গুয়াহাটির হোটেল বিলাস ইন হত্যাকাণ্ডে শোকের ছায়া
বরাক তরঙ্গ, ২৭ অক্টোবর : সোমবার রাতে মহানগরীতে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক গুলিচালনার ঘটনায় একটি পরিবার সম্পূর্ণভাবে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। এক রাতের মধ্যেই দুই নিষ্পাপ শিশুর হাসিখুশি পৃথিবী তছনছ হয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যে হারিয়ে গেল তাদের সবচেয়ে প্রিয় ও নিরাপদ আশ্রয়স্থল। মাত্র দেড় বছরের একটি শিশু এবং সাত-আট বছরের অপর শিশুটির মাথার উপর থেকে এক নিমেষে সরে গেল বাবা-মায়ের স্নেহের ছায়া।
সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো, অবুঝ শিশু দুটি এখনও জানে না যে তাদের প্রিয় বাবা-মা আর এই পৃথিবীতে নেই। পিতা দেবর্ষি কাশ্যপ ও মাতা রিণিকা কাশ্যপের অকালমৃত্যুর পর এই দুই শিশুর দায়িত্ব কে নেবে? তাদের ভবিষ্যৎ কী হবে? কে তাদের বুকে জড়িয়ে ধরে আগলে রাখবে? কে তাদের লালন-পালন করবে? এমন অসংখ্য প্রশ্নের উত্তর এখন অজানা।
দেবর্ষি ও রিণিকার এক আত্মীয় জানিয়েছেন, শিশু দুটি এখনও এই মর্মান্তিক ঘটনার কিছুই বুঝতে পারেনি। তারা শুধু বারবার মাকে খুঁজছে।
দেবর্ষি কাশ্যপ ছিলেন গুয়াহাটিতে গুলিচালনায় নিহত হেলেনা ভরালীর একমাত্র ছেলে। তাঁর স্ত্রী রিণিকা কাশ্যপও এই ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। স্বজনদের হারিয়ে পরিবারটির উপর নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। বিশেষ করে অনাথ হয়ে পড়া দুই শিশুর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

গুলিচালনায় নিহত পাঁচজন
গুয়াহাটির হোটেল বিলাস ইন-এ সংঘটিত গুলিচালনার ঘটনায় নিহতদের পরিচয় হলো—
১. ভূদেব ভরালী (৬৫)
২. হেলেনা ভরালী (৫৮)
৩. দেবর্ষি কাশ্যপ (৩৯)
৪. রিণিকা কাশ্যপ (৩০)
৫. নারায়ণ দাস (৪৮)
হোটেলের ভাড়া ও পরিচালনা নিয়ে বিবাদ থেকেই গুলিচালনা
পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, হোটেল বিলাস ইন-এর ভাড়ার চুক্তি এবং পরিচালনাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে চলা বিরোধের জেরেই সোমবার রাতে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে।
২০২৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর হোটেলের মালিকপক্ষ অভিযুক্ত ঘনকান্ত গগৈয়ের সঙ্গে পাঁচ বছরের একটি ভাড়ার চুক্তি সম্পাদন করে। চুক্তি অনুযায়ী, হোটেলটির মাসিক ভাড়া ছিল ১ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা।
অভিযোগ, হোটেলটির মেরামত ও সংস্কারের কাজ সম্পন্ন করার পর চত্বরের ব্যবহার এবং বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা নিয়ে মালিকপক্ষ ও ঘনকান্ত গগৈয়ের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়।
এই বিরোধ মেটানোর উদ্দেশ্যে সোমবার হোটেলে একটি বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছিল। কিন্তু বৈঠক আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়ার আগেই দুই পক্ষের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়। একসময় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে।

এরপর ঘনকান্ত গগৈ ছয়জনকে লক্ষ্য করে গুলি চালান বলে পুলিশের তরফে জানানো হয়েছে। এই ঘটনায় পাঁচজনের মৃত্যু হয়। পরে স্থানীয় বাসিন্দারা পুলিশকে খবর দেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মৃতদেহগুলি উদ্ধার করে এবং অভিযুক্তের সন্ধানে তল্লাশি শুরু করে।
দেড় ঘণ্টার মধ্যেই অভিযুক্ত গ্রেফতার
ঘটনার প্রায় এক থেকে দেড় ঘণ্টার মধ্যে অভিযুক্ত ঘনকান্ত গগৈয়ের উপস্থিতির খবর বশিষ্ঠ থানা এলাকায় পাওয়া যায়। এরপর পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে। পাশাপাশি, গুলিচালনায় ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্রটিও উদ্ধার করে জব্দ করা হয়।
ঘটনার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থল সুরক্ষিত করে। অপরাধ অনুসন্ধান বিভাগ (সিআইডি) এবং ফরেনসিক বিজ্ঞান পরীক্ষাগারের (এফএসএল) বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ঘটনাস্থল পরীক্ষা করা হয় এবং বিভিন্ন সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়।
তদন্তকারী দল ঘটনাস্থল থেকে .৩২ ক্যালিবার পিস্তলের একাধিক ব্যবহৃত কার্তুজের খোল এবং সজীব কার্তুজ উদ্ধার করে জব্দ করেছে। বর্তমানে অভিযুক্তকে একটি অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চালানো হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে।
হোটেল বিলাস ইন-এ সংঘটিত চাঞ্চল্যকর গুলিচালনার ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের জন্য মঙ্গলবার ছয় সদস্যের একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (এসআইটি) গঠন করেছে পুলিশ। ঘটনার গভীরে গিয়ে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে তদন্ত সম্পন্ন করার লক্ষ্যেই এই বিশেষ দল গঠন করা হয়েছে।
মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার অঙ্কুর জৈনের নেতৃত্বে গঠিত এই দলে রয়েছেন অঙ্কুর জৈন, যুগ্ম পুলিশ কমিশনার—দলনেতা।
শাম্ভবী মিশ্র, উপ-পুলিশ কমিশনার (মধ্য)।
ড. দেবজিৎ নাথ, উপ-পুলিশ কমিশনার (অপরাধ)।
ভিকু আচুমি, অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (মধ্য)।
কুলেশজ্যোতি ভূঞা, পল্টনবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক।
অবিনাশ দাস, উপ-পরিদর্শক।
বিশেষ তদন্তকারী দলটি ঘটনার সমস্ত দিক খতিয়ে দেখে তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাবে।

‘ঘনকান্ত আগে থেকেই গুলি চালানোর প্রস্তুতি নিয়ে এসেছিল’: দিলীপ ভরালী
ঘটনায় নিহত হেলেনা ভরালীর দাদা দিলীপ ভরালী অভিযোগ করেছেন, ঘনকান্ত গগৈ আগে থেকেই গুলি চালানোর পরিকল্পনা করে এসেছিলেন। তিনি বলেন, “ঘনকান্ত গগৈ আগে থেকেই গুলি চালানোর প্রস্তুতি নিয়ে এসেছিল। সেই কারণেই একটি গুলিও লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়নি। আমরা ব্যবসা করি, মারপিটে জড়াই না। আমরা শান্তিপূর্ণভাবে জীবনযাপন করি। আমার ভাই ও বোনের পরিবারের সদস্যরা মারা গেলেন। আমি কীভাবে আছি, তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। আমরা চাই, অপরাধী যেন উপযুক্ত শাস্তি পায় এবং ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে।”
দিলীপ ভরালী আরও জানান, তাঁদের বাবার হোটেলটি বর্তমানে তিনি, তাঁর বোন ও ভাইয়ের অধীনে রয়েছে। পরে হোটেলটি ঘনকান্ত গগৈকে লিজে দেওয়া হয়েছিল।
তাঁর অভিযোগ, গত প্রায় এক বছর ধরে ঘনকান্ত হোটেলের ভাড়া দিচ্ছিলেন না। বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও বকেয়া ভাড়া মেটানো হয়নি। অন্যদিকে, লিজের চুক্তির মেয়াদও শেষ হওয়ার মুখে ছিল।
দিলীপ ভরালী বলেন, “সোমবার ঘনকান্ত গগৈ আলোচনার জন্য ডেকেছিল। আলোচনার নাম করে ডেকে এনে হত্যা করেছে। আমি পুজো কমিটির সঙ্গে যুক্ত থাকায় সেখানে যেতে পারিনি। আমি উপস্থিত থাকলে হয়তো আমাকেও প্রাণ হারাতে হতো। ঘনকান্ত পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। এর আগে বহুবার তার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে।”
এই গুলিচালনার ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৪৮ বছর বয়সি নারায়ণ দাস। তিনি পেশায় রংমিস্ত্রি ছিলেন এবং বৈদ্যুতিক ওয়্যারিংয়ের কাজও করতেন। তাঁর বাড়ি গোয়ালপাড়ায় হলেও পরিবারের সঙ্গে তিনি বরপেটা রোডের নিমুয়ায় থাকতেন। বরপেটার পাশাপাশি গুয়াহাটিতেও কাজ করতেন তিনি। ভরালী পরিবারের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ছিল।
নারায়ণ দাসের ছেলের বক্তব্য অনুযায়ী, সোমবার দিনের বেলায় কাজের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বরপেটার দিকে রওনা হয়েছিলেন তাঁর বাবা। পরে ভূদেব ভরালীর সঙ্গে তিনি গুয়াহাটিতে আসেন। মঙ্গলবার সকালে তাঁর বাড়ি ফিরে যাওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু তার আগেই হোটেল বিলাস ইন-এ ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক গুলিচালনার ঘটনায় প্রাণ হারাতে হলো তাঁকে। তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবারে নেমে এসেছে গভীর শোক।
হোটেল বিলাস ইন-এর এই হত্যাকাণ্ডে পাঁচটি প্রাণ ঝরে যাওয়ার পাশাপাশি সবচেয়ে অসহায় পরিস্থিতির মুখে পড়েছে দেবর্ষি ও রিণিকা কাশ্যপের দুই সন্তান। যে বয়সে বাবা-মায়ের স্নেহে বেড়ে ওঠার কথা, সেই বয়সেই তাদের মাথার উপর থেকে সরে গেল অভিভাবকদের আশ্রয়।
শিশু দুটি এখনও জানে না তাদের জীবনে কী ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে এসেছে। তারা শুধু মাকে খুঁজছে। আর তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতরা। এই মর্মান্তিক ঘটনা শুধু একটি পরিবারের নয়, গোটা সমাজের সামনে রেখে গেল এক গভীর মানবিক প্রশ্ন—অপরাধের এমন পরিণতির ভার নিরপরাধ শিশুদের বহন করতে হবে কেন?


