মোহাম্মদ জনি, শ্রীভূমি।
বরাক তরঙ্গ, ২৯ অক্টোবর : দুর্গাদশমীতে প্রতিমা বিসর্জনকে কেন্দ্র করে শ্রীভূমি শহরে ঘটে যাওয়া অপ্রীতিকর ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রকৃত দোষীদের শাস্তি এবং রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে বাঙালিদের হেনস্থার অভিযোগ খতিয়ে দেখার দাবিতে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার হস্তক্ষেপ চাইলেন বরাক উপত্যকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলির প্রতিনিধিরা। এ নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশে একটি খোলা চিঠি প্রকাশ করে নিজেদের উদ্বেগ ও দাবির কথা তুলে ধরেছেন তাঁরা। চিঠিতে বরাক উপত্যকার শতাধিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের উপস্থিতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, দুর্গাপূজার মতো সম্প্রীতি ও মিলনের উৎসবকে কেন্দ্র করে দুই ভাষিক গোষ্ঠীর মধ্যে অপ্রীতিকর ঘটনা সমগ্র বরাক উপত্যকার দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক সহাবস্থান ও পারস্পরিক সৌহার্দ্যের ঐতিহ্যকে আঘাত করেছে। ঘটনাটি বিচারাধীন থাকায় বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে আগাম কোনও মন্তব্য করতে চান না তাঁরা। তবে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আসামের বিভিন্ন স্থানে বাঙালিদের প্রতি অপমানজনক মন্তব্য, গালিগালাজ, হুমকি ও হেনস্থার অভিযোগ সামনে আসায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন চিঠির স্বাক্ষরকারীরা।
শ্রীভূমির পুলিশ সুপার লীনা দোলের বক্তব্যের উল্লেখ করে চিঠিতে দাবি করা হয়েছে, ঘটনাটি সাম্প্রদায়িক নয়; বরং কয়েকজন মদ্যপ ও উন্মত্ত ব্যক্তির মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলির ভিত্তিতে ঘটনার প্রকৃত চিত্র খতিয়ে দেখারও আহ্বান জানানো হয়েছে।

চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, অসমিয়া সংস্কৃতির বৃহত্তর পরিসরে বাঙালি জনগোষ্ঠী ও বাংলা ভাষা অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিভিন্ন ভাষা, জাতিসত্তা ও সংস্কৃতির পারস্পরিক আদান-প্রদানই আসামের সামাজিক ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে। বরাক উপত্যকায় বিহু গান ও নাচের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তাকে সাংস্কৃতিক সহাবস্থান ও স্বতঃস্ফূর্ত গ্রহণযোগ্যতার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন তাঁরা।
খোলা চিঠিতে শ্রীভূমির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ক্লাব হিন্দুস্থানের ভূমিকার কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। স্বাক্ষরকারীদের দাবি, শ্রীভূমি পুরসভার সঙ্গে সমন্বয় রেখে ক্লাব হিন্দুস্থান স্বচ্ছ ভারত অভিযানের কাজ করে আসছে। পাশাপাশি সংগঠনটি নিয়মিত মানবসেবা এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এমন একটি সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে পুলিশের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনার জন্য মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানানো হয়েছে।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ২৩ অক্টোবর বিসর্জন ঘাটে অপ্রীতিকর ঘটনার পর মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে পুলিশ কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। প্রথম পর্যায়ে প্রশাসনের পদক্ষেপকে সমর্থন করলেও পরবর্তীকালে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু ভিডিওতে বরগুল থেকে আসা বিহু দলের কয়েকজন যুবকের বিরুদ্ধে বাঙালিদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে বলে দাবি করেছেন স্বাক্ষরকারীরা। ভিডিওগুলি খতিয়ে দেখে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে।

মুখ্যমন্ত্রীর কাছে উত্থাপিত প্রধান দাবিগুলির মধ্যে রয়েছে, শ্রীভূমির ঘটনার নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করা এবং রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে বাঙালিদের প্রতি অপমানজনক আচরণ, হুমকি ও হেনস্থার অভিযোগ খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
চিঠিতে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে, কোনও ভাষিক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া তাঁদের উদ্দেশ্য নয়। বরং অসমিয়া, বাঙালি এবং অন্যান্য ভাষিক ও সাংস্কৃতিক জনগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, নিরাপত্তা ও মর্যাদা বজায় রাখাই তাঁদের লক্ষ্য। অপরাধের বিচার ব্যক্তির কাজ ও দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে হওয়া উচিত, ভাষা বা জাতিসত্তার ভিত্তিতে নয় বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
দাবিগুলি পূরণ না হলে বৃহত্তর আন্দোলনে নামতে বাধ্য হওয়ার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন সরকার ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষায় যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তাঁরা।
খোলা চিঠিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন অরূপ রায়, শংকর বণিক, বর্ণিতা সেন, বিশ্বজিৎ ঘোষ, বিষ্ণুপদ নাগ, পৃথিজিৎ দেব, দিলু দাস (শিলচর), ননী গোপাল দেব, অলোকা দেব এবং অরুন্ধতী গুপ্ত।



