আমার চোখে দুর্গাপুজো
।। ড. অর্পিতা দাস ।।
(শিক্ষক, সাহিত্যিক)
২০ অক্টোবর : দুর্গাপুজো আমার কাছে কেবল শারদীয় উৎসবের অনুষঙ্গ নয়, এক বহুস্বরিক সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা—যেখানে মাটির গন্ধে জেগে ওঠে স্মৃতি, শঙ্খধ্বনির অন্তরালে উচ্চারিত হয় ইতিহাস, আর দেবীর মুখচ্ছবিতে প্রতিফলিত হয় সমকালীন নারীর বহুমাত্রিক অস্তিত্ব। শরতের আকাশে সাদা মেঘের ভাসমানতা, কাশবনের দোলন, শিউলির নৈঃশব্দ্য—সব মিলিয়ে পুজো আমার কাছে এক অন্তর্লীন প্রত্যাবর্তন। কিন্তু এই প্রত্যাবর্তন নিছক নস্টালজিয়ার নয়; এর মধ্যে রয়েছে আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান, সামাজিক বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া এবং প্রচলিত বিশ্বাসের পুনর্বিবেচনা।
দুর্গা—তিনি কি শুধুই অসুরদলনী দেবী, নাকি পুরুষতান্ত্রিক সমাজের দীর্ঘ অবদমনের বিরুদ্ধে নারীর প্রতিরোধী সত্তার এক আদিরূপ? তাঁর দশভুজে অস্ত্রের সমাবেশ, সিংহের ওপর অধিষ্ঠান এবং মহিষাসুরের বিরুদ্ধে সংগ্রাম আমাকে বারবার ভাবায়। যে নারীকে দৈনন্দিন জীবনে কখনো কোমলতার, কখনো ত্যাগের, কখনো সহিষ্ণুতার নির্দিষ্ট ছকে আবদ্ধ করা হয়, সেই নারীই দেবীরূপে হয়ে ওঠেন শক্তি, কর্তৃত্ব ও আত্মপ্রতিষ্ঠার প্রতীক। এই দ্বৈততা আমাদের সমাজের এক গভীর সাংস্কৃতিক বৈপরীত্য। আমরা দেবীকে পূজা করি, অথচ বাস্তবের নারীকে তাঁর প্রাপ্য মর্যাদা দিতে কতবার ব্যর্থ হই!
দুর্গাপুজোর এই অন্তর্নিহিত প্রশ্নটি আমার কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, দেবীর আরাধনা যদি নারীর স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও আত্মমর্যাদার সামাজিক স্বীকৃতিতে রূপান্তরিত না হয়, তবে সেই আরাধনা আচারসর্বস্বতার বৃত্তেই আবদ্ধ থাকে। দেবীর হাতে অস্ত্র দেখে আমরা শক্তির বন্দনা করি, অথচ ঘরের নারীর প্রতিবাদী কণ্ঠকে কখনো কখনো অসহিষ্ণুতার চোখে দেখি। এই ব্যবধানের নিরসনেই আমি দুর্গাপুজোর প্রকৃত তাৎপর্য খুঁজে পাই।
আমার শৈশবের পুজো জড়িয়ে আছে গ্রামীণ প্রকৃতি ও লোকজ জীবনের সঙ্গে। বরাক উপত্যকার শনবিল অঞ্চলের জলভূমি, হিজলগাছের ছায়া, ধানখেতের বিস্তার, নদী ও মানুষের জীবনযাপন আমার সাংস্কৃতিক স্মৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। সেখানে উৎসবের আনন্দ কেবল মণ্ডপের আলোকসজ্জায় সীমাবদ্ধ থাকত না; তা ছড়িয়ে পড়ত পাড়া-প্রতিবেশীর পারস্পরিক সহযোগিতায়, নতুন পোশাকের অপেক্ষায়, ঢাকের শব্দে এবং মানুষের সম্মিলিত উচ্ছ্বাসে। পুজো ছিল এক সামাজিক সমাবেশ, যেখানে ব্যক্তিগত অভাব ও দৈনন্দিন ক্লান্তির মধ্যেও মানুষ খুঁজে নিত সাময়িক আনন্দের অবকাশ।

আজ নগরজীবনের আলোঝলমলে মণ্ডপ, শিল্পনির্ভর প্রতিমা, বৈদ্যুতিন আলোকসজ্জা এবং বিষয়ভিত্তিক উপস্থাপনা দুর্গাপুজোকে এক নতুন নান্দনিক মাত্রা দিয়েছে। প্রতিমা ও মণ্ডপশিল্পে সমকালীন শিল্পচেতনার প্রকাশ আমাকে আকৃষ্ট করে। কিন্তু এই পরিবর্তনের মধ্যেই কখনো কখনো উৎসবের অন্তরঙ্গতা হারিয়ে যায় বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার কোলাহলে। পুজো যখন বিপণনের ভাষায় অনূদিত হয়, তখন তার সামাজিক ও মানবিক তাৎপর্যকে পুনরুদ্ধার করা জরুরি হয়ে পড়ে। উৎসবের সৌন্দর্য শুধু কত আলো জ্বলল, কত মানুষ ভিড় করল, কিংবা কত বড় মণ্ডপ নির্মিত হলো—তার মধ্যে নিহিত নয়; সৌন্দর্য নিহিত মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগে, ভাগ করে নেওয়ার আনন্দে।
দুর্গাপুজোর আরেকটি গভীর অনুভব আমার কাছে মাতৃত্বের। দেবী দুর্গা যখন সন্তানদের নিয়ে মর্ত্যে আসেন, তখন তাঁর পৌরাণিক মহিমার পাশাপাশি এক মানবিক মাতৃসত্তাও আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়। এই মাতৃত্ব আমাকে মনে করিয়ে দেয় অসংখ্য সাধারণ মায়ের কথা, যাঁরা সংসারের অদৃশ্য শ্রম, সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং নিজেদের অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষাকে একসঙ্গে বহন করেন। তাঁদের জীবনেও শক্তির প্রকাশ আছে, কিন্তু সেই শক্তি প্রায়শই স্বীকৃতিহীন। দেবীর মাতৃরূপের বন্দনা তাই আমার কাছে সেই অদৃশ্য নারীদের শ্রম ও আত্মত্যাগের প্রতিও শ্রদ্ধা নিবেদন।
তবে মাতৃত্বের মহিমা প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে নারীর অন্যান্য পরিচয়কে আড়াল করা উচিত নয়। নারী কেবল মা নন; তিনি স্রষ্টা, চিন্তক, শ্রমজীবী, প্রতিবাদী এবং স্বতন্ত্র আকাঙ্ক্ষার অধিকারী এক মানুষ। দুর্গার দশভুজা রূপ আমাকে সেই বহুমাত্রিক পরিচয়ের কথাই মনে করিয়ে দেয়। তাঁর প্রতিটি হাতে যেন জীবনের পৃথক দায়িত্ব, পৃথক সংগ্রাম, পৃথক সম্ভাবনা। এই প্রতীকী পাঠে দেবী আমার কাছে কোনো দূরবর্তী পৌরাণিক চরিত্র নন; তিনি সমকালীন নারীর আত্মপ্রত্যয়ের এক সাংস্কৃতিক প্রতিরূপ।

আমার চোখে দুর্গাপুজো তাই একই সঙ্গে আনন্দ ও আত্মসমীক্ষার সময়। এই উৎসব আমাদের শিকড়ের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যায়, আবার শিকড়ের ভেতরে জমে থাকা বৈষম্য ও অসংগতির দিকেও দৃষ্টি ফেরায়। দেবীর আগমন যেমন অশুভের বিনাশের প্রত্যাশা জাগায়, তেমনই আমাদের সমাজে বিদ্যমান হিংসা, বৈষম্য, অবমাননা ও অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে নৈতিক অবস্থান গ্রহণের আহ্বান জানায়।
বিসর্জনের মুহূর্তে প্রতিমা জলে ভাসে, আলো নিভে আসে, ঢাকের শব্দ ক্রমশ দূরে সরে যায়। কিন্তু যে অসুরকে আমরা দেবীর পায়ের নিচে পরাজিত হতে দেখি, সে কি সত্যিই পরাজিত হয়? নাকি আমাদের সমাজের বৈষম্য, নারীর প্রতি হিংসা ও অবদমনের অন্ধকারে সে বারবার ফিরে আসে?
আমার চোখে দুর্গাপুজোর সার্থকতা দেবীর মৃন্ময়ী রূপের আরাধনায় নয়, তাঁর শক্তি ও সাহসকে জীবনের ভিতরে প্রতিষ্ঠা করার মধ্যে। যে নারীকে মণ্ডপে দেবী বলে বন্দনা করি, তাঁকে বাস্তব জীবনে স্বাধীনতা, মর্যাদা ও সমান অধিকার দিতে পারলেই আরাধনা পূর্ণতা পায়।
প্রতিমা বিসর্জিত হয়,
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—
দেবীর হাতে নিহত অসুরের,
নাকি আমাদেরই ভিতরে বেঁচে থাকা অসুরের
বিসর্জন ঘটল আজ?
এই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়েই আমার দুর্গাপুজো শেষ হয় না; বরং শুরু হয় এক নতুন আত্মসমীক্ষা।



