বরাক তরঙ্গ, ২৯ অক্টোবর : শ্রীভূমি জেলায় ভাসানের শোভাযাত্রাকে কেন্দ্র করে মারামারির ঘটনা ও পরবর্তী পুলিশি পদক্ষেপ নিয়ে যতই খবর প্রকাশ্যে আসছে,ততই প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হচ্ছে। সামগ্রিক পরিস্থিতিকে সামলাতে প্রশাসনিক ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ব্যর্থতার পরিপ্রেক্ষিতে সরাসরি এই ব্যাপারে মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের দাবি জানাল বরাক ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট।
এক ভিডিও বার্তায় বিডিএফ আহ্বায়ক হৃষীকেশ দে বলেন, শ্রীভূমি পুলিশ সুপার প্রকাশ্যে জানিয়েছেন এটি সুরার প্রভাবে কতিপয় যুবকের মারামারির ঘটনা। এর সাথে জাতিগত সংঘাতের কোন সম্পর্ক নেই। কিন্তু এরপরও এনিয়ে রাজনীতি চলছে। প্রশাসনও নিরপেক্ষতার প্রমাণ দিতে এযাবৎ ব্যর্থ হয়েছে। তিনি বলেন যে ঘটনার দিন পুলিশ যাদের ঘটনাস্থলে এবং থানায় নিয়ে অত্যাচার করেছে দেখা যাচ্ছে এদের অধিকাংশই মারামারির ঘটনার সাথে জড়িত ছিলেন না। এমনকি পরবর্তীতে যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে তাঁদেরও এই ঘটনার সাথে প্রত্যক্ষ কোন যোগাযোগ আছে কিনা,তা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন যেহেতু পুলিশ সুপার নিজেই বলেছেন যে এটি মদ্যপ অবস্থায় দুপক্ষের মধ্যে মারামারির ঘটনা তাই অভিযুক্ত হিসেবে দুপক্ষের লোকদের গ্রেফতার করার কথা ছিল। কিন্তু দেখা যাচ্ছে এখন অবধি শুধু বাঙালিদের গ্রেফতার করা হয়েছে এবং তাঁরা পুলিশি আতিসহ্যের শিকার হয়েছেন। তাই এ ব্যাপারে প্রসাশনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্নচিহ্ন দেখা দিয়েছে। তিনি আরো বলেন যে বরাক উপত্যকার ১৩ জন বিধায়ক ও তিনজন সাংসদ রয়েছেন। উচিত ছিল তাঁদের তরফে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের ব্যবস্থা করা,প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় আনার ব্যবস্থা করা। উচিত ছিল সামনে দাঁড়িয়ে উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি শেষ করে পারস্পরিক আস্থা ও সম্প্রীতির পরিবেশকে ফিরিয়ে আনা। কিন্তু এ ব্যাপারে তাঁরা চূড়ান্ত ব্যর্থ হয়েছেন। হৃষীকেশ বলেন যে শ্রীভুমি জেলার মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু পালকে আমরা দেখলাম অসমিয়া সম্প্রদায়ের যারা আক্রান্ত হয়েছেন তাঁদের সাথে মিলিত হয়ে সহানুভূতি প্রকাশ ও দোষীদের উচিত শাস্তির ব্যাবস্থা করতে আশ্বাস দিতে। তিনি বলেন এটি অবশ্যই সাধুবাদ যোগ্য।কিন্তু অপর পক্ষের যারা আহত হলেন, অকারণে পুলিশি নির্যাতনের শিকার হলেন, তাঁদের সাথে যোগাযোগ করা এবং তদন্তের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে কোন আশ্বাস বানী তার থেকে আমরা শুনতে পেলাম না। তিনি বলেন যে বরাক উপত্যকার বিধানসভা আসন সংখ্যা ১৫ থেকে কেন ১৩ করা হয়েছে এই নিয়ে বিগত দিনে আমরা প্রতিবাদে সরব হয়েছিলাম। কিন্তু জনপ্রতিনিধিদের যদি এই ভূমিকা হয় তবে মনে হয় বরাকের কোন প্রতিনিধিত্ব থাকারই বোধহয় দরকার নেই। তিনি বলেন যে তাঁরা যদি মনে করেন যে আগামীতে বাঙালিদের ভোটের তাঁদের দরকার নেই, তাহলে কিছু বলার নেই।
হৃষীকেশ এদিন আরও বলেন, লুরিনজ্যোতি গগৈ হটাৎ করে বরাকে এসে এই বিষয় নিয়ে রাজনৈতিক রুটি সেঁকতে শুরু করেছেন। তিনি বলেন একজন পরিনত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে তাঁর উচিত ছিল প্রকৃত ঘটনা বোঝা এবং উভয় সম্প্রদায়ের লোকজনের সাথে আলোচনা করে সম্প্রীতির পরিবেশকে পুনঃস্থাপন করা। কিন্তু তিনি তা না করে একটি সম্প্রদায়ের কিছু যুবক যুবতীদের নিয়ে মিছিল করলেন, তাঁদের পক্ষে স্মারকলিপি জমা দিলেন। হৃষীকেশ বলেন এই সামগ্রিক ব্যার্থতার দায় তাই সংশ্লিষ্ট সবার এবং এই পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনতে তাঁরা সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের দাবি জানাচ্ছেন।
