রাজনীতির যাঁতাকলে পিষ্ট বরাকের জীবন জীবিকা!

Spread the news

।। পাভলব লস্কর ।।
(শিলচর)
৩ নভেম্বর : বরাক উপত্যকার মানুষের বর্তমান জীবন জীবিকা, জীবনধারা ইত্যাদির দুর্দশা বলছে অদূর ভবিষ্যতে বরাক উপত্যকার মানুষের জীবনে আরও বড় অর্থনৈতিক সংকট ঘনীভূত হতে চলেছে। অথচ এই সংকট নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তেমন কোনও আলোচনা নেই।

একটু পিছনে তাকালেই পার্থক্যটা বোঝা যাবে। একটা সময় ছিল, আমাদের পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন কিংবা পরিচিত মহলে প্রচুর মানুষ সরকারি চাকরি করতেন। সেই চাকরিজীবী পরিবারগুলোকে ঘিরেই একটা মধ্যবিত্ত সমাজ গড়ে উঠেছিল। আজ তাঁদের কেউ বৃদ্ধ, কেউ অবসরপ্রাপ্ত, কেউ বা আর বেঁচে নেই। তাঁদের বিধবা স্ত্রীদের পেনশন, অবসরপ্রাপ্তদের পেনশন এবং যাঁরা এখনও চাকরিতে আছেন, তাঁদের আয়ের ওপর নির্ভর করেই আজও বহু পরিবার কোনওরকমে টিকে আছে। কিন্তু নতুন করে সেই চাকরির সুযোগ তৈরি হচ্ছে কোথায়? বরং কর্মসংস্থানের পথ ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে।

এছাড়াও একসময় কৃষিও ছিল বহু পরিবারের আয়ের উৎস। আজ সেই কৃষিজমির অনেকটাই অনাবাদি, কোথাও জল জমে আছে, কোথাও ঝোপঝাড়ে ভরে গেছে। শিল্প ও নেই। কাগজকল বন্ধ হয়েছে, নতুন শিল্প গড়ে ওঠেনি। সরকারি চাকরি নেই, কৃষি নেই, শিল্প নেই। তাহলে মানুষের রোজগারের পথ কোথায়?

মধ্যবিত্ত পরিবারের বহু যুবক আজ দোকান, হোটেল, রেস্তোরাঁ খুলে বসছেন। খদ্দের থেকে বিক্রেতা বেশী। ভারসাম্যহীন বাজার হয়ে গেছে।ক্রেতা আসবে কোথা থেকে? অনেকের মাথায় ঋণের বোঝা! বাজারে বিক্রেতার সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু ক্রেতার হাতে কেনার ক্ষমতা বাড়ছে না।এমন অবস্থা হয়েছে, একসময় যে ব্যবসা ছিল জীবিকার পথ, আজ সেটাই অনেকের কাছে ঋণের ফাঁদ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

অন্যদিকে টোটো, ই-রিকশার সংখ্যা বাড়ছে। রাস্তায় যানবাহনের চাপ বাড়ছে, কিন্তু মানুষের প্রকৃত আয় বাড়ছে না। কাজের সন্ধানে বহু যুবক অন্য রাজ্যে কিংবা বিদেশে পাড়ি দিচ্ছেন। কিন্তু এইভাবে কতজন যেতে পারবেন? কতদিনই বা বাইরে থাকবেন? একটা বয়সের পর তাঁদের অনেকেই ফিরে এসে নতুন করে বেকারত্বের মুখোমুখি হচ্ছেন। তাঁদের ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা কোথায়?

এইভাবে একটা গোটা উপত্যকার অর্থনৈতিক ভিত দুর্বল হয়ে পড়ছে। মধ্যবিত্ত শ্রেণি সংকুচিত হচ্ছে, নিম্নবিত্তের সংখ্যা বাড়ছে, নতুন প্রজন্মের সামনে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। এটা কোনও বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়, এটা একটা গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট।

সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের বিষয়, এই বাস্তব সমস্যাগুলো আমাদের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নেই। মানুষের কাজ, আয়, ব্যবসা, কৃষি, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনার বদলে রাজনীতি আটকে আছে অন্য সব আবেগ, বিভাজন আর ক্ষমতার হিসাব নিকাশে।

বরাক উপত্যকার এখন দরকার বাস্তবসম্মত অর্থনৈতিক পরিকল্পনা। রোজগারের সোর্স তৈরী করা।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই উপত্যকার মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার মতো রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও দূরদর্শিতা আছে কি?
আজ যদি কর্মসংস্থান, কৃষি ও শিল্পের প্রশ্নে জোরালো দাবি না ওঠে, তাহলে আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ?

মনে রাখতে হবে, রাজনীতি মানুষের জীবনের জন্য। মানুষের জীবন ও জীবিকার প্রশ্নই যদি রাজনীতির প্রধান বিষয় না হয়, তাহলে সেই রাজনীতির প্রয়োজনীয়তাই বা কোথায়?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *