মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মাকে খোলা চিঠি

Spread the news

২৯ অক্টোবর :

মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী শ্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মাকে একটি খোলা চিঠি
মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী মহোদয়,
অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই যে, অতি সম্প্রতি শ্রীভূমি শহরে দুর্গাদশমীর প্রতিমা বিসর্জনকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া একটি অনভিপ্রেত ও দুঃখজনক ঘটনা আমাদের গভীরভাবে মর্মাহত করেছে। শ্রীভূমি শহরের বাসিন্দা হিসেবে এই ঘটনায় আমরা অত্যন্ত লজ্জিত ও ব্যথিত।

দুর্গাপূজার মতো একটি আনন্দমুখর, সম্প্রীতির ও মিলনোৎসবের পরিবেশে দু’টি ভাষিক গোষ্ঠীর মধ্যে এ ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা কেবল শ্রীভূমি শহরের সামাজিক সম্প্রীতিকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায় না, বরং সমগ্র বরাক উপত্যকার দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক সহাবস্থান ও পারস্পরিক সৌহার্দ্যের ঐতিহ্যকেও আঘাত করে।

ঘটনাটি বর্তমানে বিচারাধীন এবং এ-সংক্রান্ত মামলায় পুলিশ বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তাই বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে আগাম কোনও মন্তব্য করতে চাই না। তবে এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সমগ্র আসামজুড়ে বাঙালিদের প্রতি অপমানজনক মন্তব্য, গালিগালাজ, ভয় দেখানো ও হেনস্থার যেসব অভিযোগ সামনে এসেছে, সেগুলি নিয়ে আমাদের গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা জরুরি বলে মনে করি।

এ প্রসঙ্গে শ্রীভূমির পুলিশ সুপার শ্রীমতী লীনা দোলের বক্তব্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনাটি সাম্প্রদায়িক নয়; বরং কিছু মদ্যপ ও উন্মত্ত ব্যক্তির মধ্যে সংঘটিত মারামারির ঘটনা। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওও ঘটনাটির প্রকৃতি সম্পর্কে আলোচনার অবকাশ তৈরি করেছে।

মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী, আমরা বিশ্বাস করি, আসামের বাঙালি জনগোষ্ঠী এবং বাংলা ভাষা বৃহত্তর, বহুত্ববাদী অসমীয়া সংস্কৃতিরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। আসামের ইতিহাস ও সমাজজীবন বিভিন্ন ভাষা, জাতিসত্তা ও সংস্কৃতির পারস্পরিক আদান-প্রদানে সমৃদ্ধ হয়েছে। এই বহুত্বই আমাদের সামাজিক অস্তিত্বের অন্যতম শক্তি।

আপনি লক্ষ্য করলে দেখবেন, বিহু গান ও নাচ বিগত কয়েক বছরে বরাক উপত্যকার জনজীবনেও ক্রমশ পরিচিত ও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বিহুর সুর শোনা যায়; এমনকি দৈনন্দিন জীবনের মোবাইলের রিংটোনেও তার উপস্থিতি চোখে পড়ে। এই সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের জন্য কোনও বিশেষ গোষ্ঠীর ওপর জোর খাটাতে হয়নি, কিংবা আলাদা করে কোনও পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজন হয়নি। মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত গ্রহণযোগ্যতা, ভালোবাসা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাই একটি সংস্কৃতিকে অন্য সংস্কৃতির কাছে পৌঁছে দেয়।

এই প্রেক্ষাপটে, আপনার মতো একজন দায়িত্বশীল ও প্রগতিশীল নেতার কাছে আমাদের বিনীত আবেদন—
প্রথমত, শ্রীভূমির ঘটনাটির নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করে প্রকৃত দোষীদের আইনানুগ শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক।
দ্বিতীয়ত, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আসামের বিভিন্ন স্থানে বাঙালিদের প্রতি যেসব অপমানজনক আচরণ, ভয় দেখানো, হুমকি কিংবা অযাচিত ভাষা ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে, সেগুলি যথাযথভাবে খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।

মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী, আমরা কোনও ভাষিক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চাই না। আমরা চাই, আসামের মাটিতে অসমিয়া, বাঙালি এবং অন্যান্য সমস্ত ভাষিক ও সাংস্কৃতিক জনগোষ্ঠী পারস্পরিক শ্রদ্ধা, নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করুক। অপরাধীর পরিচয় হোক তার ব্যক্তিগত কাজ ও দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে, তার ভাষা বা জাতিসত্তার ভিত্তিতে নয়।

মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী,
বরাক উপত্যকার যে ১০ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন আছে তার মধ্যে অন্যতম শ্রীভূমির ক্লাব হিন্দুস্থান। তারা একমাত্র শ্রীভূমি পুরসভার সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রীর স্বচ্ছ ভারত অভিযান সফল করে যাচ্ছে। এই ক্লাব প্রতিনিয়ত মানব সেবার সঙ্গে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাজে নজির স্থাপন করে যাচ্ছে। এমন একটি সংগঠনের নেতৃবৃন্দ কে পুলিশ যেভাবে নির্যাতন করেছে তা কোন অবস্থায় সভ্য সমাজ মেনে নিতে পারেননি। তাই আপনি বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখবেন। আমরা বিশ্বাস করি আপনি ক্লাব হিন্দুস্থান কে ন্যায় বিচার পাইয়ে দেবেন।

মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী,
২৩ অক্টোবর বিসর্জন ঘাটে যে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে তারপর আপনার নির্দেশে পুলিশ কঠোর হাতে দমন করতে সক্ষম হয়েছে। পরিস্থিতির দিকে লক্ষ রেখে আমরা সবাই সমর্থন করেছি কিন্তু পরবর্তীতে সামাজিক মাধ্যমের সৌজন্যে দেখা গেছে  বাঙালিদের উপর হামলা চালইয়েছে বরগুল থেকে আগত বিহু দলের কিছু যুবক। তাই সেই ভিডিও দেখে যারা জড়িত, তাদের অবিলম্বে চিহ্নিত করে  আইনের আওতায় আনা হোক। না হলে আমরা বৃহত্তর আন্দোলনে নামতে বাধ্য হব।

আমাদের বিশ্বাস, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং সম্প্রীতি রক্ষার প্রশ্নে আপনার সরকার যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। কারণ একটি রাজ্যের প্রকৃত শক্তি কেবল তার অর্থনৈতিক উন্নয়ন কিংবা প্রশাসনিক দক্ষতায় নয়, বরং তার প্রতিটি নাগরিক কতটা নিরাপদ, মর্যাদাসম্পন্ন ও নির্ভয়ে নিজের ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে বাঁচতে পারছেন, তার মধ্যেও নিহিত।

বিনীত
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং নাগরিকদের পক্ষে সাক্ষর ।
১/ অরূপ রায়( শ্রীভূমি)
২/ শংকর বণিক
৩/ বর্ণিতা সেন
৪/ বিশ্বজিৎ ঘোষ
৫/ বিষ্ণু পদ নাগ
৬/ পৃথিজিৎ দেব
৭/ দিলু দাস (শিলচর)
৮/ ননীগোপাল দেব
৯/ অলোকা দেব
১০/ অরুন্ধতী গুপ্ত
বরাক উপত্যকার শতাধিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। তারিখ -২৯/১০/২০২৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *