শ্রম সংহিতা ২০১৯ সাংবাদিকদের বিশেষ মর্যাদা খর্ব করেছে: পরমানন্দ পাণ্ডে

Spread the news

গুয়াহাটিতে অসম বার্তাজীবী সংঘের স্বর্ণজয়ন্তীর সফল সমাপ্তি______

বরাক তরঙ্গ, ৫ জানুয়ারি : সাংবাদিকদের ন্যায্য অধিকার সুরক্ষার জন্য প্রণীত ওয়ার্কিং জার্নালিস্ট অ্যাক্ট, ১৯৫৪ কেন্দ্রীয় সরকার বাতিল করায় সর্ব ভারতীয় বার্তাজীবী মহাসংঘ তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। ওই আইন বাতিল করে সরকার শ্রম সংহিতা ২০১৯ চালু করেছে, যার ফলে সাংবাদিকদের কোম্পানির শ্রমিক শ্রেণির সঙ্গে একই সুবিধার আওতায় আনা হচ্ছে। এতে সাংবাদিকদের বিশেষ মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হবে বলে মত প্রকাশ করা হয়েছে। গুয়াহাটির দিসপুরস্থিত লোকনির্মাণ বিভাগের প্রশিক্ষণ ও সম্মেলন কেন্দ্রে দুদিনব্যাপী বর্ণাঢ্য কর্মসূচির মাধ্যমে রাজ্যের অন্যতম সাংবাদিক সংগঠন অসম বার্তাজীবী সংঘের স্বর্ণজয়ন্তী সমাপ্তি অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।

সমাপ্তি অনুষ্ঠানের মুক্ত মঞ্চের সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নিয়ে সর্ব ভারতীয় বার্তাজীবী মহাসংঘের সাধারণ সম্পাদক ও দেশের বিশিষ্ট সাংবাদিক পরমানন্দ পাণ্ডে এ কথা বলেন। অসম বার্তাজীবী সংঘের সভাপতি মধুসূদন মেধির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় তিনি আরও বলেন, জওহরলাল নেহরুর প্রধানমন্ত্রীত্বকালে সংসদে বিস্তারিত আলোচনার পর ওই আইনটি গৃহীত হয়েছিল। আইনটি নিয়ে আলোচনার সময় কিছু মহল বিরোধিতা করলেও সাংবাদিকদের সুরক্ষিত ভবিষ্যতের স্বার্থে জোরালো সমর্থন জানানো হয়েছিল। তিনি বলেন, ওয়ার্কিং জার্নালিস্টদের সঙ্গে অসম বার্তাজীবী সংঘের সম্পর্ক নিবিড় এবং সাংবাদিকদের ন্যায্য দাবির জন্য সংঘ ধারাবাহিক কর্মসূচি গ্রহণ করে আসছে।

সংবাদমাধ্যমের সমস্যার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মুদ্রিত ও বৈদ্যুতিন মাধ্যমে বড় সমস্যা চোখে পড়ছে না, তবে সামাজিক মাধ্যমে সমস্যা রয়েছে। ডিজিটাল মিডিয়ার সমস্যার সমাধানে অসম বার্তাজীবী সংঘকে বিশেষ ভূমিকা নিতে হবে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। সাম্প্রতিক সময়ে মুদ্রিত মাধ্যমের কাজ শেষের দিকে মন্তব্য করে তিনি বলেন, আজকাল মোবাইলে খবর পড়া গেলেও কাগজে খবর পড়ার যে আলাদা অনুভূতি, তা সেখানে পাওয়া যায় না।

উল্লেখ্য, স্বর্ণজয়ন্তী সমাপ্তি উপলক্ষে অসম বার্তাজীবী সংঘের উপ-সভাপতি অঞ্জন কুমার শর্মার সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘বার্তাজীবী’ শীর্ষক স্মরনিকা তিনি উন্মোচন করেন। সভা পরিচালনা করেন সংঘের সাধারণ সম্পাদক মুকুট রাজ শর্মা। সভার উদ্বোধন করে ‘অসমিয়া প্রতিদিন’-এর মুখ্য সহযোগী সম্পাদক অচ্যুত কুমার পাটওয়ারী বলেন, যে সমাজে সাংবাদিকরা সক্রিয়, সেই সমাজও সবসময় সক্রিয় থাকে। সমাজ সংস্কারে সাংবাদিকদের বড় দায়িত্ব রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে কিছু সাংবাদিক পথভ্রষ্ট হওয়ায় জনগণ ভালো সাংবাদিকদের দিকে আঙুল তুলতে পারছে। দায়িত্ব ও অধিকার সবসময় পাশাপাশি চলে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। সাংবাদিকদের সংবাদ সংগ্রহের স্বাধীনতা আছে, তবে সেই সংবাদ সমাজে কী প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করে সাংবাদিকের সততার উপর।

ঘুণে ধরা সামাজিক ব্যবস্থায় চারদিকে অনিয়ম ও অনৈতিকতা ছড়িয়ে পড়ার সময় সাংবাদিকরা কতটা সততার সঙ্গে জীবনযাপন করবেন, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। ‘নিয়মীয়া বার্তা’র সম্পাদক নরেশ কলিতা বিশিষ্ট অতিথি হিসেবে বক্তব্য রেখে বলেন, তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে সংবাদমাধ্যমে বড় পরিবর্তন এসেছে, তবে কিছু ডিজিটাল মাধ্যম মূলধারার সংবাদমাধ্যমের প্রতি চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। সামাজিক মাধ্যমে বিভ্রান্তিমূলক প্রচার সংবাদ গোষ্ঠীর উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। এর ফলে সংবাদমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা ধীরে ধীরে কমছে। সরকার এ ক্ষেত্রে বিশেষ ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে আরও বড় সমস্যা দেখা দিতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন। তার কারাবাসের সময় অসম বার্তাজীবী সংঘ যেভাবে প্রতিবাদ করেছিল, তেমন প্রতিবাদ আর কোনো সাংবাদিক সংগঠন করেনি বলে তিনি মন্তব্য করেন। প্রেস অ্যাকাডেমি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অসম বার্তাজীবী সংঘ আরেকটি উল্লেখযোগ্য কাজ করতে পেরেছে বলেও তিনি জানান। ভারতীয় স্টেট ব্যাংকের উত্তর-পূর্ব মণ্ডলের সহকারী মহাপ্রবন্ধক সুজিত দে সভায় বক্তব্য রেখে বর্তমান সময়ের ডিজিটাল সুবিধাগুলির কথা উল্লেখ করেন এবং মোবাইলে অচেনা সূত্র থেকে আসা যেকোনো লিঙ্ক বা বার্তা উপেক্ষা করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এর মাধ্যমে বহু মানুষ সর্বস্বান্ত হওয়ার উদাহরণ রয়েছে। সর্বভারতীয় বার্তাজীবী মহাসংঘের কেন্দ্রীয় উপ-সভাপতি ফণীধর দাস এবং সম্পাদক বিশ্বজিৎ দাসও সভায় বক্তব্য রাখেন। একই সভায় অসম বার্তাজীবী সংঘের প্রাক্তন সভাপতি ও সম্পাদকদের সঙ্গে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের প্রায় ৩২ জন প্রবীণ সাংবাদিককে বিশেষ সম্মাননা দেওয়া হয়। সন্ধ্যায় প্রদীপ প্রজ্বলনের মাধ্যমে সমাপ্তি অনুষ্ঠান শেষ হয়।

উল্লেখযোগ্য যে, আগের দিন অসম বার্তাজীবী সংঘের সভাপতি মধুসূদন মেধি পতাকা উত্তোলন এবং সাধারণ সম্পাদক মুকুট রাজ শর্মা স্মৃতি তর্পণের মাধ্যমে স্বর্ণজয়ন্তী সমাপ্তি অনুষ্ঠানের সূচনা করেন। ‘সংবাদমাধ্যমের চ্যালেঞ্জ ও তার সমাধান’ শীর্ষক আলোচনা সভার উদ্বোধন করেন অসম শিশু সাহিত্য ন্যাসের সচিব হৃষিকেশ গোস্বামী। মধুসূদন মেধির সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত আলোচনা সভার সূচনা করেন দৈনিক জনমভূমি পত্রিকার কার্যনির্বাহী সম্পাদক সঞ্জীব কুমার ফুকন। আলোচক হিসেবে অংশ নেন ‘আমার অসম’-এর কার্যনির্বাহী সম্পাদক গৌতম শর্মা, বিশিষ্ট লেখক-সাংবাদিক পরেশ বৈশ্য এবং দৈনিক অসম-এর প্রবীণ সাংবাদিক জিতেন্দ্র কুমার চৌধুরী। বিকেলে নব-পুরাতন সতীর্থ সম্মিলনের উদ্বোধন করেন সংঘের প্রাক্তন সম্পাদক ভক্তি রায়। গৌরবোজ্জ্বল স্বর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে সন্ধ্যায় পঞ্চাশটি প্রদীপ প্রজ্বলন করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *