বরাক তরঙ্গ, ২ নভেম্বর : লোকগণনার সময় তথ্য সংগ্রহকারীরা যখন বাড়ি বাড়ি যাবেন, তখন মাতৃভাষায় লিখতে বা পড়তে অক্ষম বাঙালিরা নিজেদের ভাষিক পরিচয় কীভাবে তুলে ধরবেন? বরাক উপত্যকায় ক্রমবর্ধমান ভাষিক নিরক্ষরতার এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতি মাতৃভাষার অস্তিত্ব ও স্বকীয়তার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভাষার পরিচয় ও আত্মমর্যাদা রক্ষায় বাংলা শিক্ষাকে শুধু জীবিকার মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং জাতিসত্তা রক্ষার অঙ্গীকার হিসেবে গ্রহণ করার আহ্বান জানালেন বিশিষ্টজনেরা।
রবিবার শিলচরের বঙ্গভবনের প্রেক্ষাগৃহে বরাক উপত্যকা বঙ্গ সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলন পরিচালিত দূরশিক্ষা কেন্দ্রের উদ্যোগে এক বছর মেয়াদি বাংলা পাঠ্যক্রমের দশম শিক্ষাবর্ষের পাঠদানের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। একইসঙ্গে শিলচর, শ্রীভূমি ও হাইলাকান্দির পাঠকেন্দ্রগুলিতে নবীনবরণ ও পাঠদান পর্ব শুরু হয়। শিলচরের অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন দূরশিক্ষা কেন্দ্রের আচার্য বিভাসরঞ্জন চৌধুরী।
ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারেননি আমন্ত্রিত প্রধান অতিথি আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য অধ্যাপক তপোধীর ভট্টাচার্য। তাঁর পরিবর্তে মুখ্য বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট ভাষাতাত্ত্বিক, লোকসংস্কৃতি গবেষক তথা প্রাক্তন অধ্যক্ষ আবিদ রাজা মজুমদার।

নিজের বক্তব্যে তিনি বরাক উপত্যকার ভাষিক সংকটের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে জানান, ১৯৫১ সালের সরকারি জনগণনায় এই উপত্যকায় ৯৬টি মাতৃভাষার অস্তিত্ব নথিভুক্ত হয়েছিল। ১৯৬১ সালে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৭৪টিতে। পরবর্তী সময়ে ভাষার সংখ্যা আরও হ্রাস পেয়েছে। তাঁর মতে, ভাষা হারানোর অর্থ শুধু শব্দ ও লিপি হারানো নয়, এর সঙ্গে হারিয়ে যায় মানুষের পারিবারিক, সামাজিক, বংশগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের শিকড়।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, বরাক উপত্যকার সরকারি স্বীকৃত ভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও বহু বাঙালি আজও নিজের মাতৃভাষায় পড়তে ও লিখতে পারেন না। মুখে বাংলা বলতে পারলেও দাপ্তরিক কাজ কিংবা চাকরির পরীক্ষায় মাতৃভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাঁরা অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছেন। এই অবক্ষয় রোধে বঙ্গ সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলনের দূরশিক্ষা কেন্দ্রের উদ্যোগ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে তিনি উল্লেখ করেন।
দূরশিক্ষা কেন্দ্রের অবৈতনিক সঞ্চালক গৌতম প্রসাদ দত্ত পাঠ্যক্রমের সূচনার ইতিহাস তুলে ধরে জানান, তৎকালীন শিক্ষাসচিব আরসি জৈনের উদ্যোগ ও সরকারি অনুমোদনের ভিত্তিতে এই কর্মসূচি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। গত দশ বছরে এই কেন্দ্র থেকে প্রায় দেড় হাজার শিক্ষার্থী সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়েছেন। নবাগতদের উদ্দেশে তিনি বলেন, নির্দিষ্ট পাঠ্যসূচির মধ্যে নিজেদের জ্ঞান সীমাবদ্ধ না রেখে ভাষার গভীরে প্রবেশ করতে হবে। বিশেষ করে ভবিষ্যতে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হতে ইচ্ছুকদের ভাষার ওপর যথাযথ দক্ষতা অর্জন জরুরি।

পাঠ্যক্রমের শিক্ষণ পদ্ধতি ও রূপরেখা ব্যাখ্যা করেন দূরশিক্ষা কেন্দ্রের শিক্ষা আধিকারিক সঞ্জীব দেবলস্কর। তিনি বলেন, এই পাঠ্যক্রমের উদ্দেশ্য শুধু ব্যাকরণ ও সাহিত্যচর্চা নয়, শিক্ষার্থীদের ভাষিক আত্মবিশ্বাস, শুদ্ধ উচ্চারণ, নির্ভুল লিখনরীতি এবং ব্যবহারিক দক্ষতা বৃদ্ধি করাও এর অন্যতম লক্ষ্য।
শিলচর বিটি কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ তথা দূরশিক্ষা কেন্দ্রের প্রথম সঞ্চালক দিলীপকুমার দে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মাতৃভাষা ও বহুভাষিক চর্চার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, পাঠ্যসূচির গণ্ডি পেরিয়ে বৃহত্তর জীবনের সঙ্গে ভাষাচর্চাকে যুক্ত করতে হবে। এর মাধ্যমে সংকীর্ণ মানসিকতা দূর করে মুক্ত চিন্তার বিকাশ ঘটানো সম্ভব।
কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি আশিস চৌধুরী বলেন, নানা আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বরাক উপত্যকার তিন জেলায় সমান্তরালভাবে এই পাঠ্যক্রমের দশম বর্ষে পদার্পণ একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য।
সভাপতির বক্তব্যে বিভাসরঞ্জন চৌধুরী বলেন, ভাষাশিক্ষাকে কেবল পেশাগত বা আর্থিক লাভের মাপকাঠিতে বিচার করা উচিত নয়। ভাষার মাধ্যমে সমাজকে সামগ্রিকভাবে উপলব্ধি করা এবং নিরপেক্ষ মনন গড়ে তোলাই হওয়া উচিত ভাষাচর্চার মূল উদ্দেশ্য।



