেই। এর ফলে শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে এবং মূল বিষয় সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার কলেজগুলিতে শ্রেণীকক্ষের সংকট প্রকট। অনেক ক্ষেত্রে মাত্র একজন বা দু’জন টিউটরের মাধ্যমে পাঠদান চালানো হচ্ছে।
সংগঠনের নেতারা বলেন, সরকার তিন বছর আগেই জানত যে বর্তমান শিক্ষাবর্ষ থেকে স্নাতকের চতুর্থ বর্ষ চালু হবে। তা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগ, শ্রেণীকক্ষ নির্মাণ এবং গবেষণাগার উন্নয়নের মতো মৌলিক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়নি।
রেজিস্ট্রার উৎপল শর্মা প্রতিনিধিদের বক্তব্য শোনার পর জানান, অনার্স উইথ রিসার্চ কোর্স চালানোর জন্য ইউজিসি-র নির্দেশ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট বিভাগে অন্তত দু’জন পিএইচডিধারী শিক্ষক থাকা প্রয়োজন। কিন্তু অধিকাংশ কলেজেই সেই শর্ত পূরণ হয়নি। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় শীঘ্রই পরিকল্পনা গ্রহণের জন্য বৈঠকে বসবে বলে তিনি জানান।
আলোচনায় ফি বৃদ্ধির বিষয়টিও উত্থাপন করা হয়। এআইডিএসও প্রতিনিধিরা বলেন, রাজ্য সরকারের অনুদান কমে যাওয়ায় সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় ফি বৃদ্ধি করতে বাধ্য হয়েছিল, যার বিরুদ্ধে তীব্র ছাত্র আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। এই অবস্থায় বিভিন্ন কলেজে পর্যাপ্ত পিএইচডিধারী শিক্ষক নিয়োগের সম্ভাবনা নিয়েও তারা সন্দেহ প্রকাশ করেন।

প্রতিনিধিদল আরও প্রশ্ন তোলে চার বছরের নতুন পাঠ্যক্রমে ডিগ্রির স্বীকৃতি ও সনদপত্র নিয়ে। তারা জানতে চায়, যারা তৃতীয় বর্ষ শেষে কলেজের পরিকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে চতুর্থ বর্ষে পড়তে পারবে না, তাদের সনদপত্রে মেজর বা অনার্সের উল্লেখ থাকবে কি না। জবাবে রেজিস্ট্রার জানান, গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজগুলিতে তিন বছরের ডিগ্রি সম্পন্নকারী শিক্ষার্থীদের সনদপত্রে অনার্সের উল্লেখ থাকবে।
জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০-এর আলোকে এক বছরের স্নাতকোত্তর পাঠ্যক্রম চালুর বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে এআইডিএসও। সংগঠনের প্রশ্ন, ভবিষ্যতে যদি এক বছরের স্নাতকোত্তর কোর্স ব্যাপকভাবে চালু হয়, তাহলে চার বছরের স্নাতক কোর্স সম্পূর্ণ করতে না পারা শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ কীভাবে নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলির আর্থিক সংকট এবং কলেজগুলিকে বিনামূল্যে ভর্তি প্রকল্পের অনুদান না দেওয়ার ফলে দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কাও তুলে ধরা হয়।
রেজিস্ট্রার জানান, তিন বছরের স্নাতক ডিগ্রি অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের জন্য স্নাতকোত্তর স্তরে পর্যাপ্ত আসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এআইডিএসও-র পক্ষ থেকে একজনও যোগ্য শিক্ষার্থী যাতে ভর্তি থেকে বঞ্চিত না হয়, সেই দাবি জানানো হয়। তিনি বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনার আশ্বাস দেন।
এছাড়া তিনি মত প্রকাশ করেন যে, চূড়ান্ত বর্ষের পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের বেকলগ থাকলেও ন্যূনতম যোগ্যতা পূরণ করলে তারা নিজ নিজ কলেজে চতুর্থ বর্ষে ভর্তি হতে পারবে।
এআইডিএসও স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, শিক্ষার্থীদের স্বার্থে উত্থাপিত দাবিগুলি দ্রুত কার্যকর না হলে আগামী দিনে আরও বৃহত্তর ছাত্র আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।