বিডিএফ মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক জয়দীপ ভট্টাচার্য এদিন বলেন, ইতিমধ্যে পুলিশি আতিসহ্য ও প্রসাশনিক ভুমিকা নিয়ে যেসব খবর সামনে এসেছে,তা গনতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য অশনিসংকেত। তিনি বলেন, একজন নিতান্তই দরিদ্র ব্যাবসায়ী, যিনি ছেলের খোঁজ করতে ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন, তাকে বিনা কারণে পুলিশ মারধোর করে আঠারো ঘণ্টা থানায় আটকে রেখেছিল এবং পরবর্তীতে ধারদেনা করে কুড়ি হাজার টাকা জোগাড় করে তাকে জামিন পেতে হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এমন চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে যে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সহ যারা এবং যাদের পরিজন পুলিশি আতিসহ্যের শিকার হয়েছেন তাঁরা ভয়ে সংবাদ মাধ্যমের সামনে মুখ খুলতে পারছেন না। প্রশাসন এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা নিয়ে সারা বরাক জুড়ে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন একটি সাধারণ ঘটনাকে সামাল দেবার পরিবর্তে পরিস্থিতিকে যে পর্যায়ে নেমে যাওয়া হয়েছে তাঁতে এখানে কারুর উপর আর ভরসা করা যাচ্ছে না। তিনি বলেন আসামের বর্তমান মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী একজন কর্মদক্ষ এবং অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব। তাই সামগ্রিক পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক করতে বিডিএফ এর পক্ষ থেকে তাঁরা তাঁর সরসরি হস্তক্ষেপের দাবি জানাচ্ছেন। জয়দীপ বলেন যে এই পরিপ্রেক্ষিতে নিম্নোক্ত দাবি সমুহ তাঁরা তুলে ধরছেন এবং তাঁরা আশা করছেন বরাক বাসীর আস্থা ও বিশ্বাস প্রতিস্থাপন করতে মুখ্যমন্ত্রী এগুলো বিবেচনা করবেন।
তিনি বলেন তাঁদের দাবি হচ্ছে প্রথমতঃ যারা ঘটনাস্থলে ছিলেন না,নির্দোষ, যারা জামিন পেয়েছেন তাঁদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে বিনা শর্তে সমস্ত মামলা প্রত্যাহার করা এবং এমন বাকি সবাইকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়া।
দ্বিতীয়ত পুলিশি নির্যাতনের বিরুদ্ধে ম্যাজিস্ট্রেট পর্যায়ের তদন্তের ব্যবস্থা করা এবং আইনত দোষী প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিশ্চিত করা। যাদের বিনা কারণে অযথা অত্যাচার করা হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে তাদের প্রত্যেককে অন্তত এক লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া।
তৃতীয়ত উভয় পক্ষের যারা প্রকৃত দোষী তাদের অবিলম্বে গ্রেফতার করে তদন্তের আওতায় আনা।
চতুর্থত ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার কতিপয় সংবাদ মাধ্যম যারা বরাকের বাসিন্দাদের ‘বাংলাদেশি’ বলে মিথ্যা ন্যারেটিভ ছড়িয়ে ক্রমাগত অপমান করেছেন সরকারি তরফে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।
জয়দীপ বলেন, বরাক উপত্যকার ইতিহাস হচ্ছে বিভিন্ন গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ সম্প্রীতি ও মেলবন্ধনের ইতিহাস। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে জাতিগত বা ভাষিক কারণে কেউ এখানে আক্রান্ত হয়েছেন এমন কোন উদাহরণ নেই। তাই তাঁরা চান যে অবিলম্বে এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্ক শেষ হোক এবং তাঁরা আশাবাদী যে মুখ্যমন্ত্রী এব্যাপারে সক্রিয় পদক্ষেপ নেবেন।



