জুবিনহীন এক বছর : শোক নয়, ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় অসম

Spread the news

।। উত্তমকুমার সী।।
(সিনিয়র সাংবাদিক)
১৯ সেপ্টেম্বর : ২০২৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর দিনটি শুধু একটি তারিখ নয়, অসমের সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে এটি এখন এক গভীর ক্ষতের নাম। জনপ্রিয় শিল্পী জুবিন গর্গের মৃত্যুর এক বছর পূর্ণ হচ্ছে। গত এক বছরে অসম তাঁকে বহুবার স্মরণ করেছে। তাঁর গান ফিরে এসেছে মঞ্চে, রেডিওতে, সামাজিক মাধ্যমে। তাঁর জন্মভূমি থেকে শহর, সর্বত্র তাঁকে ঘিরে আবেগ অটুট থেকেছে। কিন্তু সেই আবেগের পাশাপাশি একটি প্রশ্নও আরও গভীর হয়েছে, জুবিনের মৃত্যুর প্রকৃত সত্য কী? এই প্রশ্নের উত্তর এখন আর কেবল আবেগের বিষয় নয়, এটি আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়।
জুবিন গর্গের মৃত্যু ছিল অসমের জন্য সাধারণ কোনও শিল্পীর প্রয়াণ নয়। তিনি ছিলেন এমন এক সাংস্কৃতিক প্রতীক, যাঁর কণ্ঠে অসমের প্রেম, বেদনা, প্রতিবাদ, আত্মপরিচয় এবং স্বপ্ন একসঙ্গে প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁর জনপ্রিয়তা ভাষা, বয়স, শ্রেণি ও রাজনৈতিক মতের বহু সীমা অতিক্রম করেছিল। ফলে তাঁর মৃত্যুর পর যে অভূতপূর্ব জনসমাগম এবং শোকের বিস্ফোরণ দেখা গিয়েছিল, তা আসলে একজন শিল্পীকে হারানোর পাশাপাশি একটি সাংস্কৃতিক অস্তিত্বকে হারানোর অনুভূতিকেও প্রকাশ করেছিল। কিন্তু শোকের মুহূর্ত পেরিয়ে রাষ্ট্রের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়, সত্য উদ্ঘাটন এবং আইনের মাধ্যমে তার নিষ্পত্তি।

গত এক বছরে তদন্তের পথও জটিল হয়েছে। অসমে পুলিশের বিশেষ তদন্তকারী দল তদন্ত চালিয়ে ৩,৫০০ পাতার চার্জশিট দাখিল করেছে। পরে বিশেষ ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত সাত অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে। তাঁদের মধ্যে চারজনের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ রয়েছে। অভিযুক্তরা আদালতে নিজেদের দোষী নয় বলে জানিয়েছেন। গত মে মাসে অভিযোগ গঠনের পর জুন থেকে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়েছে এবং সেপ্টেম্বরেও সাক্ষীরা আদালতে হাজির হয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। এখানেই মামলাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল দিকটি সামনে আসে।

সিঙ্গাপুর পুলিশ এবং সেখানকার স্টেট করনারের অনুসন্ধানের ফল অসমের মামলার অভিযোগের সঙ্গে এক নয়। ২৫ মার্চ সিঙ্গাপুরের স্টেট করনার জুবিনের মৃত্যুকে দুর্ঘটনাজনিত ডুবে মৃত্যু বলে রায় দেইয় এবং কোনও ফাউল প্লে-র প্রমাণ পায়নি। ১ এপ্রিল সিঙ্গাপুর পুলিশও জানায়, তাদের তদন্তে কোনও ফাউল প্লে-র প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাঁদের অনুসন্ধান অনুযায়ী, জুবিন লাইফ জ্যাকেট ছাড়া জলে নেমেছিলেন এবং ময়নাতদন্ত ও টক্সিকোলজি রিপোর্ট ডুবে মৃত্যুর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।

