জনমত ও সম্মতি ছাড়া প্রকল্প নির্মাণের সিদ্ধান্ত নয়, খোলা চিঠিতে আশ্বাস মুখ্যমন্ত্রীর
বরাক তরঙ্গ, ৩ নভেম্বর : অরুণাচল প্রদেশের প্রস্তাবিত ছিয়াং আপার বহুমুখী প্রকল্প (SUMP) ঘিরে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিবাদ ও অসন্তোষ অব্যাহত রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আদি জনগোষ্ঠীর মানুষের উদ্দেশে বিশেষ আবেদন জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী পেমা খাণ্ডু। প্রস্তাবিত প্রকল্পকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া আশঙ্কা, বিভ্রান্তি ও উদ্বেগ দূর করতে এক খোলা চিঠির মাধ্যমে তিনি আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন, জনগণের মতামত ও সম্মতি ছাড়া ছিয়াং প্রকল্প নির্মাণের কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না।
বিশেষ করে সিয়াং ও আপার ছিয়াং জেলার বাসিন্দাদের পাশাপাশি সমগ্র আদি জনগোষ্ঠীর উদ্দেশে পাঠানো চিঠিতে মুখ্যমন্ত্রী উল্লেখ করেন, গত কয়েক মাস ধরে প্রস্তাবিত প্রকল্পকে ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। মহিলা, প্রবীণ নাগরিক, যুবসমাজ এবং পরিবারগুলি নিজেদের জমি, বসতবাড়ি, জীবিকা ও আদি জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত—এ বিষয়টিকে তিনি স্বাভাবিক বলে অভিহিত করেন।

মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে জানান, বর্তমানে সরকারের বিবেচনাধীন বিষয়টি হল কেবল প্রকল্পের প্রাক্-সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রতিবেদন (Pre-Feasibility Report বা PFR) প্রস্তুত করা। এই প্রতিবেদন তৈরির মাধ্যমে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা, প্রভাব এবং বিকল্প ব্যবস্থাগুলি প্রাথমিকভাবে মূল্যায়ন করা হবে। এর অর্থ এই নয় যে প্রকল্প নির্মাণের চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, ২০০৮ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের পর ভারত সরকার ছিয়াং আপার বহুমুখী প্রকল্পকে জাতীয় প্রকল্প হিসেবে ঘোষণা করেছিল। বর্তমানে দেশের মোট ১৬টি জাতীয় প্রকল্পের মধ্যে এটিও অন্যতম।
চিঠিতে চিনের সাম্প্রতিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের প্রসঙ্গও তুলে ধরেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভারত-চীন সীমান্ত থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে মেদগ কাউন্টিতে ইয়ারলুং সাংপো নদীর ওপর ২০২৫ সালের ১৯ জুলাই থেকে বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু করেছে চীন। তাঁর দাবি, আদি ছিয়াং নদীর প্রায় ৬৫ শতাংশ জলপ্রবাহের উৎস চীনে অবস্থিত। ফলে উজান থেকে হঠাৎ অতিরিক্ত জল নেমে আসা কিংবা শীতকালে জলের ঘাটতির মতো সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা জরুরি।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “উজানে কী ঘটছে, তা আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। কিন্তু আমাদের এলাকায় কী ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করব, তা আমাদের হাতেই রয়েছে।” তাঁর মতে, ছিয়াং আপার বহুমুখী প্রকল্প বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে পরীক্ষা করে দেখার মতো একটি সম্ভাব্য বিকল্প। এর মাধ্যমে ছিয়াং ও ব্রহ্মপুত্র নদীর পরিবেশগত জলপ্রবাহ (Ecological Flow) বজায় রাখার উপায়ও খতিয়ে দেখা সম্ভব।

প্রকল্পের সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করে তিনি জানান, প্রাক্-সম্ভাব্যতা সমীক্ষার প্রতিবেদনে প্রকল্পটির প্রাথমিক সম্ভাব্যতা, সম্ভাব্য প্রভাব এবং আদি ছিয়াংয়ের পরিবেশ ও জনজীবন সুরক্ষিত রাখতে অন্য কী কী বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে।
ভূমি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন, স্থানচ্যুতি ও ক্ষতিপূরণের বিষয়েও চিঠিতে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। এ প্রসঙ্গে তিনি ২০১৩ সালের ভূমি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন ও পুনর্বহাল সংক্রান্ত ন্যায্য ক্ষতিপূরণ এবং স্বচ্ছতার অধিকার আইন এবং ১৯৮৬ সালের পরিবেশ সুরক্ষা আইনের উল্লেখ করেন। তাঁর আশ্বাস, সংশ্লিষ্ট আইনগুলির বিধান এবং জনগণের সম্মতির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।
মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, এই প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষকে কোনওভাবেই মাঝপথে ফেলে রাখা হবে না। প্রকল্প নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে জনগণের উদ্বেগ, মতামত ও সম্মতিকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হবে বলেও তিনি আশ্বাস দিয়েছেন।