অন্যদিকে অসমের তদন্তে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে এবং সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই বিচার চলছে। এই দুই আইনি প্রক্রিয়ার পার্থক্যকে সরল রাজনৈতিক বিতর্কে নামিয়ে আনা উচিত নয়। বরং এখানেই বিচারব্যবস্থার দায়িত্ব আরও গুরুত্বপূর্ণ। কোন প্রমাণ কতটা গ্রহণযোগ্য, কোন সাক্ষ্য কতটা নির্ভরযোগ্য এবং শেষ পর্যন্ত অপরাধের আইনি উপাদানগুলি প্রমাণিত হয়েছে কি না, তার সিদ্ধান্ত আদালতেরই।

এ কথা মনে রাখা জরুরি, চার্জশিট মানেই অপরাধ প্রমাণ নয়, অভিযোগ গঠন মানেই দোষী সাব্যস্ত হওয়া নয়। একইভাবে কোনও তদন্তে ভিন্ন সিদ্ধান্ত পাওয়া গেলেও অন্য একটি বিচারাধীন মামলার চূড়ান্ত ফল আগেভাগে নির্ধারণ করা যায় না। ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতি হল, প্রমাণ আদালতে পরীক্ষা হবে এবং অভিযুক্তরা আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ সুযোগ পাবেন।

এই কারণেই দ্রুত বিচার প্রয়োজন, কিন্তু তাড়াহুড়োর বিচার নয়। জুবিনের পরিবার এবং অসমের মানুষের সত্য জানার অধিকার আছে। সেই সত্য প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে শক্তিশালী পথ হলো স্বচ্ছ, প্রমাণভিত্তিক এবং নিরপেক্ষ বিচারপ্রক্রিয়া। রাজনৈতিক বক্তব্য, সামাজিক মাধ্যমের জল্পনা কিংবা জনআবেগ কোনওটাই আদালতের প্রমাণের বিকল্প হতে পারে না। বরং সাম্প্রতিক ঘটনাই দেখিয়ে দিয়েছে, মামলাটি কতটা সংবেদনশীল। গত ১১ সেপ্টেম্বর ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত একটি সাক্ষীর ১৮৩ ধারায় রেকর্ড করা বক্তব্য কীভাবে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হল, তা তদন্ত করার জন্য সিআইডি-কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ বিচারাধীন মামলায় সাক্ষ্য ও প্রমাণের গোপনীয়তা এবং প্রক্রিয়াগত শৃঙ্খলাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

জুবিনের নামকে রাজনৈতিক মেরুকরণের হাতিয়ার না বানানো তাই জরুরি। সরকারকে যেমন জবাবদিহির মধ্যে থাকতে হবে, তেমনই বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজেরও দায়িত্ব, সত্যের দাবি তুলতে গিয়ে অনুমানকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা না করা। জুবিনের প্রকৃত উত্তরাধিকার তাঁর গান। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর উত্তরাধিকার হওয়া উচিত একটি বিশ্বাসযোগ্য বিচারপ্রক্রিয়া। অসম সরকার যদি সত্যিই তাঁর স্মৃতিকে সম্মান করতে চায়, তবে তাঁর গান গাওয়ার পাশাপাশি তাঁর মৃত্যুর প্রশ্নটিরও আইনসম্মত উত্তর খুঁজে বের করতে হবে। এক বছর পর অসমের সামনে তাই প্রতিশোধের প্রশ্ন নয়, সত্যের প্রশ্ন। রাজনৈতিক জয়ের প্রশ্ন নয়, ন্যায়ের প্রশ্ন। কে কী বললেন, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আদালতে কী প্রমাণিত হল।

জুবিনের কণ্ঠ আজ থেমে গেছে। কিন্তু তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে অসমের প্রশ্ন এখনও থামেনি। সেই প্রশ্নের শেষ উত্তর দিতে হবে। আর সেটা কোনও আবেগ দিয়ে নয়, প্রমাণ, আইন এবং ন্যায়বিচারের মাধ্যমে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *